এই কদিন আর বাঁচবর মতো সেন্টুপূর্ণ কথা পৃথিবীতে আর আছে? তাও যদি নিজের মা বলে। এই কথা শুনলে চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ে। নিজের বেঁচে থাকার প্রতি অনীহা জন্মায়। নিজের প্রতি তীব্র ঘেন্না জন্মায়। ছিহ, মাকে এত কষ্ট দিতে পারলাম আমি?
দুটো বিস্কুট, দুটো চা শেষ করে বাইকে চড়লাম। অফিস যেতে হবে। পেটের ভাত জোটাতে হবে। বসে থেকে রাজনীতির প্যাঁচাল শোনার বিলাসিতা আমাকে দেখালে চলবে না।
খানিকটা যেতেই ফোনটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ শুরু করল। ভাইব্রেশনে থাকলে আমার ফোন ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে। আপনাদের ফোন কী করে তা আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।
ফোন বের করে দেখলাম বউ ফোন করছে।
ধরা কি ঠিক হবে?
একটু ভেবে দেখলাম না ধরলে আবার প্রচুর টেনশন কাজ করবে। কী বলতে চেয়েছিল, কেন বলতে চেয়েছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। তার থেকে ধরে নেওয়াই ভালো।
ধরলাম। বললাম, “হ্যালো।”
‘‘নেট ব্যাংকিং আইডি পাসওয়ার্ডটা পাঠান তো। আমার অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা লাগবে। ওটিপি গেলে সেটাও দেবেন।”
আমি হাঁ করে খাবি খেয়ে বললাম, “এটা তো কাউকে দেওয়া যায় না।”
“আমি বউ তো! আমাকে দেওয়া যাবে।”
“আপনাকে বাড়ি দিয়ে এসেছি। এখন কী করে বউ হবেন?”
“আপনি দেবেন, না ফোর নাইন্টি এইট ঠুকব?”
আমার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।
খেয়েছে! এ কার পাল্লায় পড়লাম রে বাবা!
১৪ আত্রেয়ী
“তুই যে লোককে সবথেকে বেশি অপছন্দ করিস, তোর ছেলে যদি তার মতো স্বভাব চরিত্র পায়, তখন কেমন লাগে বল তো?”
রুটি তরকারি খেতে খেতে কথাগুলো বলল আদৃতা। আমি হাঁ করে আদৃতার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার ছেলে কোত্থেকে পেলি?”
আদৃতা রুটি চিবোতে চিবোতে বলল, “আরে তোর ছেলে মানে তো কথার কথা বলেছি। আমার ছেলের কথা বলছি। সবটা আমার শাশুড়ির মতো পেয়েছে জানিস! এমনকি, উনি যেরকম থমকে থমকে হাঁটেন, আমার ছেলেও সেরকম এক্কেবারে! জিন পেলি পেলি, আমার মার মতো পেতে পারতি না! ওর মার মতোই পেতে হল? শাশুড়ি না থাকলেও আমার ছেলেকে দেখলে মনে হবে যেন উনিই সামনে দিয়ে ঘুরঘুর করছেন! মরণ আর কাকে বলে!”
আমি চাউ খাচ্ছিলাম। হাসির চোটে সব বেরিয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে জিভ-টিভ কামড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “এইটুকু ছেলে, এখনই এত সব কিছু কল্পনা করে নিচ্ছিস কেন? তুই পারিসও বটে। পাগল কোথাকার একটা!”
আদৃতা হাত-টাত নেড়ে বলল, “তুই জানিস না বলে বলছিস। সংসার তো করতে হয় না। দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছিস। দুদিন পর যখন বিয়ে হবে তখন বুঝবি কত ধানে কত চাল!”
