মানালি হাসি হাসি মুখে ছেলেগুলোর দিকে তাকাল। ছেলেগুলো ঘাবড়ে গিয়ে ভারতের জিডিপি নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করে দিল। বেগুনিতে কামড় দিতে দিতে মানালি বাড়ি ঢুকল।
মা গম্ভীর মুখে দরজা খুলে তাকে দেখে গজগজ করতে করতে বলল, “আরও খা। খেয়ে মোটা হ। আর বিয়ে-টিয়ে দিতে হবে না আমায়। অবশ্য কোনটাকে কোন মুল্লুকে জুটিয়েছিস কে জানে! আমি আর কিছু বলব না।”
মানালি বলল, “না বলাই ভালো। সংকীর্তন করো, যেমন করছিলে, তাতেই ভালো।”
মা বলল, “হ্যাঁ রে, ছেলেটার সঙ্গে গাড়িতে কী কথা বললি?”
মানালি একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “ছেলে আর মেয়ের নাম ঠিক করছিলাম।”
মা রেগে গেল, “সব সময় ইয়ার্কি।”
মানালি বলল, “তা তুমি কী দাবি করো মা? ছেলেটা আমাকে লিফট দেবে আর আমি ছেলেটার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে যাব?”
মা বলল, “যা পারিস কর। আমি আর কিছু বলব না। এক ছাতার চাকরি জুটেছে, আমার হাড় মাস জ্বালিয়ে খেল!”
মানালি বলল, “আমিও তো তাই চাই মা, তুমি আর কিছু বলবে না।”
মা গজগজ করতে করতে ঠাকুরঘরে চলে গেল।
মানালি ফ্রেশ হয়ে ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ অন করল।
ওয়ার্ড খুলে বড়ো বড়ো করে লিখল, “ধ্রুব বাগচীর এক্স।”
কয়েক সেকেন্ড অন্যমনস্কভাবে বসে লেখাটার ফন্ট সাইজ বাড়াতে লাগল। ল্যাপটপের ঘড়ি জানান দিচ্ছে সাতটা পঞ্চান্ন।
বেশ কয়েকটা ইমেল এসেছে। মানালি বসে বসে চেক করল। মন বসছে না কাজে। ধ্রুব বাগচী লোকটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। উন্নাসিক, উদ্ধত। ইউটিউবে ধ্রুবর প্রথম সিনেমাটা দেখতে শুরু করল সে। বেশ সাবলীল গল্প বলা। ঝকঝকে সিনেমা। মানালি ফরোয়ার্ড করতে করতে গোটাটা দেখল। নিঃসন্দেহে বিগত কয়েক বছরের অন্যতম সেরা কাজ। লোকটা ট্যালেন্টেড সন্দেহ নেই।
ডার্ক লাভ ইউটিউবে এসে গেছে। মানালি হেডফোন কানে গুঁজে সিনেমাটা দেখতে বসল আবার। অবাক হয়ে সে নিজেই লক্ষ করল সিনেমাটা এবার দেখতে ভালো লাগছে। একটা বেশ অন্যরকমের কনসেপ্টে সিনেমাটা তৈরি করা। গতি একটু ধীর, কিন্তু গল্প বলার কায়দাটা অদ্ভুত সুন্দর। একটু মনখারাপ হল তার। হলে তিন-চারটে লোক পেছন থেকে “চলবে না চলবে না” শুরু থেকেই বলে যাচ্ছিল। শুধু ওইটুকু কথায় তখন প্রভাবিত হয়ে গেছিল।
একটানা দেখছিল সিনেমাটা। হেডফোনটা কান থেকে নামিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে রইল সে। এগারোটা বাজে। ডাইনিং টেবিল থেকে বেশ জোরে জোরে থালা বাসন ব্যবহার করার শব্দ আসছে। মানালি বুঝল মা ভীষণ রেগে আছে। সে চুপচাপ গিয়ে টেবিলে বসে পড়ল।
মা বলল, “বাহ, আমার কী সৌভাগ্য! এবার খেয়ে আমায় উদ্ধার করো।”
মানালি বলল, “বাবা কবে ফিরছে?”
