রূপম কৃতজ্ঞতায় কিছু বলতে পারেনি। একটা সময় গোকুলবাবু আলাদা করে ডেকে নিয়ে তাকে বললেন, “আপনার বোন সাক্ষী দেবেন। পাশে থাকবেন। খুব বেশি চাপ হবে না অবশ্য। ব্যাটা কনফেস করে গেছে। তবু, আর সবকিছুতে পাশে থাকবেন ওর। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা পাগলকে সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। পরম মমতায় কেউ ভাত দেয় না।”
রূপম গোকুলবাবুর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল।
মনে পড়ে গেল ছোটোবেলায় রূপসী কেমন তার ন্যাওটা ছিল। আজ যদি ওর কিছু হত, কী হত তাদের পরিবারের?
রূপম ছাদ থেকে অভ্যাসবশত গোকুলবাবুর বসার জায়গাটার দিকে তাকাল। কেউ বসে নেই। ভদ্রলোক এতদিন পর হয়তো বাড়িতে নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছেন। রূপম মনে মনে বলল, “ধন্যবাদ আপনাকে।”
বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল। রূপম শ্রাবন্তীকে বলল, “ভিজে যাব। চলো।”
শ্রাবন্তী চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “একদম না। ভিজব আজ। যা হয় হবে।”
বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছিল। দুজনের কেউই কোনও কথা বলছিল না। শুধু ভিজে যাচ্ছিল।
অনেকক্ষণ পর শ্রাবন্তী রূপমের বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি, আমার মেয়ে হবে। ওর নাম দেব মোম, কেমন?”
রূপম কথা বলতে পারল না…
৫২ মিলি
আমার আসলে হেব্বি রাগ করা উচিত। কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলা উচিত না। কিংবা দিদির মাথা ফাটিয়ে দেওয়া উচিত।
সমস্যা হল সেটা করতে পারছি না। দিদিকে দেখলেই কেমন যেন জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে।
যখনই মনে আসছে আমার দিদিটাকে ওই ভয়ংকর লোকটা… ততবার শিউরে উঠছি। আমার তো এখনও বিশ্বাস হয় না। কতবার ওই দোকানে গেছি। ছেলেদের চোখ দেখলে মেয়েরা বুঝতে পারে। লোকটার তো সেরকমও কিছু ছিল না। সেই যেবার পাগলের তাড়া খেয়ে আমাদের বাড়ি এসেছিল সেবার নাকি আমাকে ফলো করে এসেছিল। তবে লোকটা ধরা পড়ার পর একটা উপকার হয়েছে।
আজকাল রাতে আর ওই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটা দেখি না। তবে যতবার মনে পড়ে পাগলটা আসলে গোয়েন্দা ছিল ততবার লজ্জা লাগে। ইশ, কত ভ্যাংচাতাম।
লোকটা অবশ্য বেশ ভালো। আমার জন্য একটা ইয়াব্বড়ো চকোলেট নিয়ে এসেছিল। তারপর কানে কানে বলেছে, “আর-একবার ভ্যাংচাবে নাকি? তুমি কিন্তু ভ্যাংচ্যানোতে বেশ ভালো। মানে অলিম্পিকে যদি ভ্যাংচানোর কোনও ইভেন্ট হত তাহলে নির্ঘাত তুমি ফার্স্ট প্রাইজ পেতে, বিশ্বাস করো।”
আমি লোকটাকে ভেংচে দিয়ে পালিয়েছি।
অয়নদার কথাটা জানার পর থেকে বেশ খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসেছিলাম। দিদিকে একটা রামচিমটিও দিয়েছি। তারপর ভেবে দেখেছি দুটোতে খারাপ মানাবে না। আর জাম্বুকে একটু-আধটু ঝাড়ি মারা তো আইনের বইতে লেখাই আছে। সুতরাং চাপ নিয়ে কী হবে বস!
দিদির কানে কানে বলেছি, “শেষ পর্যন্ত সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটার করলি?”
দিদি আমার কান মুলে দিয়ে বলেছে, “বেশ করেছি।”
ওহ আসল কথাই তো বলা হয়নি। বউদি এখন আমাদের বাড়িতেই আছে। ভাইপো বা ভাইঝি হবার পরে যাবে। কিন্তু কথা সেটা না। কথাটা হল বউদি পুরো চেঞ্জ। সকালবেলা উঠে নিজের হাতে রান্না করবে। দুপুরে আমাদের সঙ্গে লুডো খেলবে। কে চোট্টা করল তাই নিয়ে তুমুল ঝামেলা করবে। আমার কাজ হয়েছে এখন বউদির জন্য তেঁতুল জোগাড় করে আনা। বাবাও আজকাল বউদিকে ভয় পাচ্ছে না। দিব্যি খেলার চ্যানেল দেখছে বউদি সামনে থাকলেও।
আমি পড়ার ব্যাচে আজকাল বেশ ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পাচ্ছি। ইতিহাস স্যার পর্যন্ত আমার ফাজলামিতে বিরক্ত হয়ে গার্জিয়ান কলের হুমকি দিচ্ছেন না।
দুঃখের খবর একটাই। মধুমিতার হিরো হীরালাল আর ওকে পাত্তা দিচ্ছে না। তাতে অবশ্য ওর খুব একটা যায় আসে না। ইদানীং কোথাকার এক মাসল পঞ্চুর সঙ্গে খুব চ্যাট করছে। ছেলেটা নাকি দু-হাত ছেড়ে বাইক চালাতে পারে। ডান্সও করে।
একটা ডান্সের ভিডিয়ো আপলোড করেছে ফেসবুকে। সেটা দেখিয়ে মধুমিতা আমায় বলেছিল, “দারুণ না?”
আমি মুখ ফসকে বলে ফেলেছি, “পুরো হিরো আলম।”
তারপর থেকে মধুমিতা আর আমার সঙ্গে কথা বলছে না…
