মানালি বলল, “কী ভালো ব্যাপার আছে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “লোকটার মুখ খারাপ। কিন্তু রেকর্ড ভালো। মেয়েদের সঙ্গে পাঁচ পেগ গিলেও পার্টিতে কোনও রকম অসভ্যতা করবে না। এটা সবার থেকে পাওয়া যায় না।”
মানালি ঠোঁট বাঁকাল, “আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই, ধ্রুব বাগচী মদ খাবে আর আমি সামনে দাঁড়িয়ে থাকব।”
বিশ্বরূপদা বলল, “যে-কোনো সময় যে-কোনো সিচুয়েশন আসতে পারে। তোকে তার জন্য প্রিপেয়ার্ড থাকতে হবে। এখন কটা বাজে?”
মানালি ঘড়ি দেখে বলল, “পাঁচটা।”
বিশ্বরূপদা বলল, “ওকে। তুই যেতে পারিস। কিন্তু কাল এসে দু ঘণ্টার মধ্যে গোটা রিপোর্টটা তৈরি করে দিবি আমায়। ডান?”
মানালি বলল, “ডান।”
বিশ্বরূপদা বলল, “ধ্রুব বাগচী আমায় ফোন করেছিল।”
মানালি অবাক হল, “কেন?”
বিশ্বরূপদা বলল, “তোর প্রশংসা করল। বলল, ডিপার্টমেন্টে ভালো ভালো জার্নালিস্ট এসেছে। ভালো করে গ্রুম করো।”
মানালি বলল, “ধ্যাত। হতেই পারে না। ইয়ার্কি মেরো না তো।”
বিশ্বরূপদা বলল, “ইয়ার্কি মারতে যাব কেন? সিরিয়াসলিই বলেছে।”
মানালির মনে পড়ল, “ওহ, লোকটা টাকা চাইছিল ইন্টারভিউর জন্য।”
বিশ্বরূপদা হাসল, “ওটা তোকে চমকানোর জন্য বলেছিল। ভদ্রলোক নিজের ইমেজ ইচ্ছা করেই খারাপ করে রাখেন। যতটা খারাপ দেখান ততটা নন। বিশেষ করে এখনকার ইন্টেলেকচুয়ালদের মতো তো একেবারেই নন। বাই দ্য ওয়ে, আমি ইচ্ছা করেই আজ তোকে ধ্রুব বাগচীর কাছে পাঠিয়েছিলাম। তুই কতটা ঘাবড়াস দেখার জন্য। ধরে নে এটা পার্ট অফ ইওর ট্রেনিং। নইলে কাল অবধি ইন্দ্রর যাওয়াই ঠিক ছিল। ডিসিশনটা আজই সকালের।”
মানালি অবাক হয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। বিশ্বরূপদা বলল, “কী হল?”
মানালি বলল, “তোমার খুরে খুরে প্রণাম।”
৭
রবিবারের সকাল। দীপের ঘুম ভাঙল নটায়। উঠতে ইচ্ছা করছিল না তার। ফোনটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল।
উঠে সেটা নিয়ে আবার কম্বলের তলায় সেঁধিয়ে গেল সে।
হোয়াটসঅ্যাপে চিত্রলেখা মেসেজ করেছে, “ঘুম ভাঙল?”
দীপ দেখল সকাল আটটায় মেসেজটা এসেছে।
সে লিখল, “না। এখনও ঘুমাচ্ছি।”
চিত্রলেখা অনলাইনই ছিল। লিখল, “ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কীভাবে টাইপ করছেন?”
দীপ লিখল, “সুপার পাওয়ার।”
চিত্রলেখা হাসির স্মাইলি দিল।
দীপ লিখল, “এবার কী বলবেন? আমার বাবু খেয়েছে?”
