দুপুর দেড়টা বাজে। ভিড় হতে শুরু করেছে। টেবিল খালি হতে একটু দাঁড়াতে হল দুজনকে। মিনিট পাঁচেক পরে বসল তারা।
দীপ বলল, “আপনার ননভেজ ভোজন বাড়িতে জানলে অশান্তি হবে না?”
চিত্রলেখা হেসে বলল, “বাড়িতে সব কথা বললে চলে মিস্টার গাঙ্গুলি? আপনি বলেন?”
দীপ বলল, “না। ভারতবর্ষ সেন্সর বোর্ডের দেশ। সিনেমা থেকে নিজের কথা, সবখানে সেন্সর না থাকলেই বরং সমস্যায় পড়তে হয়।”
চিত্রলেখা মাথা নেড়ে বলল, “এই তো। বুদ্ধিমান।”
দীপ বলল, “কী খাবেন?”
চিত্রলেখা বলল, “আপনি বলুন কী খাবেন। আপনাকে দেখে বেশ খানেওয়ালা বলেই মনে হয়। বিয়েবাড়িতেও তেরো পিস খাসির নিচে নামলেন না।”
দীপ অবাক হয়ে বলল, “আপনি পিস গুনেছেন?”
চিত্রলেখা বলল, “কথার কথা। গুনলে হয়তো আরও বেশিই হত। কী বলেন?”
দীপ বলল, “মাংস দেখলে আমার মাথার ঠিক থাকে না।”
চিত্রলেখা বলল, “রসগোল্লাও তো মন্দ টানলেন না।”
দীপ বলল, “সে তো চারটে খেয়েছি মাত্র। ওটা কোনও সংখ্যা হল? আপনাকে দেখে অবশ্য ডায়েট পার্টি বোঝা যায়। তবে প্লিজ ঘাস পাতা অর্ডার করবেন না।”
চিত্রলেখা আবার হেসে বলল, “ঘাস পাতা কেন অর্ডার করব! মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর প্রনের কোনও প্রিপারেশন খাওয়া যেতে পারে।”
ওয়েটার এসে গেছিল। দীপ অর্ডার দিয়ে দিল।
তারপর চিত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার হাসিটা ভারী সুন্দর। বিয়েবাড়িতে এটা দেখেই ক্লিন বোল্ড হয়ে গিয়েছিলাম বুঝতে পারলাম।”
চিত্রলেখা বলল, “থামুন। এমন বোল্ড হয়ে গেছিলেন, অফিস করতে গিয়ে আমাকে ভুলেই মেরে দিলেন।”
দীপ বলল, “সে তো সেনসেক্সটা হঠাৎ পাগলামি করতে শুরু করেছিল বলে। সেনসেক্স একটু এদিক ওদিক হলেই আমার মাথার প্রসেসর গুবলেট হয়ে যায়।”
চিত্রলেখা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “আপনি শেয়ার বাজার পাবলিক?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ, কেন?”
চিত্রলেখা মাথায় হাত দিয়ে বলল, “হয়ে গেল।”
দীপ অবাক হল, “কী হয়ে গেল?”
চিত্রলেখা হতাশ স্বরে বলল, “আমার ছোটো মামা। সারাক্ষণ এই করে যাচ্ছেন। ভদ্রলোক বিয়েও করলেন না এই চক্করে। আপনারও সেরকম প্ল্যান আছে নাকি?”
দীপ বলল, “বিয়ে করাই যায়। অতটাও কিছু না। তবে শেয়ার বাজারকে অবজ্ঞা করবেন না। চমৎকার জিনিস। একটু বোঝাই?”
দীপ একটা ন্যাপকিন নিয়ে পকেট থেকে পেন বের করল।
চিত্রলেখা হাত জোড় করে বলল, “রক্ষে করো। আপনি কি চান আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাই?”
