বসার ঘরে বসিয়ে দশ মিনিট পরে একটা পাঞ্জাবি পরে সোফায় ঘুম ঘুম চোখে বসেছেন। মনে হচ্ছে যে-কোনো সময় ঘুমিয়ে পড়বেন। মধ্য চল্লিশ বয়স ভদ্রলোকের। শ্যামবর্ণ। ক্লিনশেভড। মাথায় কাঁচাপাকা চুল।
মানালি একটু গলা খাঁকরিয়ে বলল, “স্যার, আধঘণ্টায় হয়ে যাবে।”
ধ্রুব বললেন, “কী হবে আধঘণ্টায়? এ কি ইন্টারকোর্স পেয়েছেন নাকি? সেটার জন্য অবশ্য আধঘণ্টা আবার বেশি টাইম।”
মানালির কান মাথা লাল হয়ে গেল। ঋপণের দিকে তাকাল সে। ঋপণ অনেক কষ্টে হাসি চাপছে।
সে বলল, “শুরু করি স্যার?”
ধ্রুব অন্যমনস্কভাবে বললেন, “করুন।”
মানালি মোবাইল রেকর্ডার অন করল, “স্যার, ‘ডার্ক লাভ’ সিনেমাটা তো একেবারেই ফ্লপ করে গেল। এখন কি নতুন কোনও প্রোজেক্টে কাজ করছেন?”
ধ্রুব বললেন, “ফ্লপ করল? কে বলেছে আপনাকে?”
মানালি আমতা আমতা করে বলল, “মানে স্যার বক্স অফিস তো তাই বলছে। ইনফ্যাক্ট আমিও নন্দনে একদিন দেখতে গেছিলাম। সেরকম লোক ছিল না।”
ধ্রুব জোরে জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “আমার কাছে ফ্লপ না। আমার কাছে ডার্ক লাভ ইজ আ বিগ হিট।”
ধ্রুব একটা সিগারেট ধরালেন।
মানালি বলল, “বক্স অফিসকে আপনি অস্বীকার করছেন তার মানে? কিংবা প্রোডিউসার যে আপনার প্রোজেক্টে ইনভেস্ট করছেন, তিনি রিটার্ন পাবেন না, এইসব ব্যাপার আপনাকে বদার করে না বলতে চাইছেন?”
ধ্রুব জোরে জোরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “কতগুলো পাবলিক সিনেমা বুঝবে না, তার দায় আমি নিই না।”
মানালি বলল, “কিন্তু স্যার, আপনার ফার্স্ট মুভি রেনেসাঁ তো দারুণ হিট ছিল। সেকেন্ডটাও…”
ধ্রুব হাত নাড়তে নাড়তে বললেন, “ওসব ফ্লুক। ফ্লুক এক্কেবারে। তখন তো সবে সিনেমা বানানো শিখছিলাম। এখন যতবার দেখতে বসি রোজ নতুন নতুন ভুল পাই। তার তুলনায় ডার্ক লাভ অনেক পরিণত। আপনি তো দেখেছেন, আপনিই বলুন কেমন হয়েছে?”
মানালি ইতস্তত করে বলল, “ভালোই লেগেছে স্যার।”
ধ্রুব অবাক গলায় বললেন, “ভালোই লেগেছে? মানে নিতান্ত অনিচ্ছায় বলছেন আর কি! তা বলুন শুনি কোন জায়গাটা ভালোই লেগেছে।”
মানালি প্রমাদ গুনল, সিনেমাটা এত বোরিং ছিল যে সে ইন্টারভ্যালের আগেই বেরিয়ে গেছিল। সে ঠিক করল সত্যিটাই বলবে। মরিয়া হয়ে বলল, “স্যার, সত্যি কথা বলতে কী আমি কিছু বুঝিইনি সিনেমাটা।”
ধ্রুব খুশি হয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “গুড। আপনার ভালো লাগলে নিজের সিনেমা বানানোর প্রতিভাটাকেই সন্দেহ করতে শুরু করতাম আমি।”
মানালি বলল, “মানে?”
