মানালি হাসল, “রাত আটটার পরে ফোন করলে এই ব্যাপারে কমেন্ট পাওয়া যাবে?”
ধ্রুব কয়েক সেকেন্ড মানালির দিকে তাকিয়ে বললেন, “নো কমেন্টস।”
মানালি বলল, “আপনার হাতে এই মুহূর্তে কোনও কাজ নেই। একজন পরিচালক হিসেবে আপনার ব্যর্থতার দিন শুরু হয়েছে। মানুষ আপনার নামে ফেসবুকে ট্রল বানাচ্ছে, আপনাকে নিয়ে যা নয় তাই লিখছে, আপনাকে ট্যুইট করে এত কিছু বলছে, আপনার কি শেষের দিন এসে গেল মিস্টার বাগচী?”
ধ্রুব নতুন ধরানো সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। বললেন, “এই ফ্ল্যাটটা নিজের টাকায় কেনা। নিচে গ্যারেজে রাখা গাড়িটাও। কোনও বিখ্যাত বাপের ছেলে নই। বিখ্যাত বাপের রয়্যালটি পেয়ে আমাকে বেঁচে থাকতে হয় না…”
মানালি বাধা দিয়ে বলল, “সে তো স্যার ম্যাক্সিমাম পরিচালকই তাই, আপনি একজনকে উদ্দেশ্য করেই বলে যাচ্ছেন কেন?”
ধ্রুব বললেন, “বলছি কারণ আমার মা, বাবা, মাসি, পিসি, কোনও দিন কেউ ছিল না। নিজের জোরে আমি এই জায়গায় এসেছি। ভিটেমাটি ছেড়ে ও দেশ থেকে ঠাকুরদা এসেছিল। বাবা লড়েছে, আমিও লড়ব। আমাকে হারানো এত সহজ না।”
মানালি বলল, “এখন আপনি কী করছেন?”
ধ্রুব বললেন, “লিখছি। লিখছি, কাটছি, আবার লিখছি।”
মানালি বলল, “আপনার গল্প যদি প্রোডিউসার পছন্দ না করেন? যদি তাঁরা মনে করেন আপনাকে নিয়ে ভবিষ্যতে আর কিছু হবে না? সেক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?”
ধ্রুব উত্তর দিলেন না। সামনে রাখা টেবিলে রিমোটটা নিয়ে টিভিটা চালিয়ে একটা সিরিয়ালের চ্যানেল চালিয়ে বললেন, “আপনি সিরিয়াল দেখেন?”
মানালি বলল, “না। আমার মা দ্যাখে।”
ধ্রুব ঋপণের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি দেখেন?”
ঋপণ মাথা নাড়ল, “না স্যার, বাড়িতে বাবা মা দুজনেই দ্যাখে।”
ধ্রুব হাসলেন, “প্রতি পরিবার পিছু কেউ না কেউ সিরিয়াল দ্যাখে। গড্ডল প্রবাহে গা ভাসাব!”
মানালি বলল, “সেটা সম্ভব হবে? বড়ো পর্দার সফল পরিচালক শেষমেশ সিরিয়াল বানাবেন?”
ধ্রুব বললেন, “সাবিত্রীদি, মাধবীদিরা অভিনয় করলে আপনারা সেটা নিয়ে নাক সিঁটকেছেন? আমার ঘরে হাঁড়ি না চড়লে আমি কী করব সেটা তো আমাকেই ঠিক করতে হবে, তাই না?”
মানালি বলল, “আপনার সিনেমা চলে না, আপনাকে সরকারি পদে রাখা হয়েছে বলে একটা গ্রেড এ ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে ট্রিটমেন্ট পান, আপনার নিজেকে ওভাররেটেড বলে মনে হয় না?”
ধ্রুব বললেন, “আপনার স্যালারি কত?”
মানালি বলল, “সেটা স্যার কী করে বলি?”
ধ্রুব ঋপণের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি ফ্রিল্যান্সার? না মাইনে করা?”
