“স্যার আপনি তো অনেকটাই বললেন।”
“আমি কিছু বলিনি। একটা মাতাল যেরকম বলে আমি সেরকম বলেছি। রাখো এবার। এরপরে আবার কবে কোন শিল্পপতি বা চিটফান্ডপতি যখন ঠিক করে দেবেন কোন প্রতিবাদ তাঁরা ফান্ডিং করবেন, তখন আমি পথে নামব। মনে রাখবে আমি চাকরি করি না, আমার ফিক্সড ইনকাম নেই। নাও গো টু হেল।”
ফোনটা কেটে গেল।
মানালি বড়ো করে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, “বাবা! পুরো আগুন।”
বিশ্বরূপদা বলল, “যাহ্, তোর ছুটি। আর-একজন আমি করে নেব।”
মানালি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “হঠাৎ এত উদারতা?”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “আমি তো ধ্রুব বাগচীর রিঅ্যাকশানটাই চাইছিলাম। আমি ফোন করলে আরও খিস্তি খেতাম। আগের উইকেই ওঁর একটা সিনেমাকে আমরা ওয়ান স্টার দিয়েছিলাম, ভুলে গেলি?”
মানালি বিশ্বরূপদার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, “খুন করে ফেলব তোমায় বিশ্বাস করো।”
বিতস্তা পাশ থেকে বলল, “আমিও।”
৩
দীপের ঘুম ভাঙল সকাল সাড়ে সাতটায়।
উঠেই শুনতে পেল বাইরের ঘরে বাবা কাগজের লোকটাকে তুমুল ঝাড়ছে। ঘরে বসেই শোনা যাচ্ছে বাবা বলছে, “কাগজগুলো একটু সকালে দেওয়া যায় না? এতক্ষণ ধরে কী করা হয় শুনি? আমাদের আশেপাশে ডাইনে বাঁয়ে সব বাড়ি কাগজ পেয়ে যায় সকাল সাড়ে ছটার মধ্যে, আর তুমি এতক্ষণ ধরে কোথায় গাব জাল দাও হে? আমি তো ওদের থেকেই কাগজ নিতে পারি, তোমার থেকে কেন নেব শুনি?”
লোকটা মিনমিন করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু বাবা শুনল না।
বেশ রাগি গলায় চ্যাঁচামেচি চলতে লাগল।
দীপ উঠে ড্রয়িং রুমে এল।
মা তৈরি হয়ে গেছিল। তাকে দেখে ব্যস্ত গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে, আমরা এখনই বেরোব।”
দীপ হাই তুলতে তুলতে বলল, “আমাকে ডাকোনি কেন?”
মা বলল, “তোর আর কতক্ষণ লাগে? যা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। ভালো পাঞ্জাবিটা পরবি।”
দীপ অবাক গলায় বলল, “ভালো পাঞ্জাবি পরার কী আছে? একটা পরলেই হল।”
মা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “না, না, ওখানে তোর মেসোর গুরুভাইরা অনেকে আসবে। ছেঁড়া জামা-টামা পরবি না একদম। আগে থেকে বলে রাখলাম।”
দীপ বিরক্ত মুখে কমোডে গিয়ে বসল। বাইরে বাবার চ্যাঁচ্যামেচি এবার কমেছে। মা বাবাকে ঝাড়তে শুরু করেছে জায়গার জিনিস কেন জায়গায় নেই তা নিয়ে।
মিনিট পনেরো পর সে মাকে নিয়ে বেরোল। মা গাড়িতে উঠে বলল, “মিনুর ওখানে একটু থাকবি। আমাকে নামিয়ে দিয়েই চলে আসবি না।”
দীপ গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল, “কেন, কী ব্যাপার আবার?”
মা বলল, “আমার একটা মান সম্মান নেই নাকি? নামিয়ে দিয়ে চলে আসবি, সবাই কী ভাববে?”
