দীপ অবাক হল, তবে কি চেনা কেউ? সে বলল, “কে বলছেন বলুন তো?”
“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন নাকি বলুন তো?”
দীপ অনেক ভেবেও গলাটা চিনতে পারল না। ঈষৎ রেগে বলল, “ফাজলামি না করে নামটা বলুন। আমি মাছ ধরতে আসিনি। ইম্পর্ট্যান্ট অফিস মিটিংয়ে আছি।”
“ওকে ওকে। তাহলে মিটিংয়ের পরেই ফোন করছি।”
“না না, বলুন কে বলছেন।”
ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল। দীপ অবাক হল। সে ওই নাম্বারে কলব্যাক করল।
ও প্রান্ত থেকে কেউ ফোন রিসিভ করল না।
দীপ নাম্বারটা সেভ করে চেষ্টা করল নাম্বারটা হোয়াটসঅ্যাপে আছে নাকি দেখতে।
কিছুই দেখতে পেল না। নাম্বারটায় আরও দু-তিনবার ফোন করল। সুইচড অফ বলছে।
এক সিনিয়র সমীর রায় সেমিনার হল থেকে বেরোচ্ছিলেন। তাকে দেখে বললেন, “আরে গাঙ্গুলি, বাইরে কী করছ?”
দীপ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “টয়লেটে গেছিলাম স্যার। বেরিয়ে এসে দেখলাম বাড়ি থেকে ইম্পর্ট্যান্ট একটা কল এসেছে।”
সমীর বললেন, “ওকে, ওকে। এখন চলে যাও।”
দীপ বলল, “শিওর স্যার।”
হলে ঢুকে নিজের চেয়ারে বসে দীপ বুঝল, সে এতটা সময় বাইরে ছিল, কিন্তু বক্তৃতা ওই একই জায়গায় ঘুরঘুর করছে। তার পাশে কলিগ রাম শুক্লা বসে ছিল। তার হাতে একটা চিমটি কাটল রাম। দীপ রামের দিকে তাকালে রাম ঘুম পাওয়ার ইঙ্গিত করল।
দীপ আড়চোখে দেখে নিল কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে নাকি। দেখল সমীর তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। সে তাড়াতাড়ি ভালো মানুষের মতো মুখ করে মিস্টার মেহতার দিকে তাকাল।
সেমিনার শেষ হল সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়। রাম অফিস থেকে বেরিয়ে তাকে বলল, “পুরা মাথা চেটে রেখে দিল ইয়ার। চ একটু ফুঁকে নি।”
দীপ বলল, “তুই ফোঁক। আমি বাড়ি যাই।”
রাম বলল, “আবে বাড়ি গিয়ে কী করিস তুই? বিয়ে-থাও তো করিসনি যে বউয়ের পিছন পিছন ছুটবি?”
দীপ বলল, “ল্যাদ খাব ভাই। ল্যাদ খাব। ল্যাদ বুঝিস ব্যাটা অবাঙালি?”
রাম বলল, “তোর থেকে আমি বেশি বাঙালি শালা। চ ভাই আজ ফ্রাইডে আছে, একটু ওপিয়াম ঘুরে যাই।”
দীপ বলল, “টাকা নেই। তুই একা একা খা গিয়ে।”
রাম বলল, “আবে তুই স্যালারির সব কি এসআইপি ফান্ডে ভরে দিস নাকি? মাল-টাল খাবার জন্য কিছু তো রাখতে পারিস?”
দীপ গম্ভীর গলায় বলল, “কাল চাকরি চলে গেলে কী করবি?”
রাম বলল, “তুই কী করবি? তুই তো এখনই কোটিপতি! কত টাকা সেভিংসে রেখেছিস কে জানে।”
দীপ রামের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞামিশ্রিত একটা হাসি হেসে বলল, “সেভিংসে রেখেছি বলেই তোদের মান্থ এন্ডগুলো আমি বাঁচাই। সেটা ভুলে গেলে হবে মামা?”