দীপ পেনটা দিয়ে ন্যাপকিনে বাড়ি ঘর আঁকতে আঁকতে বলল, “ওকে। তাহলে থাক। এই দেখুন আমি কী সুন্দর ছবি আঁকি।”
চিত্রলেখা বলল, “বাহ, আপনি এক্কেবারে শেয়ার থেকে ছবি আঁকায় চলে এলেন দেখছি।”
দীপ বলল, “আপনার ইন্টারেস্ট নেই দেখে শিফট করে গেলাম। ছবি আঁকায় আমি অসাধারণ ট্যালেন্ট বুঝলেন? এই বাড়ি, নারকেল গাছ আর পাহাড়ের আড়াল দিয়ে সূর্য ছাড়া কিছু আঁকতে পারি না।”
চিত্রলেখা বলল, “ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকতে পারেন তো?”
দীপ সভয়ে বলল, “ওরে বাবা, সে তো আমার কাছে ভয়ানক ব্যাপার। বায়োলজি শুনলেই আমি পালাতাম।”
চিত্রলেখা বলল, “তাহলে আপনার আর আমার কোনও মিল নেই। আমার বায়োলজিতেই অনার্স। আচ্ছা, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে সেসব আঁকা শিখিয়ে দেব।”
দীপ চিত্রলেখার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “যেখানে বাঘের ভয় ইত্যাদি ইত্যাদি।”
চিত্রলেখা বলল, “আপনার জীবনে প্রেম নেই বলছেন?”
দীপ বলল, “আছে তো। ইকোনমিক টাইমস, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, সিএনবিসি, আর সেনসেক্স। এইসব নিয়েই আছি।”
চিত্রলেখা বলল, “কী ভয়ানক! আমার এক্স-এর ব্যাপারে জানতে চান?”
দীপ জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “সে জেনে কী হবে? হিংসে করা ছাড়া আর তো কোনও উপায় নেই। আমি কি আর টাইম মেশিনে গিয়ে আপনার পাস্ট বদলে দিতে পারব?”
চিত্রলেখা বলল, “না না, শুনে নিন। আপনার এক্স নেই বলে, থাকলে বুঝতেন, এক্সকে খিস্তি মারলে শরীর ঠান্ডা হয়, মাথা ঠান্ডা হয়, এক অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি হয় সারা শরীরে। সে অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না।”
দীপ ম্লান মুখে বলল, “আচ্ছা বলুন।”
চিত্রলেখা বলল, “আমার সঙ্গে ছেলেটির আলাপ আমার এইচএসের পরে। এইচএসের পরেই আমি ফেসবুক করা শুরু করি। তো, সেই সময় ছেলেটির সঙ্গে সারাদিন ধরে চ্যাট করে যেতাম। একসময় ফোন নাম্বার এক্সচেঞ্জ হল। মানে আজকালকার প্রেম-ট্রেম যে রুটে হয় সেরকমই আর কি।”
দীপ বলল, “সত্যি লোকের কত সময়।”
চিত্রলেখা বলল, “আপনার জ্বলছে? গুড।”
দীপ বলল, “বলুন বলুন। আমি শুনছি।”
চিত্রলেখা বলল, “ছেলেটি প্রথম প্রথম পজেসিভনেস দেখাত। আমি ভাবতাম ঠিক আছে। খুশিও হতাম। ভাবতাম ভালোবাসে বলেই পজেসিভ। কিন্তু একটা সময়ের পরে ছেলেটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করে দিল। ধরুন কোনও স্যারের কাছে পড়বে না, ম্যাডামের কাছে পড়তে হবে। এই টাইপ দাবি শুরু হল।”
দীপ বলল, “সুতরাং আপনি কাটিয়ে দিলেন।”
চিত্রলেখা বলল, “না। কাটাইনি। আমি ধৈর্য ধরে শুনতাম। ও যা বলত, তাই মেনে চলতাম। এক স্যার, বেশ ভালো পড়াতেন, তাঁর কাছে না পড়ে অপেক্ষাকৃত কম ভালো পড়ান এমন একজন ম্যাডামের কাছে পড়া শুরু করলাম। ম্যাডাম যেভাবে পড়াতেন, আমার মাথায় না ঢুকলেও আমি সেটাও কম্প্রোমাইজ করতে শুরু করলাম।”
