বিশ্বরূপদা বলল, “তোকে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করতে বললাম আর তুই ধ্রুব বাগচীকেই ডাইরেক্ট জিজ্ঞেস করে বসলি ওঁর বউয়ের ব্যাপারে?”
মানালির মনে পড়ল। সে বলল, “আমি ভুলেই গেছিলাম। কাল রাতে ধ্রুব বাগচীকে ফোন করে ফেলেছিলাম ওঁর সিনেমা দুটো দেখে। মনে হল জিজ্ঞেস করে ফেলি, কিছু বলে নাকি! তোমায় কখন বলল?”
বিশ্বরূপদা বলল, “কাল রাতেই।”
মানালি বলল, “ওহ।”
বিশ্বরূপদা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “ভেবেছিলাম তোর হেড অফিসে কিছু গ্রে ম্যাটারস আছে। দেখছি ব্যাপারটা ফুল ব্ল্যাক হোল।”
মানালি বলল, “এই শোনো, তোমার এভাবে রিঅ্যাক্ট করার কিচ্ছু হয়নি। তুমি আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছ। আমার মনে হয়েছিল ধ্রুব বাগচীকেই জিজ্ঞেস করে যদি কোনও শর্টকাট ওয়ে পাওয়া যায়, সিম্পল!”
বিশ্বরূপদা বলল, “ঝাড় তো খেয়ে গেলি, এবারে কী করবি?”
মানালি ঠোঁট কামড়ে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, “আবার অ্যাপ্রোচ করা যায়।”
বিশ্বরূপদা বলল, “বোঝা যাচ্ছে চাকরিটা তোর না করলেও হয়, তাই না?”
মানালি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “আমার কথা শুনে কি তোমার তাই মনে হচ্ছে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “তোকে আর কত শেখাতে হবে বল তো মানালি? তোকে আমি একটা ক্লু দিলাম। তুই সেই ক্লুটা নিয়ে একটু ভাবলি না, তোর একবারও মনে হল না ধ্রুবর যেসব বন্ধু বা কাছের মানুষ আছে, তাদের মধ্যে সেফ কাউকে টার্গেট করে কিছু জানার চেষ্টা করার কথা, তুই শুরুতেই ওকে ফোন করে দিলি, মানে হচ্ছেটা কী? এভাবে করবি তুই তোর ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং?”
মানালি বুঝল বিশ্বরূপদা ভীষণ রেগে আছে। বলল, “ঠিক আছে আমি দেখছি কী করতে পারি। দয়া করে এত রেগো না। এমনিতেই বাড়িতে একটা থমথমে আবহাওয়ার মধ্যে থাকতে হয়, এরপরে যদি অফিসে তুমিও এত রেগে রেগে থাকো, তাহলে আমায় সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে হিমালয়ে চলে যেতে হবে।”
বিশ্বরূপদা কয়েক সেকেন্ড গজগজ করে বলল, “ধ্রুবকে ফোন করে সরি বলে দে।”
মানালি অবাক হল, “কেন?”
বিশ্বরূপদা বলল, “কেন বোঝো না? ছাত্রবন্ধু দিতে হবে? নাকি ডিকশনারি! মানে বুঝতে কোনটা চাই তোর?”
মানালি বলল, “ওকে ওকে। আবার রেগে যাচ্ছ। ঠিক আছে, আমি ডেস্কে গিয়ে এখনই ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।”
বিশ্বরূপদা বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “নাও লিভ।”
মানালি বিশ্বরূপদাকে আর ঘাঁটাল না। চুপচাপ নিজের ডেস্কে এসে বসে হাঁফ ছাড়ল।
বিতস্তা এসেছে। তাকে দেখে বলল, “কী হল, সকাল সকাল অ্যাসাইনমেন্ট পেলি নাকি?”
মানালি বিতস্তার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “একটা ফোন করে নি দাঁড়া।”
ডেস্কের ফোন থেকে সে ধ্রুব বাগচীর মোবাইলে ফোন করল। দুবার পুরো রিং হয়ে গেল। কেউ ফোন তুলল না।
বিতস্তা বলল, “কাকে ফোন করছিস?”
