রাম কপালে হাত দিয়ে বলল, “হয়ে গেল। আর-একজন শহিদ হল।”
দীপ বলল, “তোকে আর-একটা ফ্যাক্ট বলি। কাল রাত দেড়টা অবধি আমি ফোনে কথা বলেছি।”
রাম কয়েক সেকেন্ড হাঁ করে দীপের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “খাটিয়া অর্ডার দিয়ে দিচ্ছি। আর কোনও আশা নেই। তেরা রাম নাম সত্য হো গয়া ভাই।”
দীপের খাবার এসে গেছিল। দীপ কাঁটা চামচ দিয়ে চাউ ম্যানেজ করতে করতে বলল, “সেটা ঠিকই বলেছিস। রাত দেড়টা অবধি আমি স্কুল কলেজ লাইফেও জেগে থাকতাম না। ফোন রাখার পর দেখলাম ঘুমও আসছে না। শেষতক ঘুম আসতে আসতে তিনতে বেজে গেল।”
রাম মৃদু স্বরে বলল, “তিনটে না, তোর বারোটা বেজে গেছে। মেয়ে কী করে?”
দীপ বলল, “আগে ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ করত না, এখন করে।”
রাম বলল, “আহ, সেটা বলছি না। কী করে মানে, জব করে?”
দীপ বলল, “না, স্টিল স্টাডিয়িং।”
রাম বলল, “ভালোই তো। প্রবলেম কোথায়?”
দীপ বলল, “কোনও প্রবলেম নেই। শুধু রাত দুটো অবধি রোজ কথা বলতে হলে কী হবে সেটা নিয়ে আমি একটু চিন্তিত।”
রাম বলল, “অতক্ষণ কী কথা বললি?”
দীপ চাউ চিবোতে চিবোতে বলল, “তাকে আমি কী দেখে পছন্দ করলাম।”
রাম বলল, “এ কি আমাদের কোম্পানির এইচ আর নাকি বে? এই কোম্পানিতে কেন জয়েন করতে চাও জিজ্ঞেস করে! তুই কী বললি?”
দীপ বলল, “ভাট বকে গেলাম। আর কী বলার আছে? অ্যাকচুয়ালি একটা জিনিস বুঝলাম। সব রিলেশনশিপেই পাবলিক খুব ইনসিকিউরিটিতে ভোগে। সেজন্যই ফোনে সব সময় অন্যজনকে ধরে রাখতে চায়। ভাবে এই বুঝি হাতছাড়া হয়ে গেল।”
রাম বলল, “এর মধ্যে ইনসিকিউরিটিও চলে এল? তোর সঙ্গে তো ফ্রাইডে মাল খেলাম। এই দুদিনে স্টোরি এতটা এগিয়ে গেল বলছিস?”
দীপ হাসল, “আমিও তো তাই দেখছি। বেসিক্যালি আই অ্যাম স্টিল কনফিউজড। প্রেমটা অ্যাসেট না লায়াবিলিটি! শুরুতে সব কিছু খুব ইন্টেলেকচুয়াল মেটিরিয়াল মনে হয়, ব্যাপারটা একটু এগোলেই বোঝা যায়, ছোটো ছোটো ন্যাকামিগুলো জুড়তে জুড়তে ব্যাপারটা আসলে একটা বড়োসড়ো ক্যাচাল ছাড়া আর কিছুই না।”
রাম মুখ বাঁকাল, “তোর কাছে লায়াবিলিটিই হবে। এখন থেকেই যা বিরক্তি দেখাচ্ছিস, বোঝাই যাচ্ছে এ জিনিসের বেশিদিন ভ্যালিডিটি নেই।”
দীপ বলল, “আই অ্যাম কনফিউজড। রিয়েলি। এসব আসলে বোঝা। তুই চিন্তা না করতে চাইলেও এসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে, লটস অফ ইমোশনস আর ইনভলভড। সব মিলিয়ে…”
রাম বলল, “সব মিলিয়ে?”