শনিবার হলেও সকালে কলকাতার রাস্তায় যথেষ্ট জ্যাম আছে। দীপ সাবধানে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, “কী আর ভাববে, সবাই কি আর পর নাকি? নিজের মাসি নিজের মেসো, চিন্তার কী আছে?”
মা বলল, “সেসব বুঝতে গেলে তোকে বড়ো হতে হবে। এখনও তো ছোটোই থেকে গেলি।”
দীপ কিছু না বলে এফএমটা চালিয়ে দিল। কথায় কথা বাড়বে। ঠিক করল খানিকক্ষণ বসে কেটে পড়বে। মেসো এখন এক নতুন গুরুর দীক্ষা নিয়েছে। মেসোর কাছে বসলেই বিভিন্ন নীতিকথা শুনতে হয়। সেসময় দীপের কান মাথায় আগুন জ্বলতে শুরু করে। ওখান থেকে পালানোও যায় না, আবার বকবকগুলো শুনেও যেতে হয়।
নটা পনেরো নাগাদ মাসির বাড়ি পৌঁছোল তারা।
মা বলল, “আমি কিন্তু আবার বলছি, আগে আগে কোথাও যাবি না।”
দীপ বলল, “ঠিক আছে।”
মেসো দরজা খুলল। তাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, “আরে, দীপ যে, আয় আয়, ভালো সময়েই এসেছিস। মানালিও এখনই এল জাস্ট।”
দীপ অবাক হয়ে মার দিকে তাকাল। মা বলল, “ভিতরে চ।”
দীপ বলল, “এই সকালে মেয়ে দেখাতে নিয়ে এলে নাকি?”
মা বলল, “বললাম তো ভিতরে চ, বলছি।”
দীপের রাগ হচ্ছিল। এরকম জানলে সে কিছুতেই আসত না। ইদানীং তাদের বাড়ি থেকে তার বিয়ে নিয়ে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু এই প্ল্যানে যে মাসিকেও মা ইনক্লুড করে নিয়েছে সেটা খেয়াল ছিল না।
মাসিদের ড্রয়িংরুমে এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। দীপ চিনল না।
মেসো পরিচয় করিয়ে দিল, “মিসেস রায়।”
মিসেস রায় উঠে হাত জোড় করলেন। মা বসতে বসতে বলল, “আমাদের ফোনে কথা হয়েছে।” মিসেস রায় হেসে বললেন, “হ্যাঁ।” মা তার সঙ্গে মিসেস রায়ের পরিচয় করিয়ে দিল। দীপ দাঁত বের করে বন্ধ করল।
মা মেসোর দিকে তাকাল, “মিনু কোথায়?”
মেসো বলল, “মানালিকে নিয়ে ছাদে বাগান দেখাতে গেছে। দাঁড়ান ডেকে দিচ্ছি।”
মেসো বেরিয়ে যেতে মিসেস রায় বললেন, “মানালি জানতে পারলে একটু রাগারাগি করতে পারে।”
মা বলল, “করলে করুক। সব বাড়িতে বাড়িতে এখন এই সমস্যা বুঝলেন? বিয়ের কথা বললেই ঠিক কিছু না কিছু ছুতো করে ঠিক পালিয়ে যাবে।”
মিসেস রায় অবাক হয়ে দীপের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও জানে তো?”
মা হাসতে হাসতে বলল, “না।”
দীপের রাগ হচ্ছিল। সে কিছু বলল না।
মিসেস রায় বললেন, “ওর বাবা নাগপুরে গেছে অফিসের কাজে। আপনাদের প্ল্যানটা শুনে বেশ এক্সাইটেড। এমনিতে তো মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তা করতে হয় আজকাল। খবরের কাগজের কাজ, বুঝতেই পারেন।”
মা বলল, “আমার ছেলের কি কম? সেই যে সকালে বেরোয়, অফিস থেকে কখন ফিরবে তার কোনও ঠিক নেই।”
