রূপসী অবাক হয়ে বলল, “মানে? একটা রেপিস্ট মার্ডারের জন্য আপনি ফিল করেন?”
গোকুলবাবু বললেন, “করব না? আপনাদের এই মফস্সলে এত বড়ো একটা শিল্পী ছিল, আপনারা জানতেই পারেননি! এইসব লোককে ধরতে তো স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড আসবে। আ হা হা, কী শিল্প, জাস্ট ভাবুন, কাজ সেরে আবার চুপটি করে দোকানে বসে পড়ছে। নিরীহ নির্বিরোধী লোক সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্দেহ হতও না আমার, শুধু যেদিন আপনার বোনকে ফলো করেছিল, সেদিন একটু ভুল করে ফেলেছিল। কোইনসিডেন্স বলতে পারেন। আমার চোখেই এর চোখটা পড়ে গেছিল। প্রাইমারি টার্গেট আপনার বোনই ছিল সম্ভবত, পরে কেস স্টাডি করতে গিয়ে বুঝেছিল এই রুট দিয়ে এই সময়ে আপনি যান, আর আপনার বোন আজকাল বাজার হয়ে ফেরে। তাই টার্গেট চেঞ্জ করে ফেলেছিল। আমি বুঝেছিলাম আগেই।”
রূপসী বলল, “তাহলে আমাকে সতর্ক করে দেননি কেন?”
গোকুলবাবু রক্তমাখা হাতটা ঘাসে খানিকক্ষণ ঘষে পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরিয়ে বললেন, “আপনাকে সতর্ক করলে আপনি আর এই রুটে আসতেন? তাহলে ধরা পড়ত কী করে?”
রূপসী খানিকক্ষণ গোকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি সত্যিই পাগল। অভিনয়টা তাই সহজে করতে পারেন।”
গোকুলবাবু দাঁত বের করলেন। “তা যা বলেছেন। নইলে ফ্যামিলি ছেড়ে কেউ মশার কামড় খায় রাস্তায় শুয়ে, বলুন? বাই দ্য ওয়ে, আপনি আমাকে রেগুলার ভাত দিতেন। একটা পাগলের জন্য আপনি ফিল করেন। এইজন্য, ধুস… কীসব বলে ফেলছি, আপনি তো আবার বুড়োশিবতলার বটগাছের ওখানে…”
থানার গাড়ি চলে এসেছিল। মাইতিবাবু নেমে অবাক চোখে গোকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনিই মুখার্জি সাহেব?”
গোকুলবাবু বিড়ি টানতে টানতে বললেন, “ওইসব পিরিতের গল্প পরে করবেন, আগে এই মালটাকে জ্ঞান ফিরিয়ে গ্যারেজ করুন। খুনি ধরলে তো হবে না, আসল কাজ তো প্রমাণ করা। তারপর আবার মানবাধিক… ধুস…”
৫১
অন্যান্য দিনের মতোই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল রূপমের। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল, “এরপরেও?”
ঘড়িটা নাইটবাল্বের পাশেই। দেখল রাত আড়াইটা বাজে। কী অদ্ভুত! রোজ ঠিক এই সময়েই তার ঘুম ভাঙছে।
শ্রাবন্তী ঘুমোচ্ছে। সে খানিকক্ষণ চুপচাপ খাটে বসে রইল।
তারপর খাট থেকে নামল। টেবিলে বোতল রাখা আছে। বেশ খানিকটা জল খেয়ে সোফায় বসল।
“কী হল তোমার?”
রূপম দেখল শ্রাবন্তী উঠে বসেছে।
রূপম বলল, “কিছু না, তুমি ঘুমোও।”
শ্রাবন্তী বলল, “মোমের কথা মনে পড়ছে?”
