দীপ বলল, “গুরুত্বপূর্ণ কথা বললে যখন তখন ওটাই দাঁড়ায়। আমি তো ভাবলাম কালকেই বলবে।”
বাবা বলল, “কালকে জানলে তো বলব? কাল তো তোর মার মেজাজ একদম তুঙ্গে ছিল। যাই জিজ্ঞেস করি, রেগে যাচ্ছিল। আজ সকালে শেষমেশ বলল, কী হয়েছিল। যাক গে, আসল কথায় আসি, তুই নাকি প্রেম করছিস?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
বাবা বলল, “বিয়ে করবি কবে?”
দীপ বলল, “সবে তো প্রেম শুরু হল। এখনই বিয়ে নিয়ে টানাটানি শুরু করছ কেন?”
বাবা বেশ খানিকক্ষণ তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোর মতো বিচক্ষণ যদি আমি হতে পারতাম! সবে শুরু হল বলছিস?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
বাবা বলল, “কী করে? কোথায় থাকে?”
দীপ বলল, “ভয়াবহ ব্যাপার বাবা। মেয়ে ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র পুরো আঁকতে পারে। তোমার মনে আছে, একবার ওটা তোমাকে আঁকতে বলেছিলাম? আর তুমি সারাদিন ধস্তাধস্তি করে রাতে বলেছিলে এসব মানুষের কম্মো নয়?”
বাবা বলল, “বলিস কী! এ তো সাংঘাতিক কাণ্ড! তাহলে তো দারুণ মেয়ে বলতে হয়! একদিন বাড়িতে নিয়ে আয়।”
দীপ বলল, “সেটা দেখা যাবে।”
বাবা বলল, “ম্যাপ পয়েন্টিং সব পারে কি না জিজ্ঞেস করেছিস? ছোটোনাগপুর মালভূমি, বিন্ধ্য পর্বত, লৌহ আকরিক উৎপাদক অঞ্চল, কচ্ছের রন কোথায় আছে ঠিকঠাক পারবে?”
দীপ মাথা চুলকে বলল, “সেটা জিজ্ঞেস করিনি।”
বাবা গম্ভীর হয়ে বলল, “জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। আর শোন, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর শাসনকাল, অশোকের ধর্মনীতি, শেরশাহের শাসনকাল, আকবর আর জাহাঙ্গীরের শাসনকালের তুলনামূলক আলোচনা নিয়েও জিজ্ঞেস করে নিবি। এক্কেবারে ঠিকঠাক যাচাই করে নেওয়াটাও দরকার।”
দীপ বলল, “ঠিক আছে।”
বাবা বলল, “দেখা করেছিস মেয়েটার সঙ্গে?”
দীপ মাথা নাড়ল, “কালকেই। মিক্সড ফ্রায়েড রাইস খেলাম। সঙ্গে চিংড়ি।”
বাবা রেগে গেল, “আসার সময় আমার জন্য একটু প্যাক করে নিয়ে আসতে কী হয়েছিল হারামজাদা?”
