অনুপবাবু সাধারণ মানুষের ফোন ধরেন না। আননোন নাম্বার থেকে ফোনও ধরেন না। তবে তাদের অফিসের ফোন নাম্বার অনুপবাবুর ফোনে সেভ করা আছে। তিনটে রিং হতেই পরিশীলিত কণ্ঠে ফোন ধরে বললেন, “বলুন।”
মানালি বলল, “হ্যাঁ দাদা, আমি মানালি বলছি সময়ের কণ্ঠস্বর থেকে।”
“হ্যাঁ বলো।”
“বলছি দাদা, একটা ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানার ছিল।”
অনুপ একটু কেশে বললেন, “কী বিষয়ে?”
মানালি বলল, “নিশ্চিন্তিপুরের শিশুমৃত্যু দাদা।”
অনুপ খুব জোরে কাশতে লাগলেন। বেশ কয়েক মিনিট পরে বললেন, “আমার একটু কাশি হয়েছে বুঝলে, তা ছাড়া নিশ্চিন্তিপুরে আমি কোনও দিন যাইনি…”
মানালি হতাশ স্বরে বলল, “কিছু একটা বলুন দাদা।”
অনুপ সতর্ক গলায় বললেন, “না গো, যেখানে যাইনি, তা নিয়ে কিছু বলাটা ঠিক হবে না।”
মানালি একটু রেগে বলল, “আপনি তো দণ্ডকারণ্যেও কোনও দিন যাননি দাদা। ওটা নিয়ে একটা গোটা কবিতার বই আছে আপনার।”
অনুপ ফোনটা কেটে দিলেন।
মানালি ফোনটা রেখে একটা গালাগাল দিল।
সে লিস্টটায় চোখ রাখল আবার। বিদ্রোহী গায়ক টিংকু বড়াল আছেন লিস্টে।
মানালি ফোন করল, ফোনটা ধরলেন টিংকুবাবুর সেক্রেটারি। মানালি বলল, “টিংকুবাবুকে ফোনটা দেওয়া যাবে?”
সেক্রেটারি জানালেন টিংকুবাবু বলেছেন অ্যাপিয়ারেন্স ফি না দিলে ইদানীং উনি সব ব্যাপারে বিদ্রোহ জানানো বন্ধ রেখেছেন।
মানালি শ্বাস ছেড়ে নিজের হাতের তাস খেলল। দুজন প্রবীণ অভিনেত্রী। ইদানীং তাঁরা বসে আছেন। ফোন করলে ফোন ছাড়তে চান না। দুজনেই গ্রেড বি লিস্টে আছেন। কুড়ি মিনিট নিজেরা যখন মা ছিলেন তখন কীভাবে অভিনয় সামলে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন ইত্যাদি বকলেন।
একটু ভেবে মানালি একজন চিত্রকর এবং একজন ভাস্করকে ফোন করল। দুজন ভদ্রলোক ভালোভাবেই প্রতিক্রিয়া দিলেন।
মানালি দেখল ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁই ছুঁই। ফোন ধরে সে বিড়বিড় করে বলল, “স্টিল টু রিমেইনিং। মিস মানালি রয়, আজ তো তু গয়া।”
বিশ্বরূপদা চেম্বার থেকে বেরিয়ে তার ডেস্কে এসে বলল, “কি রে, আর কটা?”
মানালি হতাশ গলায় বলল, “গ্রেড এ দুটোই বাকি এখনও।”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “গ্রেড এ-দের পাবি কী করে? সবাই এখন কমিটি হেড।”
মানালি বলল, “তাহলে কী করব?”
বিশ্বরূপদা একটু ভেবে বলল, “কল ধ্রুব বাগচী।”
মানালি চোখ মুখ শক্ত করে বলল, “না। আটটা বাজে। লোকটা শিওর মাল খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।”
বিশ্বরূপদা হাসতে হাসতে বলল, “ওইজন্যই তো তোকে ফোন করতে বলছি। সুস্থ অবস্থায় থাকলে প্রতিক্রিয়া দিত নাকি?”