এই প্রথম শ্রাবন্তীর মুখে মোমের নাম শুনল রূপম। সে একটু থমকে বলল, “হ্যাঁ।”
শ্রাবন্তী খাট থেকে নামল। লাইট জ্বালাল। তার পাশে এসে বসল। বলল, “ঘুমোনোর চেষ্টা করো।”
রূপম ভেবেছিল শ্রাবন্তী রেগে যাবে, কথা শোনাবে। হঠাৎ করে এরকম কথায় সে অবাকই হল খানিকটা। মুখে কিছু বলল না।
শ্রাবন্তী বলল, “ঘুমোতে চেষ্টা না করলে তো দুঃস্বপ্নটাই বারবার দেখবে। আমিও জেগে যাব। আমার ভেতরে যে আছে, সেও জেগে যাবে।”
রূপম শ্রাবন্তীর কথা শুনে ওর দিকে তাকাল। এই ক-দিনের দৌড়াদৌড়িতে সে তবে আসল কথাটাই ভুলে যেতে বসেছিল!
সে বলল, “তুমি ডিসিশন নিয়েছ?”
শ্রাবন্তী বলল, “হ্যাঁ। আমি ডিসিশন নিয়েছি। আমি প্রস্তুত।”
রূপম অনেকদিন পরে শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল। শ্রাবন্তী যে কথাটা বলল সেটাই কি পৃথিবীতে তার কানে শোনা এখন পর্যন্ত সবথেকে মিষ্টি কথা?
শ্রাবন্তী বলল, “তুমি কিছু বলবে না?”
রূপম অস্ফুটে বলল, “থ্যাংকস।”
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল।
শ্রাবন্তী বলল, “উফ, একটু বৃষ্টি হলে বাঁচি। হাওয়া দিচ্ছে বোধহয়, না? জানলাটা খুলে দাও তো।”
রূপম উঠে জানলাটা খুলল। প্রবল বেগে হাওয়া বইছে।
শ্রাবন্তী বলল, “এই, ছাদে যাবে?”
রূপম অবাক হল। শ্রাবন্তী এত চেঞ্জ হয়ে গেল কী করে?
সে বলল, “এত রাতে ছাদে যাবে? পাগল নাকি? তোমার কী হয়েছে বলো তো? রাগি রাগি ছিলে, সেটাই তো ভালো ছিল। হঠাৎ করে চেঞ্জ হয়ে গেলে আমারই তো ভয় লেগে যাচ্ছে।”
শ্রাবন্তী হাসল। বলল, “আমি তো ঠিকই করে নিয়েছিলাম অ্যাবর্ট করব। কারও কথাই শুনব না। তুমি অফিস চলে যাবে। একা একা আমি বাচ্চা সামলাব? তুমি যেদিন চলে এলে, আমি রাতে শুয়ে আছি। আগে তো একাই শুতাম, কিন্তু তুমি যাবার পরে কেন জানি না ভয় ভয় লাগছিল। হঠাৎ করেই সেদিন আমার মনে হল, আমি তো একা নেই। আমার সাথে আরও একজন আছে। আমার ভিতরে সে বাড়ছে ধীরে ধীরে। কোত্থেকে যেন সাহস চলে এল। নিশ্চিন্তে ঘুমোলাম জানো। সকালে উঠে ডাক্তার আন্টির কাছে গিয়ে বীরের মতো বললাম, আমার বাচ্চার জন্য কী কী করতে হবে বলে ফ্যালো। ডাক্তার আন্টি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, এই মেয়েটা নির্ঘাত পাগল আছে। আমার ভিতরের জনই বোধহয় আমাকে পালটে ফেলছে। তোমার জন্য ভাবাচ্ছে। তোমাদের সবার জন্য ভাবাচ্ছে।”
রূপমের মনে হচ্ছিল না কথাগুলো শ্রাবন্তী বলছে। সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইল।
শ্রাবন্তী তার হাত ধরে টানল, “ছাদে চলো তো।”
রূপম চুপচাপ শ্রাবন্তীর হাত ধরে ছাদে উঠল।
গোকুলবাবু সব মিটিয়ে দুপুরে তাদের বাড়ি এসেছিলেন। চুল দাড়ি কেটে ধোপদুরস্ত হয়ে। তাদের বাথরুমেই স্নান করলেন। রূপমকে বললেন, “বন্ধুর বাড়ি ব্যবহার করলাম, রাগ করলেন না তো?”
