দীপ বলল, “তাহলে কাটালেন কখন?”
চিত্রলেখা বলল, “ব্রেকআপ করব ভাবা যতটা সোজা, করা ততটাই কঠিন। এত কিছু সত্ত্বেও আমার প্রেমটা ছ মাস সাত মাস টিকেছিল। তারপর এল সেই ভয়ংকর দিন। ও কীভাবে যেন আমার বাড়ির ল্যান্ডলাইন নাম্বারটা আমার থেকে নিয়েছিল। একদিন তুমুল ঝগড়া হয়েছে। আমি ফোন-টোন অফ করে রেখে দিয়েছিলাম। তিনি করলেন কী, আমার ল্যান্ডলাইনে ফোন করলেন। এবং আমার বাবাকে যা নয় তাই বলে দিলেন।”
দীপ অবাক হয়ে বলল, “সর্বনাশ।”
চিত্রলেখা বলল, “সর্বনাশ বলে সর্বনাশ। বাবাকে কৈফিয়ত, মাকে কৈফিয়ত, সে এক ভয়াবহ সময়। বাবা তো এত রেগে গেল যে আমার বিয়েই দিয়ে দেয়। অনেক কষ্টে, হাতে পায়ে ধরে সেসব ঠেকানো গেল। আমি ঠিক করলাম কিছুতেই আর এই সম্পর্কে আমি নেই। ছেলেটা বহু অনুনয় করল। কিন্তু আমি আর সে পথে যাইনি।”
দীপ বলল, “সে ভালো করেছেন। এই তো খাবার এসে গেল।”
ওয়েটার খাবার সার্ভ করে দিল। দীপ বলল, “আমারও আজ একটা সম্বন্ধ এসেছিল।”
চিত্রলেখা বলল, “তাই? মেয়ে দেখা শুরু হয়েছে? কেমন দেখতে? কী করে?”
দীপ বলল, “জার্নালিস্ট।”
চিত্রলেখা বলল, “বেশ তো। আপনার সঙ্গে জার্নালিস্ট খারাপ মানাবে না।”
দীপ চামচ দিয়ে ফ্রায়েড রাইস কায়দা করতে করতে বলল, “জেলাসিতে আপনিও কম যান না কিন্তু।”
চিত্রলেখা বলল, “আমার এক্স নিয়ে আপনার কোনও আপত্তি নেই তবে?”
দীপ চামচটা প্লেটে রেখে একটু ভেবে বলল, “দেখুন, প্রথমত ওই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে বকবক করাটা আমার দ্বারা জাস্ট হবে না। আমার রিলেশনশিপে যেতে ভয় পাওয়ার অন্যতম কারণ হল এই ফোন। কানের কাছে ফোন নিয়ে ফিসফিস করে, বিড়বিড় করে আমার সোনু খেয়েছে, আমার মনু হেগেছে করতে পারব না জাস্ট। তার জন্য প্রেম থাকুক না থাকুক আমার কিচ্ছু যায় আসে না। দ্বিতীয়ত, আপনার এক্স আপনার পাস্ট। আমি বায়োলজিতে খারাপ ছিলাম। একইসঙ্গে ইতিহাসেও। তাই আপনার ইতিহাস নিয়ে আমার বিশেষ চিন্তা নেই।”
চিত্রলেখা বলল, “তাও ভালো। আমার সঙ্গে এক ছেলে ছকাতে এসেছিল। আমার এক্সের কথা শুনে ইনিয়েবিনিয়ে কেটে পড়েছে। মেয়েমানুষ আর মোবাইলের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষ তফাত দ্যাখে না। সেকেন্ডহ্যান্ড হলেই অচ্ছুৎ।”
দীপ খেতে খেতে বলল, “ওয়েভলেন্থ ম্যাচ করলেই হল। আপনি আমাকে স্বাধীনভাবে ইকোনমিক টাইমস পড়তে দেবেন, আমি আপনাকে ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে দেব। তাহলেই হবে।”
চিত্রলেখা হেসে ফেলল। বলল, “বিল কিন্তু সমান ভাগে ভাগ করবেন।”
দীপ বলল, “আজ আমি খাওয়াব। এমনিতে আমি হাড় কেপ্পন, তবু আমি খাওয়াব।”
চিত্রলেখা অবাক হয়ে বলল, “এমনিতে আপনি হাড় কেপ্পন, তবু খাওয়াবেন কেন?”
