আমি বললাম, “না স্যার, পুরোনো একটা কথা মনে পড়ে গেল তাই হাসি এল।” বলে আবার হাসতে শুরু করলাম।
স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন, “তোমাদের ব্যাচের মতো বাজে ব্যাচ আমি আর দেখিনি। এত ফাজিল হলে হয় নাকি? শুধু ঠাট্টা ইয়ার্কি ছাড়া আর কিছু করো না। দাঁড়াও তোমাদের একটা টেস্ট নেব নেক্সট উইকে। যার রেজাল্ট খারাপ হবে তার গার্জিয়ানদের ডেকে আমি নিজে কথা বলব। হচ্ছে তোমাদের, দাঁড়াও।”
মধুমিতা ফস করে বলে বসল, “স্যার আমার বাবা মা তো বেড়াতে গেছে। আমি গার্জিয়ান কোত্থেকে পাব?”
স্যার বললেন, “ফিরুন ওনারা। তোমার আর মিলির ব্যাপারে আলাদা করে কথা বলব। তোমরা ভীষণ বাড় বেড়েছ।”
আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম। স্যার নোটস দেওয়া শুরু করলেন। আমি জিভ কামড়ে অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখলাম।
পড়া শেষ হলে বেরিয়ে মধুমিতা বলল, “স্যার একদম চাপ খেয়ে গেছিল সেলিম আর আনারকলির নামে।”
আমি হাসলাম। অনেকক্ষণ ধরে।
মধুমিতা বলল, “জানিস মা কী বলে? মেয়েদের বেশি হাসতে নেই। যত হাসে তত কান্না, বলে গেছে কপিল শর্মা।”
আমার আরও হাসি পেয়ে গেল। বললাম, “এসব সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের কথা যত্তসব।”
মধুমিতা বলল, “আজ আমার মনটা ভালো নেই রে। স্যারের ওখানে হাসলাম বটে কিন্তু ও সেই অ্যাঞ্জেল প্রিয়ার ছবিতে লাইক করেছে ভাবতেই আমার কেমন রাগ রাগ ফিলিং আসছে।”
আমি বললাম, “তুই এক কাজ কর। সব ছেলেদের ছবিতে লাইক কর আর বেশি বেশি করে কমেন্ট কর।”
মধুমিতা উত্তেজনায় আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, “ঠিক বলেছিস। দারুণ আইডিয়া। আর জানিস তো, মোবাইল থেকে ঠিক গুছিয়ে সব করা যায় না। কম্পিউটারে বসতে পারলে ভালো হয়। শোন না, আমার সঙ্গে চ।”
আমি বললাম, “কোথায়?”
মধুমিতা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “সাইবার কাফেতে। বসে বসে ব্যাটার পিন্ডি চটকাই।”
আমি বললাম, “না না, তুই যা, আমার আজ সিনেমা দেখতে যাবার কথা সবাই মিলে। অনেক কাজ পড়ে আছে বাড়িতে।”
মধুমিতা ঠোঁট উলটাল, “ও, তোর তো এখন ব্যাপারই আলাদা। ঘ্যামই আলাদা। দাদা বউদি এসেছে। অনেক কাজ তো হবেই। আচ্ছা, যা তাহলে, আমি সাইবার কাফে চললাম।”
মধুমিতা অন্য রাস্তায় চলে গেল।
আমি পা চালালাম। ওর ভরসায় থাকলে আর বাড়ি যাওয়া হবে না। রোজ রোজ ওর এক-না-এক বাহানা থাকে বাড়ি না ফেরার।
বাড়ি গিয়ে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে নিতে হবে।
৪৯
শিকার ধরার সময় বাঘ কী করে? প্রথমে শিকারকে অনুসরণ করে, শিকারের ওপরে সব মনঃসংযোগ দিয়ে, সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অপেক্ষা করে থাকে।
এই সময়টা বড়ো ভালো লাগে নারানের। অপেক্ষা করে থাকা।
