বিপি চলে এসেছিল। রাম সোডা মিশিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “ফোনটা রাখো বাল।”
দীপ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রামকে ইশারা করে ফোনে বলল, “ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের যুগের নাম। ঠিক ঠিক, মনে পড়েছে। তবে আপনি দেবসেনা হলেও মন্দ হত না। যেভাবে জুতো নিয়ে ফাইট দিলেন।”
“আপনি কি বাড়ি গেছেন?”
“না। জাস্ট অফিস থেকে বেরোলাম। বাড়ি যেতে যেতে আটটা-নটা হবে। কেন বলুন তো?”
“কাল কী করছেন?”
দীপ একটু সময় নিয়ে ভেবে বলল, “কাল অনেক কাজ। মাকে নিয়ে মাসির বাড়ি যাব, তারপর অফিসের কিছু কাজ আছে, সেগুলো নিয়ে বসব।”
“আপনি উইকেন্ডেও অফিসের কাজ করেন?”
“সব সময় করি না, কাজ থাকলে করতে হয়।”
“ওহ। তাহলে ঠিক আছে।”
“কেন, আপনি দেখা করতেন?”
“নাহ। আমি এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
“ও। দেখা করলে বলতে পারেন। লজ্জা পাবেন না।”
“লজ্জা পেলে তো ফোনই করতাম না। তা ছাড়া আমি শনিবার কারও সঙ্গে দেখা করি না।”
“ওরে বাবা, আপনি এসব বার-টার মেনে চলেন?” গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল দীপ।
চিত্রলেখা বলল, “আমি না মানলেও মানতে হয় মার জ্বালাতনে। নিরামিষ খাইয়ে রেখে দেবে গোটা দিনটায়।”
“মার জ্বালায়? নিজের ইচ্ছাতে না বলছেন?”
“একেবারেই না।”
“তাহলে তো কালই মিট করতে হচ্ছে আপনার সঙ্গে। এবং অবশ্যই ননভেজ রেস্তোরাঁয়। করবেন?”
“ও বাবা। আপনি বিদ্রোহী প্রকৃতির পাবলিক দেখে তো মনে হয় না।”
“কী মনে হয় তবে? পেটরোগা বাঙালি?”
“হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই।”
রাম রাগ রাগ চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। দীপ বুঝল এবার ফোনটা না রাখলে খিস্তি খাবার সমূহ চান্স আছে। সে বলল, “তাহলে কী করবেন? কাল দেখা করবেন এবং আমিষ খাবেন? প্রথম দেখাটাই কমফোর্ট জোনের বাইরে করে দেখুন না।”
চিত্রলেখা একটু ভেবে বলল, “তাই হোক। কোথায় কখন মিট করবেন এসএমএস করে জানান। আমি হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুক কোনোটাই ইউজ করি না।”
দীপ চোখ কপালে তুলে বলল, “ওরে বাবা, আপনিই তো সেই আদর্শ নারী যাকে কট্টরবাদী মেল শভিনিস্টরা পুজো করে।”
চিত্রলেখা বলল, “সেসব না, অ্যাকচুয়ালি আমার লাস্ট ব্রেকআপের পরে আমি এসব থেকে বিদায় নিয়েছি।”
দীপ একটু নিভে গিয়ে বলল, “ও। আপনার প্রেমও ছিল?”
চিত্রলেখা বলল, “ছিল। কেন আপনার ছিল না?”
দীপ বলল, “সব কথা আজকেই বলবেন?”
চিত্রলেখা বলল, “ভ্যালিড পয়েন্ট। ওকে, আপনি আমাকে এসএমএস করুন। গুড নাইট।”
দীপ গুড নাইট বলে ফোন রাখল।
রাম বলল, “কার শ্রাদ্ধ করছিলি ভাই?”
