চিত্রলেখা বলল, “তাহলে তখন হোয়াটসঅ্যাপের রিপ্লাই দিলেন না কেন?”
দীপ কী কেন বুঝে উঠতে উঠতেই ফোন কেটে গেল।
ফোনটা কান থেকে নামাতে নামাতে সে হতাশ গলায় বলল, “এখন আবার ফোন করে জানু মনু করে ঢপবাজি করতে হবে? হয়ে গেল আজ শেয়ার বাজারের একশো আট।”
ঘরের দরজায় কেউ নক করছে। দীপ দেখল বাবা। সে বলল, “কিছু বলবে?”
বাবা বলল, “সময় করে একবার ইতিহাস বইটা নামাস তো। বাবরের বাবার নামটা ভুলে গেছি মনে হচ্ছে।”
৮
“এই শহরটা দেখছিস না, এখানে চার রকমের মানুষ থাকে।”
ড্রাইভ করতে করতে কথাগুলো বলল বিশ্বরূপদা। গাড়িটা ফ্লাইওভারে ওঠার আগের সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটা বাচ্চা গোলাপফুল বিক্রি করছে। মানালি একটা গোলাপ কিনল। গাড়ি দাঁড়ানোর কাউন্টডাউন একশো কুড়ি থেকে শুরু হয়েছে।
বিশ্বরূপদা বলল, “কার জন্য কিনলি?”
মানালি ফুলটা খোঁপায় গুঁজে বলল, “নিজের জন্য। নিজেকে গিফট দেবার মজাটাই আলাদা। যাক গে, বলো কোন চার রকমের মানুষ থাকে এই শহরে?”
বিশ্বরূপদা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাসটার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, “এক, যারা ঘেমে নেয়ে ভিড়ে মারপিট করতে করতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যায়। এদের মধ্যে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, পরিবেশ সচেতন এবং কিছু টিপিক্যাল কিপটে শ্রেণির পাবলিক থাকে। এদের কারও কারও ট্যাক্সিতে ওঠার সামর্থটুকুও নেই। রুটের বাসের গড্ডল প্রবাহে গা ভাসিয়ে বাসে উঠে পড়েছে। লোকের ঘেমো জামা, টিশার্ট থেকে শুরু করে মোজা, সব কিছুর গন্ধ সত্ত্বেও এরা নির্বিকার। এদের মধ্যে অবশ্য ছাত্রছাত্রীরাও পড়ে।”
মানালি বলল, “পরিবেশ সচেতন লোক যারা বাসে চড়ে, এরকম ধরনের লোক কলকাতায় আছে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “অফকোর্স। আমার নিজের চেনাই দুজন আছেন। তাঁরা যথেষ্ট সচ্ছল। কিন্তু খুব তাড়া না থাকলে তাঁরা কিছুতেই গাড়িতে চড়বেন না। এটা নিয়ে একটা স্টোরি করাই যায়।”
মানালি বলল, “তা তুমি পরিবেশ সচেতন নও কেন?”
বিশ্বরূপদা বলল, “দু নম্বর।”
সিগন্যাল দিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বরূপদা গাড়ি স্টার্ট করে বলল, “আমার মতো পাবলিক, যারা সুখী মানুষ। ইএমআই-ও দিয়ে দেবে দরকার হলে, কিন্তু গাড়ি ছাড়া চড়বে না। ইএমআই দাতা থেকে আম্বানি, এই গোত্রে পড়ে।”
মানালি বলল, “তিন নম্বর?”
গাড়িটা ফ্লাইওভারে উঠল। বিশ্বরূপদা বলল, “ক্যাব পাবলিক। এরাও ল্যাদ। যেমন তুই।”
মানালি বলল, “মোটেও না। আমি সব সময় ক্যাবে চড়ি না। বললে হবে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “তাহলে লিফট নেওয়া পাবলিক।”
মানালি রেগে গেল, “আমি নেমে যাব চাইছ গাড়ি থেকে?”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “এখানে নামলে আর দেখতে হবে না। জার্নালিস্ট নিজেই খবর হয়ে যাবে।”
মানালি বলল, “হুঁ। চার নম্বর?”