চিত্রলেখা আবার একগাদা হাসির স্মাইলি দিয়ে লিখল, “না না। আচ্ছা, আপনি বিরক্ত হচ্ছেন বোধহয়। ওকে। পরে কথা বলছি।”
দীপ বলল, “ওকে।”
চিত্রলেখা মেসেজটা সিন করল। কিছু লিখল না।
দীপের মনে হল সে কি খানিকটা রূঢ় হল? একটু ভাবল। তবে সেও কিছু লিখল না আর। সকাল সকাল এত টাইপ করতে ইচ্ছা করছিল না।
বাইরের ঘর থেকে জোরে জোরে ঘণ্টার আওয়াজ আসছে। দীপ বুঝতে পারল মা পুজো শুরু করেছে। ফোনটা রেখে বেশ খানিকক্ষণ চোখ বুজে ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকল সে। রবিবার শেয়ার বাজার বন্ধ থাকে। বেশ কিছু পড়াশোনা করতে হয় তাকে। সোমবার বাজার খুলতেই কোন কোন শেয়ারের ওপর কড়া নজর থাকবে, কোন কোন শেয়ারে একটু হলেও ফাটকা খেলতে হবে, এ সব কিছুর হোমওয়ার্ক রবিবার করে রাখতে হয়। সপ্তাহের বাকি দিনগুলো এত সময় দেয় না।
দীপ বেশ খানিকক্ষণ কম্বলে শুয়ে উঠল। বাথরুমে মিনিট পনেরো কাটিয়ে বসার ঘরে গিয়ে দেখল বাবা গম্ভীর মুখে বসে আছে। সে বলল, “কী হল? রেগে আছ কেন?”
বাবা গলায় একরাশ বিরক্তি এনে বলল, “তোর মা বলছে এখন থেকে বাড়িতে আমিষ ঢুকবে না।”
দীপ অবাক গলায় বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “এ আবার কী হল? এ তো ভয়ংকর ব্যাপার।”
বাবা বলল, “তোর কী মত এই ব্যাপারে?”
দীপ বলল, “বাইরে খেয়ে নেব।”
বাবা বলল, “ইডিয়ট তৈরি হচ্ছিস যত দিন যাচ্ছে। রোজ রোজ বাইরে খেলে পেট ঠিক থাকবে? তা ছাড়া তোর মার হাতের চিংড়ির মালাইকারি, চিতল মাছের মুইঠ্যা, কুচো চিংড়ি দিয়ে মোচার তরকারি মার্কেটে পাবি?”
দীপ বলল, “তাহলে কী চাইছ? বিদ্রোহ করি?”
বাবা সোফায় একটা চাপড় মেরে বলল, “অফকোর্স। এটা নিয়ে তোর মনে কোনও সংশয় আছে নাকি? তোর মা ওই কী সব গুরুদেবের পাল্লায় পড়ল ঠিক আছে, আমি ভেবেছিলাম একটা অ্যাসোসিয়েশন দরকার, মেনেও নিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে হেঁশেল এবং পেটের অন্দরমহলে সার্জিকাল স্ট্রাইক হলে আমি মেনে নেব না। এটা তোকে আগে থেকেই বলে দিলাম দীপু।”
দীপ বলল, “তাই করো। তুমি বিদ্রোহ করো।”
বাবা কিছুক্ষণ নিজের মনে গজগজ করতে করতে কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে বলল, “এই মরেছে, তোকে কী একটা কথা বলার ছিল।”
দীপ বলল, “কী?”
বাবা খানিকক্ষণ মাথা চুলকে বলল, “কিছুতেই মনে পড়ছে না। আচ্ছা দাঁড়া, তোর মাকে জিজ্ঞেস করে আসি।”
বাবা তড়িঘড়ি ঠাকুরঘরের দিকে ছুটল।
দীপ কাগজটা খুলল। প্রথম পাতাতেই খবরের পরিবর্তে পাতা ভর্তি বিজ্ঞাপন। দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার।
বাবা ইকোনমিক টাইমস পড়ে না। ফলে কাগজটা ঝকঝকেই থাকে। সে ইকোনমিক টাইমসটা নিয়ে নিজের ঘরে যাবার জন্য সোফা থেকে উঠল, এমন সময় বাবা এসে বলল, “বস বস। তোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
দীপ বলল, “মার সঙ্গে কথা হল তবে?”
বাবা বলল, “হ্যাঁ।”
দীপ বলল, “বলো। কালকের কথা বলবে নিশ্চয়ই?”
বাবা চশমাটা কপালের উপর তুলে বলল, “হ্যাঁ। তুই কী করে জানলি?”