মানালি বলল, “উনি খুব উলটোপালটা কথা বলেন।”
বিশ্বরূপদা বলল, “তাতে কী? তোর গায়ে ফোসকা পড়বে?”
মানালি বলল, “হ্যাঁ পড়ে। তুমি করো।”
বিশ্বরূপদা বলল, “সব সময় আমি থাকব না মা। আজ থেকে একমাস পরেই হয়তো পারব না। তখন কী করবি?”
মানালি অবাক গলায় বলল, “এক মাস পরে কোথায় থাকবে তুমি?”
পাশের ডেস্ক থেকে বিতস্তা বলল, “শুনিসনি? রিউমার তো হাওয়ায় ঘুরছে।”
মানালি হাঁ হয়ে বিশ্বরূপদার দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রিউমার?”
বিশ্বরূপদা বলল, “দ্যাটস নট ইম্পর্ট্যান্ট মা। কল ধ্রুব। তারপর কাকে করবি বলে দিচ্ছি।”
বিতস্তা ফুট কাটল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বিশ্বরূপদা তো কাটাতেই চাইবে।”
বিশ্বরূপদা বিতস্তার দিকে কড়া চোখে তাকাল। বিতস্তা কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
অগত্যা মানালি ধ্রুব বাগচীর নাম্বার ডায়াল করল, দুটো রিং হতেই ধরলেন ধ্রুব, “কে?”
“স্যার, আমি সময়ের কণ্ঠস্বর থেকে বলছি।”
“ওহ, দ্যাট শিট পেপার? ওটা তো আমি টয়লেট পেপার হিসেবে ইউজ করি। সুন্দর পেছন মোছা যায়।” জড়ানো গলায় কাটা কাটা কথাগুলো তিরের মতো ভেসে এল।
মানালির মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে বিশ্বরূপদার দিকে তাকাল। বিশ্বরূপদা হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে।
মানালি অনেক কষ্টে মাথা ঠান্ডা করে বলল, “স্যার, আমি নিশ্চিন্তিপুরের শিশুমৃত্যু নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া পাবার জন্য ফোন করেছি।”
“আমি কটা কমিটির মাথায় এই মুহূর্তে আছি জানো মামণি?”
“না স্যার।”
“তবে? তুমি কি চাও আমার আমার মাসোহারাগুলো বন্ধ হয়ে যাক? হলে খুশি হবে?”
“না স্যার। জাস্ট কিছু একটা প্রতিক্রিয়া দিলেই হবে স্যার।”
“কিছু একটা?” ধ্রুব বাগচী চেঁচিয়ে উঠলেন ওদিক থেকে, “শিশুমৃত্যু তোমাদের কাছে ইয়ার্কির জিনিস বলে মনে হয়? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া ওইটুকু বাচ্চাগুলো যারা জন্মানোর পর কেন মারা যাচ্ছে? তোমাদের লজ্জা লাগে না? একটা ফিল্মস্টারের বাচ্চা হবে বলে তোমরা ধেই ধেই করে চিয়ারলিডারদের মতো নাঙ্গা নাচ নেচে বেড়াচ্ছ, আর গরিব মানুষগুলোর সন্তান মারা যায়, তোমাদের একটা বালও ছেঁড়া যায় না? তোমরা সকালে উঠে আয়নায় নিজেদের মুখ দেখে চমকে ওঠো না?”
এতগুলো কথা হঠাৎ করে শুনে মানালি কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, “স্যার আপনি এই নিয়ে গভর্নমেন্টকে কিছু বলেছেন?”
“আমি?” ধ্রুব বাগচী হো হো করে হাসতে শুরু করলেন, “আমি কেন বলতে যাব? আমার বুদ্ধি আছে বলেই তো আমি বুদ্ধিজীবী। ইউ নো হোয়াট, সব বুদ্ধিজীবীদেরই বুদ্ধি আছে। তারা সিলেক্টিভ বিষয় ছাড়া, নিজেদের সব দিক থেকে নিরাপদ না দেখে মুখ খুলবে না। আমিও খুলব না।”
