মিসেস রায় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় মাসি মানালিকে নিয়ে ঢুকল। তাকে দেখে বলল, “এই তো, দীপু এসে গেছে। মানালি, এই দেখ দীপু।”
মানালি কিছু না বুঝে তার দিকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকাল।
দীপ কী বলবে বুঝতে না পেরে ক্যাবলার মতো হাসল।
মানালি তার মার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি এখানে আমাকে সম্বন্ধ দেখাতে নিয়ে এসেছ?”
মিসেস রায় হেসে বললেন, “না, না, ওসব কিছু না। বস না।”
মানালি গম্ভীর হয়ে বসে বলল, “দেখুন, প্রথমেই বলে দি আমার কিন্তু বয়ফ্রেন্ড আছে।”
দীপের হাসি পেল। সে বলল, “হ্যাঁ, আমারও গার্লফ্রেন্ড আছে।”
মা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বলল, “তোর গার্লফ্রেন্ড আছে? এই যে তোকে রোজ রোজ এত করে জিজ্ঞেস করি, কোনও দিনও তো বললি না?”
দীপ বলল, “এতদিন ছিল না। এখন আছে।”
মা মুখ কালো করে বসে থাকল। মিসেস রায় রেগেমেগে বললেন, “মানালির বয়ফ্রেন্ড নেই। থাকতেই পারে না। বয়ফ্রেন্ড থাকলে আমি ঠিক জানতে পারতাম।”
মানালি বলল, “কী আশ্চর্য, বাড়িতে জানিয়ে কেউ প্রেম করে নাকি?”
মেসো এসে গেছিল। একটা বই নিয়ে এসে গম্ভীর মুখে পড়তে লাগল, “শোনো তোমরা, আমার গুরুদেব শ্রী শ্রী একশো আট চাঁদবদন মহারাজ বলেছেন, এখন ঘোর কলি উপস্থিত। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা এখন বাবা-মাকে লুকিয়ে প্রেম করা শিখেছে। ইহা পাপের পথ। পুণ্যের পথ হল প্রেম না করা। বাবা-মার দেখানো পথে বিবাহ করা।”
এতটা পড়ে মেসো গোঁফে তা দিয়ে বলল, “কী বুঝলে?”
মানালি হেসে ফেলল। দীপও।
মা রাগি গলায় বলল, “গোটা প্ল্যানটাই মাঠে মারা গেল।”
মিসেস রায় হতাশ গলায় বললেন, “সত্যিই ঘোর কলি।”
মাসি ব্যাজার গলায় বলল, “আমি কড়াইশুঁটির কচুরি বানিয়েছিলাম। দীপুর মতো ক্যাবলারও যে গার্লফ্রেন্ড থাকবে তা কী করে জানব?”
মা বলল, “আমি আর এসবে নেই। যা করবে নিজে নিজে করুক।”
দীপ বলল, “মাসি, কচুরিটা দাও। খেয়ে আমি যাই। মা থাকুক।”
মা গম্ভীর হয়ে বসে রইল। মেসো ধর্মের বাণী পড়ে যেতে লাগল। দীপ মোবাইল ঘাঁটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে ব্রেকফাস্ট হয়ে গেলে দীপ বলল, “আমি যাই।”
মানালি সবাইকে চমকে দিয়ে তাকে বলল, “আপনি কি রুবি হয়ে যাবেন?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ।”
মানালি বলল, “আমাকে একটু ড্রপ করে দেবেন?”
দীপ বলল, “শিওর। চলুন।”
সবার হতভম্ব চোখের সামনে দিয়ে দুজনে বেরিয়ে গেল।
গাড়ি স্টার্ট হলে মানালি বলল, “আমার সিক্সথ সেন্স বলছিল আজ কিছু একটা এরকম ঝামেলা হবে। নইলে মিনু আন্টি এরকম সকাল সকাল ডাকে না কোনও দিন।”
দীপ বলল, “আমি বুঝিনি। ভেবেছিলাম মা দীক্ষা-টিক্ষা নেবে। ইদানীং ধর্মে মতি হয়েছে।”
মানালি বলল, “উফ। আমার মাও। এইসব জায়গা থেকেই এঁদের মাথায় এসব বুদ্ধি আসে বোঝা যায়।”
বাইপাসে হালকা জ্যাম আছে। দীপ বলল, “আপনি রিপোর্টার?”
