লোকটা সাপের কামড়েই মরল। কিন্তু মরার সময়েও কী পরম প্রশান্তি চোখে মুখে। বলেছিল, “পাপের শাস্তি দিল ঈশ্বর আমাকে, কত সাপ মেরেছি। আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা কোরো না তোমরা। ও জাতসাপ, এ বিষ ছাড়ানোর চেষ্টা করে লাভ নেই।”
নারান নিজের দু-গালে জোরে জোরে দুটো চড় মারল, এখন অন্য কিছু ভাবার সময় না, কম সময়ে, কাজ হাসিল করার সময়।
কান খাড়া করল সে, আসছে মনে হচ্ছে!
হ্যাঁ… মেয়েটা আসছে।
প্রথম লাইটপোস্টটা পেরোচ্ছে, সে আধলাটা শক্ত হাতে ধরল, এবার তাক করার সময়।
দ্বিতীয় লাইটপোস্টের কাছে এলেই ছুড়তে হবে আধলাটা। মিস হলে দৌড়ে গিয়ে গলাটা ধরতে হবে। নারান জঙ্গল ছেড়ে বেরোল, মেয়েটার সঙ্গে দূরত্ব কমাতে হবে আধলাটা ছোড়ার আগে।
মেয়েটা বেশ জোরে হাঁটছে, এই সেই মেয়েটা, যার বাড়ির সামনে পাগলটা তাড়া করেছিল তাকে, এসে পড়েছে মেয়েটা, এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, নারান আধলাটা ছুড়তে গেল।
আর ঠিক সেই সময়েই তার মাথায় একটা ইট এসে পড়ল।
চারদিক কালো হয়ে এল, তার হাত থেকে আধলাটা পড়ে গেল।
নারান অবিশ্বাসীর মতো কোনওভাবে পিছনে তাকিয়ে দেখল পাগলটা লাফাতে লাফাতে বলছে, “আউট আউট আউট আউট।” মেয়েটা হতভম্ব হয়ে তাকে দেখছে।
নারান আর চোখ খুলে রাখতে পারল না।
পড়ে গেল।
৫০
রূপসী থরথর করে কাঁপছিল।
গোকুলবাবু এগিয়ে এসে নারানের মাথায় হাত দিলেন। হাতে গামছা চুঁইয়ে খানিকটা রক্ত এসে লাগল। তাঁর পরনে একটা ছেঁড়া জামা, আর লুঙ্গি। জামার ভিতরের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে বললেন, “ফোর্স পাঠান। অপারেশন সাক্সেসফুল।”
নারানের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “হ্যাঁ, ফাঁসির দড়ি পরার জন্য এখনও বেঁচে থাকতে হবে বাছাধনকে।” তারপর রূপসীকে বললেন, “বুড়োশিবতলার বটগাছে তেনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে আপনাকে এই রুটটাই নিতে হয়? মিনিমাম সেন্সটুকু নেই আপনার?”
রূপসী কোনওভাবে কথা বলতে পারল, “আপনি পাগল নন?”
গোকুলবাবু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, “আপনার মাথায় উকুন আছে?”
রূপসী অবাক হয়ে বলল, “মানে?”
গোকুলবাবু বললেন, “মানে আবার কী, উকুন থাকলেই তো অ্যান্টি-উকুন শ্যাম্পু থাকার চান্স থাকে, তাই না? তা আপনার বাড়িতে আছে সে শ্যাম্পু?”
রূপসী মাথা নাড়ল, “না আমার আর আমার বোনের কারও মাথায় উকুন নেই।”
“তা শ্যাম্পু আছে তো?”
রূপসী বলল, “হ্যাঁ তা আছে।”
গোকুলবাবু বললেন, “আচ্ছা। আজ একটু মন দিয়ে শ্যাম্পু করতে হবে। আর আপনাদের বাড়িতে তো আজ মাংস হচ্ছে।”
রূপসী অবাক হয়ে বলল, “আপনি কী করে জানলেন?”