বিশ্বরূপদা বলল, “ডব্লু টি পাবলিক। টিকেট কাটবে না। এদের মধ্যেও কেপ্পন শ্রেণি আছে অবশ্য। চান্স ফ্যাক্টর খেলবে। যদি ধরা না পড়ে। এই কেপ্পন তথা নিকিরি শ্রেণির লোকগুলো খুব ডেঞ্জার হয়।”
মানালি বলল, “তুমি কিন্তু একটু নিকিরি টাইপ আছ।”
বিশ্বরূপদা বলল, “কেন?”
মানালি বলল, “এই যে, দাতা কর্ণ হয়ে লিফটও দাও, আবার কথা শোনাতেও ছাড়ো না।”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “এটা খারাপ বলিসনি।”
মানালি বলল, “আচ্ছা, ধ্রুব বাগচী বিয়ে করেনি? ওঁকে নিয়ে তো তেমন গসিপ ছড়ায় না। বরং সবাই ওঁর বদমেজাজ নিয়েই যাচ্ছেতাই বলে দেখেছি।”
বিশ্বরূপদা বলল, “হুঁ। ধ্রুব বাগচী বিয়ে করেছিল তো।”
মানালি চমকে উঠে বলল, “এটা তো জানতাম না।”
বিশ্বরূপদা বলল, “জানার কথাও না। অনেকেই জানে না।”
মানালি বলল, “কী করেন ওঁর এক্স?”
বিশ্বরূপদা মানালির কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “ভালো সাংবাদিক মানেই ব্যোমকেশ বক্সী, জানিস তো?”
মানালি অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “মানে সত্যান্বেষী। একটা ক্লু দিলাম তো। এবার বাকিটা খুঁজে নে।”
মানালি বিরক্ত হল, “এ আবার কী! এ কী এমন বিরাট ব্যাপার যে খুঁজে দেখতে হবে?”
মানালির পাড়ার গলি চলে এসেছিল। বিশ্বরূপদা গাড়িটা বাঁদিকে রাখতে রাখতে বলল, “এসব ফিল্ডে তোকে কেউ চামচ দিয়ে খাইয়ে দেবে না মা। হতে পারে স্টোরিটা দারুণ ইন্টারেস্টিং। হতে পারে নেহাতই ম্যাড়ম্যাড়ে। কিন্তু তোকে নিজেকেই স্টোরিটা খুঁজতে হবে। আমি আর কিচ্ছু বলব না।”
মানালি দরজা খুলে নামতে নামতে বলল, “অ্যাজ এক্সপেক্টেড।”
বিশ্বরূপদা গাড়ি স্টার্ট দিল, “নেক্সট অ্যাসাইনমেন্ট এটাই। আর হ্যাঁ, এবারে প্রশ্নগুলো যন্ত্রের মতো করে উত্তর নিয়ে এলে চলবে না। গভীরে যেতে হবে। মাইন্ড ইট।”
মানালিকে আর দ্বিতীয় কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গাড়িটা বেরিয়ে গেল। মানালি হাঁ করে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে বাড়ির রাস্তা ধরল।
পাড়ার মোড়ে চপ ভাজা হচ্ছে। মানালি ঠোঁট কামড়ে একটু দাঁড়াল। ডায়েটিং চলছে আজকাল। তেল বারণ। বেগুনির গন্ধ অগ্রাহ্য করে খানিকটা হেঁটে আবার ফেরত এল। মনে মনে বলল, “আজই শেষ। প্রমিস প্রমিস প্রমিস। আর একটাও না কাল থেকে।”
কাগজের তিনকোনা ঠোঙায় বেগুনি দিয়ে তার ওপর দিয়ে একটু বিটনুন ছড়িয়ে দিয়েছে। মুখে দিতে জিভ পুড়ে যাবার জোগাড় এত গরম। মানালি কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে বেগুনির গন্ধ নিল। চোখ খুলে দেখল রকের তিন-চারটে ছেলে আড্ডা থামিয়ে তাকে দেখছে।