মানালি হাসল, “হ্যাঁ, এই তো সবে ছ-মাস হল জয়েন করেছি।”
দীপ বলল, “কোন মিডিয়া?”
মানালি বলল, “সময়ের কণ্ঠস্বর।”
দীপ বলল, “আপনার বয়ফ্রেন্ডও সাংবাদিক?”
মানালি হাসতে হাসতে বলল, “আমার বয়ফ্রেন্ড নেই।”
দীপও হেসে ফেলল, “আপনার মা তাহলে ঠিকই ধরেছিলেন। উনি যদি প্রমাণ চান তাহলে কী করবেন?”
মানালি বলল, “চাইবে না। চাইলে দেখা যাবে।”
দীপ বলল, “সকাল থেকে এত ভয়ংকরভাবে দিনটা শুরু হল। বাকি দিনটা কেমন যাবে কে জানে।”
মানালি বলল, “সিরিয়াসলি। এমনিতেই অফিস যাওয়া আর ল্যান্ডমাইনের ওপর হাঁটা এখন এক হয়ে গেছে। তার ওপর এসব। কোন শ্বশুরবাড়ি মানবে বলুন তো বউমা রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরবে? সবাই বলবে চাকরি ছাড়তে। আর আমি একেবারেই তার জন্য প্রস্তুত নই।”
দীপ বলল, “চাকরি ছাড়তে যাবেন কেন? যারা ছাড়তে বলবেন, তাদের ছেড়ে দেবেন বরং।”
মানালি বলল, “একজ্যাক্টলি। আমারও তাই মত। বাই দ্য ওয়ে, আপনার গার্লফ্রেন্ড কী করেন সেটা জানা হল না। নাকি তিনিও আমার জনের মতোই অস্তিত্বহীন?”
দীপ বলল, “না না, অস্তিত্ব আছে। ইনফ্যাক্ট আজকে আমরা প্রথম মিট করব। তবে কী করে-টরে অত কিছুই জানি না। সেসব জানতেই মিট করব আজকে।”
মানালি বলল, “বাহ। অভিনব ব্যাপার তো! তার মানে আপনি এখন ভিত গড়ছেন।”
দীপ হেসে বলল, “একেবারেই।”
মানালি বলল, “বেস্ট অফ লাক।”
দীপ বলল, “থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।”
রুবি এসে গেছিল। দীপ বলল, “এখানে নামাব?”
মানালি বলল, “হ্যাঁ। বাঁদিকের বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিন। আপনাকে অনেকগুলো থ্যাংকস।”
দীপ হাসল। মানালিকে নামিয়ে খানিকটা এগিয়ে গাড়িটা রাস্তার বাঁদিকে দাঁড় করাল।
চিত্রলেখাকে ফোন করতে হবে।
৪
ধ্রুব বাগচী বিরক্ত মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। মানালির অস্বস্তি হচ্ছিল। দুপুর আড়াইটে বাজে। লোকটা কি এখনও ঘুমাচ্ছিল? চোখ মুখ দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে অনেকটা। একটা মাঝারি মাপের টু বিএইচকে ফ্ল্যাট। চারদিকে অগোছালো। দেওয়ালে বড়ো বড়ো কয়েকটা সিনেমার পোস্টার। জলসাঘরের ছবি বিশ্বাসের একটা বড়ো পোর্ট্রেট। অভিমানের অমিতাভ-জয়ার পোস্টার। ধ্রুব বাগচীর সিনেমার কয়েকটা পোস্টার।
মানালি অফিস থেকে ফোন করেই এসেছিল। তবু কলিং বেল বাজানোর পরে দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হল। ধ্রুব দরজা খুলে ঘুম জড়ানো চোখে প্রথমেই বলেছেন, “কাজ-টাজ নেই এখন মা, পরে এসো।” মানালি পরিচয় দিতে দরজা খুলেছেন। ফটোগ্রাফার ঋপণ এসেছে তার সঙ্গে।