গোকুলবাবু বললেন, “সেসব থার্ড আই থাকে আমাদের, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর লোক কী সাধে হলাম মশাই? এই যে, যে ছেলেটা আপনাদের বাড়ি এসে দেখা করত, তাকেই আপনি মিট করতে রাধার অভিসারের মতো এই দুর্গম পথ দিয়ে যান সেটাও তো আমিই বের করেছিলাম। হ্যাঁ, আর ইনিও করেছিলেন অবশ্য। আপনার বোনকে ফলো করতে করতে ইনি, মানে এই যে, দেখুন তো এনাকে চিনতে পারেন নাকি?”
গোকুলবাবু নারানের মাথা থেকে গামছাটা সরালেন। “এ কী!!!এ তো বাজারের দোকানদার! কী যেন নাম!!!”
গোকুলবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “নারান। আপনাকে ওই বাকি মেয়েগুলোর মতো অবস্থা করার জন্য তাক করে বসে ছিল।”
রূপসী বসে পড়ল রাস্তাতেই। কয়েক সেকেন্ড পর বলল, “আপনি না এলে আজ কী হত?”
গোকুলবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আর কী হত, আপনি তো আবার বুড়োশিবতলায় দেখা করতে চলেই গেলেন। আমার আর কী হবে?”
রূপসী বুঝল না, “মানে?”
গোকুলবাবু বললেন, “আর মানে শুনে কাজ নেই। শুনুন। আপনি পুলিশ এলে তো বলতে পারবেন না বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন! তাহলে কী বলবেন?”
রূপসী বিহ্বল চোখে গোকুলবাবুর দিকে তাকাল, “কী বলব?”
গোকুলবাবু বললেন, “যাই বলবেন, ভেবে রাখুন। আর নইলে সত্যিটাই বলুন। সত্যি বললে চাপ কম থাকে।”
রূপসী মাথা নেড়ে বলল, “বাড়িতে তো সঞ্চারীদের বাড়ি যাবার নাম করে বেরোই, বোনেরও এই সময় পড়া থাকে, দাদা বউদি আছে বাড়িতে, সত্যি কথা বললে আমি মিথ্যেবাদী হয়ে যাব তো।”
গোকুলবাবু কয়েক সেকেন্ড মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি এক কাজ করুন, বাড়ি চলে যান। আপনাকে উইটনেস হতে হবে না। আমি সামলে নেব।”
রূপসী শূন্য চোখে গোকুলবাবুর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলল, “এই লোকটাই মোমদিকে…?”
গোকুলবাবু মাথা উপর নীচ করলেন।
বিস্ময়, আতঙ্ক আর ঘেন্নামেশানো মুখে রূপসী খানিকক্ষণ পড়ে থাকা নারানের বডিটার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, “আমি উইটনেস হব। সত্যি কথাটাই নাহয় বলব।”
গোকুলবাবু কয়েক সেকেন্ড রূপসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাহ। আগুন আছে। এই তো চাই। তবে আপনি এখন যান। আমি বুঝে নেব। যেতে পারবেন? ভয় পাবেন না তো?”
রূপসী উঠে দাঁড়াল। বলল, “না। আমি অপেক্ষা করছি। আমি যাব না।”
গোকুলবাবু কাঁধ ঝাঁকালেন, “অ্যাজ ইউ উইশ।”
তারপর নারানের দিকে ঝুঁকে বসলেন, মুখে চুকচুক শব্দ করতে করতে নারানকে বললেন, “বস ইউ আর টু গুড। মানতেই হচ্ছে। আমার মতো ঘুঘুকেও এতদিন উকুন সহ্য করতে হল। শুধু একটু অধৈর্য না হলে কার বাপের সাধ্যি ছিল আপনাকে ধরে। আপনার জন্য আমি ফিল করি, বিশ্বাস করুন।”