দীপ বলল, “মা এমনিতেই রেগে ছিল। আনলে আরও রেগে যেত।”
বাবা বলল, “তোর মা তো কী একটা সাইন্টিস্ট মেয়ে পছন্দ করেছিল নাকি! কী সাংঘাতিক। দেখা গেল বাড়িতে এসে বাড়ির জি(g)-এর মান কমিয়ে দিল। আমরা হাওয়ায় ভাসতে শুরু করলাম। তুই একদম ভালো করেছিস মেয়েটাকে বিয়ে করবি না বলে।”
দীপ হাসতে হাসতে বলল, “সাইন্টিস্ট না বাবা। জার্নালিস্ট।”
বাবা বলল, “জার্নালিস্ট?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ। খবরের কাগজের।”
বাবা বলল, “মেয়েটি কী বলেছে? সেও প্রেম করে?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় মা ঘরে এসে ঘরে ঠাকুরের ফটোতে ধুপকাঠি দিতে দিতে তাদের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। এখন প্রণামের সময় তাই বেশি কথা বলা যাবে না বলে মা কিছু বলতেও পারছিল না। মা অন্য ঘরে গেল।
বাবা ফিসফিস করে বলল, “তোর মার রাগ এখনও পড়েনি। আমাকে বলেছিল তোকে ঝাড়তে, এখন তোর সঙ্গে আলোচনা করছি দেখে ভদ্রমহিলা আরও রেগে গেলেন।”
দীপ বলল, “তুমি একটু চিৎকার করো। আমাকে ঝাড়ো।”
বাবা একটু গলা খাঁকরিয়ে উঁচু গলায় চ্যাঁচ্যাতে শুরু করল, “আমি এইসব প্রেম একদম বরদাস্ত করব না দীপু। ম্যাপ পয়েন্টিং করতে পারে নাকি না দেখে কোনও মেয়ে পছন্দ করা আমি একদম বরদাস্ত করব না। আগে আমি নিজের হাতে পরীক্ষা নেব, তারপর ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেব। তা ছাড়া অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের টীকা ছবি সহ ঠিকমতো লিখতে পারছে নাকি সেটাও দেখতে হবে। শুধু ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র গাঙ্গুলিবাড়ির বউমা হয়ে আসার জন্য ইজ নট সাফিশিয়েন্ট।”
দীপ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় সে শুনতে পেল তার ঘর থেকে ফোনটা সশব্দে বাজছে। সে তড়িঘড়ি নিজের ঘরের দিকে ধাবমান হয়ে ফোনটা ধরল, চিত্রলেখা ফোন করছে।
দীপ বলল, “হ্যালো।”
ওপাশে বেশ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। দীপ জোরে জোরে বলল, “হ্যালো হ্যালো।”
তার ঘরে মা ঢুকে পড়েছে। ক্যালেন্ডারে ক্যালেন্ডারে ধূপকাঠি ধরে প্রণাম করছে।
দীপ বলল, “কেটে গেল মনে হচ্ছে।”
ওপাশ থেকে চাপা গলায় চিত্রলেখা বলে উঠল, “আপনার বোধহয় কাল আমায় পছন্দ হয়নি, তাই না?”
দীপ আকাশ থেকে পড়ল, “কেন বলুন তো? হঠাৎ কী হল?”
দীপ বুঝতে পারল এক-একটা ক্যালেন্ডারের সামনে দাঁড়ানোর অ্যাভারেজ টাইমিং মা বাড়িয়ে দিয়েছে। কে ফোন করেছে এটা জানার জন্যই হয়তো।
চিত্রলেখা বলল, “আপনাকে আমি সকালে বিরক্ত করলাম। তার জন্য সরি।”
ফোনটা কেটে গেল।
দীপ বেশ কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে মনে মনে বলল, “এ আবার কী রে বাবা!”
মা তড়িঘড়ি ধূপকাঠি রেখে ঠাকুর প্রণাম সেরে তাকে বলল, “কে ফোন করেছে?”
দীপ বলল, “শেয়ার মার্কেট থেকে।”
মা গজগজ করতে করতে তার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দীপ কলব্যাক করল। দুটো রিং হতেই চিত্রলেখা ধরল, “বলুন।”
দীপ বলল, “কী হল আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
চিত্রলেখা বলল, “আপনার বোধহয় আমাকে পছন্দ নয়, না?”
দীপ বলল, “কে বলল, পছন্দ না? একশো বার পছন্দ।”
চিত্রলেখা বলল, “কী দেখে পছন্দ হল? কী আছে আমার যা আর পাঁচটা মেয়ের মধ্যে নেই!”
দীপ বলল, “এ আবার কেমন প্রশ্ন?”
চিত্রলেখা বলল, “নাকি আমার এক্স আছে বলে আপনার পছন্দ না?”
দীপ বলল, “কই সেরকম কিছু না তো!”