ঋপণ বলল, “স্যালারি পাই।”
ধ্রুব টেবিলে পা তুলে বললেন, “আপনারা মাইনে পান। আপনাদের কোম্পানি আপনাদের মাইনে দেয়। আপনাদের সময়ের দাম আছে। দুটোকে নিশ্চয়ই আমার কাছে ইয়ার্কি মারতে পাঠানো হয়নি। তাহলে আমি ওভাররেটেড কী করে হই?”
মানালি মরিয়া হল, “সেটা তো আপনি গরম গরম স্কুপ দেন, সেগুলোর জন্য।”
ধ্রুব হাসতে হাসতে বললেন, “সেটাও তো কোয়ালিটি। সেটার ভ্যালু নিশ্চয়ই আছে বলেই আপনাদের এখানে পাঠানো হয়েছে। রাস্তার নসু ঘোষ কী বলল, আর ধ্রুব বাগচী কী বলল, দুটোর মধ্যে নিশ্চয়ই ডিফারেন্স আছে।”
মানালি রেকর্ডার অফ করে বলল, “থ্যাংক ইউ স্যার।”
ধ্রুব বাগচী বললেন, “শিক্ষানবিশ। তবে লেগে থাকুন। আপনার উন্নতি ঠেকায় কে?”
মানালি বলল, “কেন? আমার মধ্যে কী এমন দেখলেন?”
ধ্রুব বাগচী টিভিতে সিরিয়াল দেখতে দেখতে বললেন, “আপনি মেয়ে। সুন্দরী। একটা কারণই উন্নতি ঘটানোর জন্য যথেষ্ট।”
মানালির রাগ হচ্ছিল। সে সোফা থেকে উঠে বলল, “বাই স্যার।”
ধ্রুব বাগচী বললেন, “অফিসে বলে দেবেন আমার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিতে। আমার সময়ের দাম আছে।”
মানালি বলল, “ওকে স্যার।” ঋপণকে বলল, “চল।”
ধ্রুব বাগচী সিগারেট ধরিয়ে রিমোটটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “মধ্যমেধাই সর্বনাশ করল দেশটার।”
মানালি বলল, “আমায় কিছু বললেন, স্যার?”
ধ্রুব বাগচী বললেন, “না না। যাবার সময় দরজাটা ভেজিয়ে যাবেন।”
***
ধ্রুব বাগচীর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে মানালি ঋপণকে বলল, “আমাকে যদি আবার এই জঘন্য লোকটার ইন্টারভিউ নিতে পাঠানো হয়, তবে আমি বিশ্বরূপদাকে জাস্ট খুন করে ফেলব।”
ঋপণ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলল, “তুই এত রিঅ্যাক্ট করে ফেলিস কেন? লোকটাকে খেলিয়ে আরও অনেক কিছু বের করতে পারা যেত। বিশ্বরূপদা ইচ্ছা করেই তোকে পাঠিয়েছে। আমার মনে হয় তোর ধৈর্য টেস্ট করছে।”
মানালি গজগজ করতে করতে যাচ্ছিল। মোবাইলটা রিং হচ্ছিল তার। জিন্সের পকেট থেকে বের করে দেখল মা ফোন করছে। সে ফোনটা ঋপণকে দিয়ে বলল, “মাকে বলে দে তো আমি হারিয়ে গেছি। টিভিতে অ্যাড দিয়ে দিক! সবাই মিলে আমাকে পাগল করে দেবে। যত্তসব!”
৫
দীপ পৌঁছে দেখল চিত্রলেখা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল, “এক্সট্রিমলি সরি। লেট করে ফেললাম।”
চিত্রলেখা বলল, “ঠিক আছে। আমিও মিনিট তিনেক আগেই এলাম।”
দীপ বলল, “চলুন।”
চিত্রলেখা বলল, “আপনি কি খুব ব্যস্ত ছিলেন আজকে? ঘেমে আছেন দেখছি।”
দীপ বলল, “জ্যাম ছিল খানিকটা চিংড়িহাটার দিকে। আপনার বাড়ি এখান থেকে কতদূর?”
চিত্রলেখা বলল, “দুটো স্টপেজ।”