আমি ঠোঁট কামড়ালাম। আগে এসব লজ্জা-টজ্জা পেতাম না। আজকাল পাচ্ছি। সে আসার পর থেকে পাচ্ছি। কোত্থেকে যে কী হয়ে গেল বুঝতে পারি না। কটা দিন যেন স্বপ্নের মতো কেটে যাচ্ছে। জীবনটা এত ভালো হবে? সত্যি? ভাবতেই কেমন যেন লাগে।
আদৃতা বলল, “পেরেন্টস টিচার মিটিং আছে এই শনিবার, জানিস তো? হেডু আজ স্কুলে আসতেই বলে দিয়েছে।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমাকেও বলেছেন। হোক না, অসুবিধা কী?”
আদৃতা বলল, “অসুবিধার কিছু নেই। তবে আমাদের সময় তো এসব ছিল না রে। স্কুলে দিদিরা কী পেটান পেটাত। আমরা কি মানুষ হইনি? আজকাল কারও কান ধরলেও শহরসুদ্ধ লোক চলে আসে। টিভিতে ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায়। ভয় লাগে। ক্লাস করাই, না বর্ডারে পাহারা দি বুঝতে পারি না। ক্লাস এইটের সঞ্চিতার কথা শুনেছিস তো?”
আমি বললাম, “না, আমি দুদিন আসিনি তো। কী হয়েছে?”
আদৃতা চারদিকে তাকিয়ে বলল, “একটা ছেলের সঙ্গে সিনেমা গেছিল স্কুল পালিয়ে। পড়বি তো পড় বাবার সামনে। মেয়েকে নিয়ে স্কুলে চলে এসেছিল। কী হম্বিতম্বি! তারপর হেডু বোঝাল, দেড় হাজার মেয়ের মধ্যে কোন মেয়ে স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে গেছে সেটা দেখা আমাদের কাজ না। তাতেও মানে না।”
আমার চোখ মোবাইলের দিকে চলে যাচ্ছিল। মেসেজ করছে না সে অনেকক্ষণ। মিটিংয়ে ঢুকেছে। নতুন চাকরি বলে কথা। বেশি বিরক্ত করাও ঠিক না। কিন্তু আমার এরকম হয় কেন? সারাক্ষণ মোবাইল দেখে চলেছি! চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে আমার একদিন। আমি জানি। আমার দ্বারা সব একসঙ্গে হবে না।
বীণাদি এই গরমেও উল বুনছেন। দূরে বসেছেন। বীণাদিকে সবাই সমীহ করে চলে। বাড়তি কথা বলেন না। তবে মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলে বসেন যে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যায়। ভদ্রমহিলার রসবোধ প্রচুর। তবে ভীষণ উইটি। মোটা দাগের কোনও রসিকতা করেন না।
আমার অবশ্য ভালো লাগে বীণাদির শাড়ির কালেকশন। এত ভালো ভালো শাড়ি পরেন যে দু চোখ ভরে দেখতে হয়। সামনের অক্টোবরে রিটায়ার করবেন। তবু কোনও কামাই নেই। ছাত্রীদের প্রাণভরে ভালোবাসেন। এরকম একজন শিক্ষিকা অনেক তপস্যা করলে পাওয়া যায়।
আদৃতার খাওয়া হয়ে গেছিল। বেসিনে গেল। টিচারস রুম ফাঁকা। বাকিরা ক্লাসে চলে গেছেন।
বীণাদি হঠাৎ উল বোনা থামিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই মেয়ে, প্রেম করছিস?”
আমার কান মাথা লাল হয়ে গেল।
কী ভীষণ লজ্জা পেলাম!
১৫ আত্রেয়ী
শহরে অফিস টাইমে চারদিকে এত হাত সব সময় উদ্যত হয়ে থাকে যে ভয় লাগে। মানুষ এরকম কেন হবে? বাবার বয়সি, কাকুর বয়সি, জেঠুর বয়সি, দাদুর বয়সি লোকেরা পিষে দিচ্ছে বাসে, মেট্রোতে সর্বত্র। স্কুল থেকে বেরিয়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ দম আটকে দাঁড়িয়ে থাকি।