দীপ বলল, “জীবনে প্রথম কোনও মেয়েকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় এসেছি। সেলিব্রেশন তো বনতা হ্যায় বস।”
চিত্রলেখা নাক সিঁটকিয়ে বলল, “উফ, কী জঘন্য আপনার সেন্স অফ হিউমার।”
দীপ বলল, “আচ্ছা, আপনি কি আজ থেকে আমার অফিশিয়াল গার্লফ্রেন্ড? ফেসবুকে ট্যাগ করতে পারি?”
চিত্রলেখা বলল, “ফেসবুকে আগে বন্ধু হোন। তারপর তো সেসব করবেন।”
দীপ বলল, “কী জ্বালা। আচ্ছা। সেসব করা যাবে। আগে খেয়ে নি।”
চিত্রলেখা বলল, “আইসক্রিম স্কুপ আর গুলাবজামুনটা আমি খাওয়াব। আশা করব তাতে আপনার আপত্তি নেই?”
দীপ বলল, “ওকে ম্যাম। বেশি আপত্তি করলে যদি ধুতরো ফুল আঁকতে দিয়ে দেন তাহলেই চিত্তির।”
চিত্রলেখা বলল, “থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।”
৬
ডেস্কে বসে মানালি পেন্টে ছবি আঁকছিল। বিতস্তা তাকে একটা চুইংগাম দিয়ে বলল, “কি রে, ধ্রুব বাগচীকে কেমন লাগল?”
মানালি বিতস্তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, “কেমন লাগতে পারে? তোর কেমন এক্সপেক্টেশন ছিল শুনি?”
বিতস্তা একটা শয়তানি হাসি হেসে বলল, “চেটে দিয়েছে?”
মানালি উত্তর না দিয়ে মন দিয়ে মাউস দিয়ে ভেড়া আঁকতে লাগল।
বিতস্তা বলল, “বিশ্বরূপদা কিন্তু যে-কোনো সময় উঁকি মারতে পারে।”
মানালি মুখ ব্যাজার করে বলল, “তাতে আমার ছেঁড়া গেল। পৃথিবীর যত জঘন্য অ্যাসাইনমেন্টগুলো আমার জন্য দেবে, তার ওপর আবার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ? আসুক আজকে, আমি বুঝে নেব।”
বিতস্তা বলল, “তোর মুড এত অফ কেন মা? কাজে এক-আধ দিন খারাপ যেতেই পারে। জার্নালিজমের পাবলিকদের এত মুডি হলে চলে?”
মানালি বলল, “শুধু কাজে? তুই জানিস আজ কী ভয়াবহ কাণ্ড হয়ে গেছে?”
বিতস্তা অবাক হয়ে বলল, “কী কাণ্ড?”
মানালি বলল, “সকালে মা বলল, মার এক গুরুভাইয়ের বাড়ি যাবে। কী সব নাকি ঠাকুর দেবতার নাম-টাম করবে, আমাকেও যেতে হবে, একদিন গেলেই হবে। আমি ভাবলাম ঘরে বসে একা একা কী করব, চলেই যাই। গিয়ে দেখি কোত্থেকে একটা ছেলে জোগাড় করে ফেলেছে। সম্বন্ধ!!! ভাবতে পারছিস?”
বিতস্তা চোখ কপালে তুলে বলল, “ও মাই গড!!! তারপর? ইনিয়েবিনিয়ে কথা বললি? বললি না, আপনি কোন কালারের আন্ডারওয়্যার ভালোবাসেন?”
মানালি পেপারওয়েটটা তুলে বিতস্তার দিকে ছোড়ার অভিনয় করে বলল, “সবাইকে নিজের মতো ভাবিস না। আমি ক্লিয়ারলি বলে দিয়েছি আমার বয়ফ্রেন্ড আছে।”
বিতস্তা চোখ নাচাল, “কে তোর বয়ফ্রেন্ড? বিশ্বরূপদা?”
মানালি কয়েক সেকেন্ড বিতস্তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সকালে ক্লিয়ার হয়নি তোর? বিশ্বরূপদার সঙ্গে আমার এজ ডিফারেন্সটা জানিস?”