দীপ বলল, “তোর গুষ্টির। শোন, আমি আজ মানিব্যাগ আনিনি। বিল তুই দিচ্ছিস।”
রাম কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “জীবনে প্রথম একটা পাবলিক দেখলাম যে মানিব্যাগ ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোয়। তোরই হবে ভাই।”
দীপ রামের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
২
সন্ধে ছটার সময় ডেস্ক থেকে যখন ব্যাগ নিয়ে বেরোনোর জন্য মানালি উঠল, ঠিক তখনই ইন্টারকমের ফোনটা বেজে উঠল। মানালি বিড়বিড় করে বলল, “আই নিউ ইট।”
ফোনটা ধরতে এডিটর বিশ্বরূপদার গলা ভেসে এল “আর্জেন্ট, শিগগিরি আয়।”
মানালি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা ডেস্কে রেখে বিশ্বরূপদার চেম্বারে ঢুকল। বিশ্বরূপদা বসে বসে সামনে রাখা ডায়েরিতে কিছু একটা লিখছিল। তাকে দেখে বলল, “একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গেলে হবে?”
মানালি বুঝল তার বেরোনোটা বিশ্বরূপদা দেখে নিয়েছে। বলল, “আজ কাজ ছিল। যাক গে, বলো তোমার কী দাবি।”
বিশ্বরূপদা পেনটা ডায়েরির ওপর রেখে ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল, “তোর তো সামনে প্রচুর কাজ।”
মানালি চোখ ছোটো ছোটো করে বলল, “সে তো বুঝতেই পারছি, ভালো সাইজের একটা বাঁশ তৈরি করেছ আমার জন্য। বলে ফ্যালো।”
বিশ্বরূপদা বলল, “ছজন বুদ্ধিজীবীর প্রতিক্রিয়া নিতে হবে।”
মানালি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “ওকে। কী বিষয়ে?”
বিশ্বরূপদা বলল, “নিশ্চিন্তিপুরের শিশুমৃত্যু।”
মানালি বলল, “কবের মধ্যে লাগবে?”
বিশ্বরূপদা তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “ক্যালেন্ডার নয়, ঘড়ি ব্যবহার করতে হবে। সাড়ে সাতটার মধ্যে আই নিড অল রিঅ্যাকশানস।”
মানালি হাঁ করে বিশ্বরূপদার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার কি দয়া মায়া নাই গো?”
বিশ্বরূপদা বলল, “আর্জেন্ট মা। দেরি করিস না। যত তাড়াতাড়ি দিবি, তত তাড়াতাড়ি ছুটি।”
মানালি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠল, “ঠিক আছে। তারপরে যেন আবার কোনও কাজ গছিয়ে দিয়ো না।”
বিশ্বরূপদা হেসে বলল, “একদম না, ডিল ইজ ডিল।”
মানালি বলল, “কোনও প্রেফারেন্স আছে বুদ্ধিজীবীদের?”
বিশ্বরূপদা বলল, “না। তবে অন্তত দুজন গ্রেড এ ক্যাটাগরির লাগবে।”
মানালি বলল, “ওকে, ট্রায়িং।”
বিশ্বরূপদার ঘর থেকে বেরিয়ে ডেস্কে এসে বসল মানালি। পাশের ডেস্কে ঋভু আর বিতস্তা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে কপি লিখে যাচ্ছে। ওদের দিকে কিছুক্ষণ দেখে মানালি ডায়েরি খুলল।
বিশ্বরূপদা বুদ্ধিজীবীদের একটা গ্রেড বানিয়ে দিয়েছে। টিভি চ্যানেলে অ্যাপিয়ারেন্স ফি এবং তাদের প্রতিবাদের রেটের ওপর নির্ভর করে তিনটে গ্রেড বানানো।
চার্টটা দেখে প্রথমে কবি অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করল মানালি। অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেড এ বুদ্ধিজীবী কবি। ফেসবুক করেন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাট থেকে অরুণাচল সমস্ত ব্যাপারেই কবিতা লিখে থাকেন।