কোনও বড়ো অনুষ্ঠানের আগে গায়ক যখন অপেক্ষা করে থাকে, কিংবা একটা উইকেট পড়ার পর দেশের সেরা ব্যাটসম্যান যখন ব্যাট করতে নামে, তখন কেমন লাগে তার? হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকে, নিজের সেরাটা দেবার জন্য ছটফট করতে থাকে সে।
বেশ ভালো গরম পড়েছে। রোদের তাপে সাধারণ মানুষের পক্ষে বসে থাকা সম্ভব না। নারানের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। সে মাথায় একটা ভেজা গামছা জড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় বসে আছে।
মাথাটা গরম হচ্ছে। ঠান্ডা করা প্রয়োজন।
ঘড়ি বলছে দশটা পঁয়তাল্লিশ। সময় হয়ে গেছে। যে-কোনও সময় কচি মেয়েটা…
নারাণ জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল। শরীরটা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ইটের গাদার পিছনে শরীরটাকে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে হবে। তারপর…
এবার আর ছ-মাস অপেক্ষা করা গেল না। যত দিন যাচ্ছে, শরীরটাকে বাগে আনা যাচ্ছে না। একটা ঘটনা ঘটাবার এত তাড়াতাড়ি পরবর্তী ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, কী-ই বা হবে? সে মনকে প্রবোধ দিল। শরীর যখন অবাধ্য হয়ে যায় তখন আর-কোনও বাধানিষেধ মানা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
একটা সাইকেল আসছে। নারান জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে।
তারপর হতাশ হয়। একটা লোক। বাজার থেকে ফিরছে। নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকে নারান।
লোকটা শর্টকাট করছে। এই রাস্তাটা দিয়ে খুব কম লোকই যাতায়াত করে।
তবু সাবধানের মার নেই। মেয়েটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুখ চাপা দিয়ে পিছনের ইটের গাদার দিকে নিয়ে গেলে রাস্তা থেকে কারও দেখার সম্ভাবনা নেই।
লোকটা চলে গেলে নারান আবার বেরোল। হাতে আধলা।
খসখস একটা শব্দ হচ্ছে। নারান চুপ করে দেখল।
সেই সাপটা।
একটা ইটের গাদার থেকে জঙ্গলের দিকে চুপচাপ চলে গেল। মিশমিশে কালো সাপ।
ফণা আছে।
নারান হাসল।
তার থেকে বিষাক্ত আর কে আছে! এলাকায় লোকে তাকে দেখলে কত ভালো ব্যবহার করে। কারও বাড়ির সামনে দেখলে হাসিমুখে ঘরে নিয়ে মিষ্টি খাওয়ায়।
কারও বাড়ির সামনে সাপ বেরোলে লোকে ভয়ে আতঙ্কেই অস্থির হয়ে পড়ে। অথচ সাপ কারও ক্ষতি করে না যতক্ষণ না নিজের কোনও ক্ষতি হচ্ছে।
কী হতে পারে এই সাপটা? কেউটে? না গোখরো? বাজারের আশিসখুড়ো খুব ভালো সাপ ধরতে পারে। এককালে এলাকায় সাপ বেরোলে আশিস খুড়োর ডাক পড়ত। খুড়ো চোখ বন্ধ করে সাপ খুঁজে সেটাকে মারত। তারপর একদিন খুড়োর বৈরাগ্য এল।
সবাই যখন খুড়োকে সাপ মারতে নিয়ে যেত খুড়ো প্রথমেই শর্ত দিয়ে দিত, “দ্যাখো বাপু, সাপ মারতে পারব না। আমি কিন্তু ধরে জঙ্গলে ছেড়ে দেব।”
তাতেই সবাই রাজি হয়ে গেল।
সেটা এক দেখার মতো জিনিস হত। এলাকার লোক অবাক হয়ে দেখত খুড়ো পরম যত্নে বিষধর সাপগুলোকে কী এক কায়দায় ধরে জঙ্গলে ছেড়ে দিচ্ছে।