মা বলল, “নিজে ফোন করে খবর নাও। আমি তোমার রিপোর্টার নই। বুঝেছ?”
মানালি বুঝল মা তুমুল রেগে গেছে। তুইটা থেকে তুমিতে কনভার্ট হলেই মানালি বুঝে যায় ঈশান কোণে মেঘ জমতে শুরু করেছে।
সে চুপচাপ দুটো রুটি খেয়ে বেসিনে প্লেট রেখে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
মার সঙ্গে এখন বেশি কথা বলতে গেলেই ঝাড় অনিবার্য।
খাটে কয়েক মিনিট চুপ করে শুয়ে থাকল সে। সাড়ে এগারোটা বাজছে।
মানালি হঠাৎ ফোনটা বের করে ধ্রুব বাগচীকে ফোন করল।
দুটো রিং হতেই ফোন তুলে জড়ানো গলায় ভদ্রলোক বললেন, “ইয়েস।”
মানালি বলল, “স্যার, সময়ের কণ্ঠস্বর থেকে বলছি।”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল। বেশ কিছুক্ষণ হেসে ধ্রুব বাগচী বললেন, “বলুন, আবার কী দাবি আপনার?”
মানালি বলল, “স্যার, একটা ইনফরমেশন জানার ছিল। আপনার ওয়াইফ, মানে যাঁকে ডিভোর্স দিয়েছেন…”
এই অবধিই বলতে পারল মানালি। ওপাশ থেকে অকথ্য ভাষায় কয়েকটা গালাগালি ভেসে এল।
মানালি চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড ফোনটা দূরে রেখে দিল। খানিক পরে ফোনটা কানে দিল। ধ্রুব বাগচী প্রবল উৎসাহে তিন অক্ষর থেকে চারের ঘরে ঢুকে পড়েছেন সসম্মানে।
একটু ধরার পরে মানালি ফোনটা কেটে দিল।
ধ্রুব বাগচীর পেছনে সময় নষ্ট করার থেকে ল্যাপটপে তাস খেলা ভালো।
৯
লাঞ্চ ব্রেকে দীপ অফিস ক্যান্টিনে খাবার অর্ডার করে মোবাইলে বাজারের হাল দেখছিল।
রাম তার কাঁধে একটা টোকা দিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসে বলল, “কী বে, তোর হল কী?”
দীপ অবাক হয়ে বলল, “কেন?”
রাম বলল, “তুই আজ আমার পরে অফিস এসেছিস। ইনফ্যাক্ট সবার পরে। এবং এটা তোর অফিস লাইফে ফার্স্ট হল।”
দীপ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, “হতে পারে। এতে অবাক হবার কিছু নেই। লেট তো হইনি।”
রাম বলল, “সেটা ঠিক আছে, কিন্তু তুই তো প্রতিদিনই বিফোর টাইমে ঢুকে যাস।”
দীপ হাসল, “এভ্রিথিং চেঞ্জেস মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। আমি তো তুচ্ছ।”
রাম বলল, “সে তো দেখতেই পাচ্ছি। বিয়ে করার প্ল্যান করছিস নাকি?”
দীপ বলল, “তোর আর কোনও কাজ নেই? র্যাপিড ফায়ার শুরু করেছিস কেন? ওপিয়ামের বিলটা হিসেব করেছিস?”
রাম বলল, “ওটা আমি দিয়ে দেব। আজ তুই খাইয়ে দিস।”
দীপ বলল, “আজ খাব না। তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।”
রাম বলল, “কোথায় যাবি?”
দীপ বলল, “কাজ আছে। রাধিকার মানভঞ্জন বোঝো মামা?”
রাম চোখ কপালে তুলে বলল, “রাধিকা? মানে তুই সিরিয়াসলি প্রেম করছিস?”
দীপ বলল, “ক্যাজুয়ালি তো আমি কোনও কাজই করি না। প্রেমটা কীভাবে করব তবে?”