দীপ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এই সময় সমীর স্যার ক্যান্টিনে ঢুকে দীপকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, “আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম। কাল ভুবনেশ্বর যেতে হবে গাঙ্গুলি। এস টি ইনফোটেকে। একটা আর্জেন্ট কল আছে। কোনও প্রবলেম আছে নাকি? যেতে পারবে তো?”
দীপ বলল, “ওকে স্যার। চলে যাব।”
সমীর বললেন, “কাল ভোরের ফ্লাইটের টিকিট কাটতে বলে দিচ্ছি তবে। সন্ধেয় যাতে ফিরে আসতে পারো দেখছি। নইলে পরশু চলে আসবে।”
দীপ বলল, “ওকে স্যার।”
সমীর যেতে রাম বলল, “শালা! এর মধ্যে ট্যুর দিয়ে দিল!”
দীপ বলল, “ভালোই তো। সব সময় কলকাতা পোষায় তোর?”
রাম বলল, “দেখ কী করবি! তোর লায়াবিলিটিকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিস তো যাবি নাকি।”
দীপ কাঁধ ঝাঁকাল “অফিসের ব্যাপারে কেন জিজ্ঞেস করতে যাব।”
রাম বলল, “ওরম মনে হয়। দুদিন পরে সব ব্যাপারেই এক্সপ্ল্যানেশন চাইবে। তখন বুঝবি।”
দীপ বলল, “বাল। অত কে বলতে যাবে।”
দীপের ফোন বাজছিল।
রাম বলল, “সে?”
দীপ দেখল চিত্রলেখা ফোন করছে। তার চাউটা পোষাচ্ছিল না। খানিকটা বাকি ছিল তখনও। উঠে বেসিনে মুখ ধুয়ে এসে চিত্রলেখাকে কল ব্যাক করল। রিংও হতে পারল না, তার আগেই চিত্রলেখা ধরে বলল, “লাঞ্চ হল?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
রাম হতাশ মুখ করে উঠে খাবার অর্ডার করতে গেল।
চিত্রলেখা বলল, “কী খেলে?”
দীপ বলল, “টেস্টলেস চাউ।”
চিত্রলেখা বলল, “তুমি বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে যাও না?”
দীপ বলল, “নাহ। দুপুরে অফিসের ভরসাতেই চলে যায়।”
চিত্রলেখা বলল, “আমি ডিস্টার্ব করছি না তো?”
দীপ বলল, “না না ঠিক আছে।”
চিত্রলেখা বলল, “বলছিলাম আজ সন্ধের মিটটা কাল করা যেতে পারে? আজ একটা প্রবলেম হচ্ছে।”
দীপ বলল, “কাল আমি কলকাতায় থাকছি না।”
চিত্রলেখা অবাক গলায় বলল, “কোথায় যাচ্ছ?”
দীপ বলল, “ভুবনেশ্বর। অফিসের কাজে।”
চিত্রলেখা বলল, “ওহ। তাহলে ঠিক আছে। এসে দেখা হবে তবে।”
ফোনটা কেটে গেল।
দীপ অবাক হয়ে কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
রাম এসে বসেছে তার সামনে। বলল, “কী রে? কী হল?”
দীপ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “ফুল মারা গেল।”
রাম বলল, “কার?”
দীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার। আর কার?”
১০
মানালি অফিসে ঢুকে ডেস্কে বসেই পেপারওয়েট চাপা চিরকুটটা দেখতে পেল।
“চেম্বারে আয় আগে।”
বিশ্বরূপদার হাতের লেখা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বিশ্বরূপদার চেম্বারে নক করল।
“আসব?”
“আয়।” বিশ্বরূপদা গম্ভীর হয়ে কিছু একটা লেখালেখি করছিল।
মানালি বলল, “কী ব্যাপার? জরুরি তলব?”
বিশ্বরূপদা চশমার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকাল, “তুই কি গান্ডু?”
মানালি আকাশ থেকে পড়ল, “কেন? কী হল? সকাল সকাল গালাগাল করছ কেন?”
বিশ্বরূপদা বলল, “পুজো করব?”
মানালি বলল, “কী হয়েছে সেটা তো বলো!”