রাম দীপের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, “চল না ভাই একটু ওপিয়ামে। বেশি না, দু পেগ করে বিপি মেরে বাড়ি যাব। মাইরি বলছি।”
দীপ ব্যাজার মুখে বলল, “চল। এগুলো কিন্তু খুব বাজে খরচ ভাই।”
রাম বলল, “তাহলে একটা নিব কিনে নি? তোর গাড়িতে বসে মেরে দেব?”
দীপ বলল, “না, আমার মা কাল সকালে আমার সঙ্গে মাসির বাড়ি যাবে। গাড়িতে গন্ধ পেলে আমার গুষ্টির মা মাটি মানুষ করে দেবে। চ। ওপিয়ামেই চ।”
দুজনে ওপিয়ামে গিয়ে বসল। উইকেন্ডের বার এক্কেবারে গিজগিজ করছে। অতি কষ্টে দুজনে বসার জায়গা পেল।
দীপের ফোনের কথা খেয়াল হল। ফোনটা পকেট থেকে বের করতেই দেখতে পেল ফোনটা বাজছে।
বারে মিউজিকের শব্দ খুব বেশি জোরে হচ্ছে না। দীপ ফোনটা ধরল। ও প্রান্ত থেকে সেই অজানা নারী স্বর, “এবার ফ্রি তো?”
দীপ বলল, “হ্যাঁ। এবার কে বলছেন বলে আমায় কৃতার্থ করুন।”
“আপনার মেমোরি খুব খারাপ কিন্তু।”
দীপ অবাক হল, “কেন বলুন তো?”
“তিনদিন আগের বিয়েবাড়ির কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?”
দীপ হাঁ করে কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর বলল, “ওহ… বুঝেছি বুঝেছি… দেবুদার জুতো আটকে রেখেছিলেন… কী যেন নামটা?”
“ভুলে মেরে দিলেন এর মধ্যে?”
ও প্রান্তে ছদ্ম হতাশা।
দীপ বলল, “খুব কেমন কেমন নাম যেন একটা… কী যেন?”
“এমন কিছুই আনকমন নাম না, মনে করে দেখুন।”
বারটেন্ডার এসে দাঁড়িয়েছে। রাম তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কে বে?”
দীপ ফোনের স্পিকারটা চেপে বলল, “আর্জেন্ট ফোন, তুই বিপি বলে দে। এক প্লেট ফিশ ফিঙ্গার বলে দে।”
দীপ স্পিকারটা থেকে আঙুল সরিয়ে বলল, “আপনার নাম তো আমি দেবসেনা রেখেছিলাম। ওই নামটাই ভালো।”
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ ভেসে এল, “হ্যাঁ, ওটাই ভালো। তবে আপনি কিন্তু একেবারেই বাহুবলী নন। ভল্লালদেবও নন। তবে টাকমাথা হলে কাটাপ্পার ধারে কাছে দেখতে হতে পারেন।”
দীপ বলল, “আপনি কি আমার ঠ্যাং টানাটানির জন্য ফোন করেছেন?”
ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে এল, “আমি তো ভাবলাম আপনি যেভাবে আয়োজন করে, ছলছল চোখ করে আমার নাম্বার নিলেন, তাতে বিয়েবাড়ি থেকে গিয়েই আমাকে ফোন করবেন। বাস্তবে দেখা গেল আপনি সব ভুলেই মেরে দিয়েছেন। লজ্জার মাথা খেয়ে তাই আমিই ফোন করলাম। দুপুরেও আপনি আমাকে একটু ঝাঁঝি মেরে দিলেন, তারপরেও আমিই আপনাকে ফোন করলাম। এত কিছুর পরে অবশ্য আপনার আমাকে নির্লজ্জ বেহায়া মেয়ে মনেই হতে পারে, তাতে অবশ্য আমার কোনও যায় আসে না। আমি এরকমই।”
দীপ বলল, “আচ্ছা, নামটা বলুন না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।”
“চিত্রলেখা। নামটা কঠিনই বটে। প্রাচীনও।”