ধ্রুব বললেন, “মানে বুঝে কাজ নেই। নেক্সট কোয়েশ্চেন।”
মানালির অপমানিত লাগছিল। সে নোটপ্যাড দেখে পরের প্রশ্নটা করল, “অ্যাকট্রেসরা বলেন আপনি দুর্মুখ।”
ধ্রুব বললেন, “শুই না বলে। দামি দামি নেকলেস কিনে দিই না বলে।”
মানালি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “এটা অন রেকর্ড বললেন?”
ধ্রুব বললেন, “অফকোর্স, নেক্সট।” ধ্রুব ধোঁয়ার রিং করতে শুরু করলেন।
ঋপণ বলল, “স্যার, কয়েকটা ফটো তুলব আপনার?”
ধ্রুব বললেন, “তোলো। তোমাদেরও তো চাকরি করতে হবে।”
মানালি বলল, “আপনি কাজ না পেলে যদি প্রোডিউসার বলেন রিমেক বানাতে, আপনি বানাবেন?”
ধ্রুব বললেন, “তার থেকে ব্যান্ডেল লোকালে কন্ডোম বেচব।”
ঋপণ ভয়ে ভয়ে বলল, “স্যার, লোকাল ট্রেনে কেউ কন্ডোম বেচে না।”
ধ্রুব বললেন, “সেইজন্যই তো দেশটায় এইচআইভি বেড়ে যাচ্ছে। বয়ঃসন্ধির সময় ছেলেকে সেক্স এডুকেশন দেবে না, ছেলে পর্ন দেখে মাস্টারবেট করবে, তারপরে খারাপ পাড়ায় গিয়ে জীবনটা বরবাদ করবে। এ দেশের ওপর আমি আর কোনও আশা করি না।”
মানালি বলল, “স্যার আপনার বয়ঃসন্ধি কীভাবে কেটেছে?”
ধ্রুব বললেন, “নর্থ বেঙ্গলে। বাবা মারা গেছিলেন ছোটোবেলাতেই। ওই সময়টা আর পাঁচটা বাঙালি ছেলেদের মতো কেটেছে। তবে কপাল ভালো সেই সময় মোবাইল ছিল না।”
মানালি বলল, “আপনি কি মোবাইলের বিরোধী?”
ধ্রুব বললেন, “মোবাইলের ওপর রাগার সংগত কারণ আছে। টরেন্টের ওপরেও। একটা ইউনিটের এত এত পরিশ্রম, এত ইনভেস্টমেন্ট একটা ইল্লিগাল টরেন্ট মুহূর্তে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনে সিনেমা ঢুকে যাচ্ছে। সেই নাইন্টিজেও ক্যাসেটের রমরমা ছিল। তারপরে ঢুকে গেল এমপি থ্রি। লোকের অ্যালবাম বেরোচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে তা সিডিতে পাইরেসি হয়ে যাচ্ছে। আগে একটা লোকের দুটো গান থাকত একটা অ্যালবামে। তার পরিবর্তে একটা সিডিতে ছশোটা গান ধরে গেল। এবং সবটাই পাইরেটেড। বাজারটা, এত লোকের এত এফোর্ট, এত প্রতিভা চোখের সামনে ওই একটা চাকতি নষ্ট করে ফেলল। টেকনোলজি ইজ আ বিচ।”
মানালি বলল, “স্যার, টেকনোলজি ছিল বলেই তো আপনারা এত ভালো ভালো ক্যামেরা পাচ্ছেন।”
ধ্রুব বললেন, “তখন সিনেমা ভালো হত, না এখন? আপনার কী মনে হয়?”
মানালি উত্তর দিতে পারল না।
ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে মানালি বলল, “স্যার, আপনাকে কাল আমি ফোন করেছিলাম। নিশ্চিন্তিপুরের শিশুমৃত্যু…”
ধ্রুব বললেন, “পড়েছি রিপোর্টটা।”
মানালি বলল, “স্যার, আপনার ব্যাপারটা সেলফ কনফ্লিকটিং লাগে না? একদিকে আপনিই সরকারি কমিটিতে আছেন, অন্যদিকে আপনিই এত কিছু বলে দিচ্ছেন।”
ধ্রুবর সিগারেট শেষ হয়ে গেছিল। তিনি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে মানালির দিকে তাকিয়ে বললেন, “নো কমেন্টস।”