মানালি বলল, “আর কে! এক শনি জুটেছে মাথায়। লাইফ হেল হয়ে গেল।”
বিতস্তা অবাক গলায় বলল, “ধ্রুব বাগচী! আবার? কেন!”
মানালি বলল, “আর কেন! দাঁড়া লাস্ট ট্রাই করে নি।”
তৃতীয়বার রিং হবার পর ঘুমচোখে ধ্রুব ফোন ধরলেন, “হ্যালো, কে বে ভোরবেলা ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে?”
মানালি বলল, “স্যার আমি। সময়ের কণ্ঠস্বর থেকে বলছি। আপনাকে সরি বলার জন্য ফোন করেছি।”
ধ্রুব একটু চুপ করে গেলেন। সম্ভবত মনে করার চেষ্টা করলেন কী হয়েছে। কয়েক সেকেন্ড পর বললেন, “এই এক নতুন চুতিয়াপা শুরু হয়েছে। সরি বলে দিলেই যেন সাতখুন মাফ।”
মানালি বলল, “স্যার আমি সত্যি সরি।”
ধ্রুব বলল, “আপনি কেন সরি? এক্সপ্লেইন।”
মানালি দেখল বিতস্তা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে একটু ভেবে বলল, “স্যার আপনাকে মাঝরাতে ফোন করে বিরক্ত করার জন্য।”
ধ্রুব বলল, “না। আপনাদের এটাই সমস্যা বুঝেছেন? ঠিক কোন জায়গাটায় অপরাধ করেছেন সেটাই বুঝতে পারেন না। আপনাদের মতো পাবলিকের জন্যই রিমেকের এত রমরমা বাজার। আসল ট্যালেন্টগুলো ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
মানালি অবাক হয়ে বলল, “এর মধ্যে রিমেক এল কোত্থেকে স্যার? তা ছাড়া আমি বাংলা সিনেমা দেখিও না খুব বেশি।”
ধ্রুব ফুঁসে উঠলেন, “খুব গর্ব হয় বলুন? আমি বাংলা সিনেমা দেখি না বলতে?”
মানালি একটু আক্রমণাত্মক হল, “গর্বের কী আছে স্যার? একটা সিনেমায় দেখলাম তামিলনাড়ুতে যেরকম বাড়ি সে সিনেমার সেটটাও সেরকম হয়েছে। এরকম বাড়ি বাংলায় কোথায় আছে?”
ধ্রুব বললেন, “তবু তো লোকে টিকিট কেটে দেখতে যাচ্ছে? কেন?”
মানালি বলল, “কারণ মানুষকে সেটাই খাওয়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। একটা শ্রেণির লোক সেটাই খেতে চাইছে তাই।”
ধ্রুব বললেন, “কারণ এই ইন্ডাস্ট্রি দেউলিয়া ঘোষণা করে দিয়েছে নিজেদেরকে। যেভাবে কোনও কোম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে, সেভাবেই ঘোষণা করে দিয়েছে। বাংলায় কথা বললে এখন ব্যাকডেটেড, বাংলা সিনেমা দেখা আউটডেটেড, বাংলা সিনেমার গল্প বলে তামিলের লোক, নাচ শেখায় অন্ধ্রের লোক, ক্যারাটে শেখায় মহারাষ্ট্রের লোক, বাঙালির নিজস্বতা বলেই কিছু নেই আর। যাক গে, ঘুম থেকে উঠে দাঁত না মেজে এসব ভাট বকতে ভালো লাগছে না। আসল কথায় আসি, শুনুন, প্রাইভেসি শব্দটা মিডিয়া ডিকশনারিতে কোনও কালেই ছিল না। পারলে তারা ইন্ডিয়া টিমের ক্যাপ্টেন কোন ব্র্যান্ডের কন্ডোম ইউজ করে সেটাও ব্রেকিং নিউজ করিয়ে দেয়, কিন্তু বস, একটা কথা বুঝে নিন। আমার প্রাইভেট লাইফ সম্পর্কে আমাকে ঝাঁকিয়ে লাভ নেই। আমি এ সম্পর্কে একটা শব্দও বলব না।”
