যত রোদ ওঠে, তত মানুষ বাড়ির বাইরে কম বেরোয়, ইটভাঁটার সামনে দিয়ে মানুষের যাতায়াতের সম্ভাবনা আরও কমে যাবে। সে খুশি হল।
বউ বাইরে এল। এখন বাড়ির সামনেটা ধোয়া হবে।
“ঘরে ঢোকার সময় জুতো বাইরে রেখে ঢুকো দয়া করে।”
নারান কথাটা শুনল, কিছু বলল না।
লোকের চোখে পড়ে যাবে নেহাত, নইলে এই মহিলাকে প্রায়ই কুপিয়ে পিস পিস করে মাংস্টা কুকুরকে খাইয়ে দিতে ইচ্ছা করে। দিন দিন একটা মাংসপিণ্ড আর শুচিবায়ুর শোকেসে পরিণত হচ্ছে। শেষ কবে তারা একসাথে শুয়েছে মনে করতে পারে না নারান।
জুতো খুলে ঘরে ঢুকে চা বানিয়ে খেল সে।
সকালের টিফিনটা বাড়ির ভরসায় রেখে দিলে এগারোটা বাজবে। তৈরি হয়ে বেরোল ।
সকালে লোকে বাজার করতে যাচ্ছে। নারান বাজারে ঢুকে ধীরেসুস্থে সুবলের দোকানে বসল।
সুবল লুচি ঘুগনি বানায় চমৎকার। ঘুগনির উপরে কুচি কুচি পেঁয়াজ ছড়িয়ে দেয়, স্বর্গীয় খেতে লাগে। নারান প্রথমে চারটে লুচি নিল। তারপর দুটো লুচি নিতে আরও ঘুগনি দিল তাকে। খাওয়া শেষে চা নিয়ে বসল কিছুক্ষণ।
নারান মনে মনে একটা হিসেব করল। সব রেখে থুয়েও সুবল কম করে দিনে পাঁচহাজার টাকা বিক্রি করে। প্রতাপনগরে সুবলের একচেটিয়া ব্যবসা। শুধু টিফিন বেচে আর সন্ধ্যায় চপ বেচেই দোতলা বাড়ি করে ফেলেছে।
দোকানটা কিন্তু ঝুপড়িই রেখেছে। নারান মনে মনে হাসল। এটা খুব ভালো বিজনেস প্ল্যান। ঝুপড়ি দোকানে ভালো রান্না হলে সবাই আসে। দোকান ধোপদুরস্ত হলে নিম্নমধ্যবিত্তরা আসে না। ভাবে দাম বেশি। সুবল খুব ভালো বোঝে ব্যবসাটা।
টাকা দিয়ে বেরিয়ে সে নিজের দোকান খুলল। ছেলেটা ঘুম ঘুম চোখে এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটাকে দিয়ে দোকান ঝাড় দিয়ে সে ক্যাশে বসল, এমন সময় একজন এসে বলল, “আচ্ছা দাদা, এখানে সিনেমা হলটা কোথায় বলতে পারেন?”
নারান লোকটাকে চিনতে পারল না। এলাকার না হয়তো।
সে সিনেমা হলের দিকনির্দেশ দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
এবার মনঃসংযোগের সময়।
৪৮
মধুমিতার বয়ফ্রেন্ড নাকি কোন এক অ্যাঞ্জেল প্রিয়ার ছবিতে লাইক করেছে। মধুমিতার তাই মনখারাপ।
স্যার আসতে একটু দেরি করছিলেন। মধুমিতা কাঁদো কাঁদো হয়ে আমাকে ওর দুঃখের কথা জানাচ্ছিল। স্যার দুটো উইক সকালে পড়াবেন বলেছেন। বিকেলে নাকি কোথায় যাবার কথা আছে।
স্কুল বন্ধ এখন। কীসব কাজ চলছে স্কুলে।
দিনটা ভালোই কাটছে আজকাল। দাদা বলেছে বিকেলবেলায় সিনেমা দেখতে নিয়ে যাবে।
আমাদের এখানে কোনও মাল্টিপ্লেক্স নেই।
একটাই সিনেমা হল। তার আবার গালভরা নাম রত্নবীণা। আমি দাদাকে বললাম রত্নবীণাতে তো এসি নেই। বউদি দেখতে পারবে?
দাদা বলে দিয়েছে সেটা শুরুতেই বউদিকে বলার দরকার নেই। তাহলে আর বউদি যাবে না।
আমার খুব মজা লেগেছে। বউদি যদি হলে ঢুকে বোঝে এসি নেই তাহলে কী করবে? উঠে চলে যাবে? দিদিও যাবে সিনেমা দেখতে। আমি দিদিকে আলগোছে জিজ্ঞেস করেছি, “হ্যাঁ রে, অয়নদাকে নিয়ে যাবি নাকি?”
দিদি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলেছে, “অয়ন কেন যাবে? ও কি আমাদের ফ্যামিলির লোক?”
আমি মনে মনে বলেছি “হ্যাঁ বাড়ির জামাই হয় তো”, আর মুখে বলেছি, “না, কী হয় গেলে? সবাই মিলে গেলে মজা হবে বেশ।”
দিদি বলেছে, “তুই এক কাজ কর না, দাদাকে বল গিয়ে।”
আমি ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলেছি, “আমি কেন বলতে যাব? তুই-ই বল। তোর বন্ধু।”
দিদি বলেছে, “মিলি, তুই কিন্তু ভীষণ পেকেছিস। আমি দাদাকে সব বলব তুই কী কী করছিস আজকাল।”
আমি ওই একইরকম মুখ করে ছিলাম, বললাম, “কী করছি রে দিদি? বটগাছের তলায় দেখা করছি কারও সাথে?”
দিদি বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা আবার কী?”
আমি বুঝেছি কেলো করে ফেলছি। চুপচাপ সে জায়গা থেকে সরে বাবার পাশে গিয়ে বসেছি। বাবার কাছে থাকলে দিদি বেশি খাপ খুলতে পারে না। শুধু দূর থেকে আগুনে দৃষ্টি দিয়ে আমাকে ভস্ম করে দেবার বৃথা চেষ্টা করবে।
আজ স্যার পড়ানো শুরু করতেই মধুমিতা বলল, “স্যার আপনি একটু সেলিম আর আনারকলির পার্টটা পড়াবেন?”
স্যার অবাক হয়ে বললেন, “সেলিম আর আনারকলির পার্ট মানে?”
মধুমিতা বলল, “স্যার কালকে একটা সিনেমা দেখলাম। আকবরের ছেলে নাকি একজনের সাথে প্রেম করেছিল। তার নাম আনারকলি। আকবর তাকে ব্লক করে দিয়েছিল। মানে জ্যান্ত কবর দিয়েছিল। সেই পার্টটা পড়ান না স্যার।”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
স্যার কয়েক সেকেন্ড মধুমিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছ?”
মধুমিতা জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, “না স্যার, ইয়ার্কি কেন হবে? সেলিম আর আনারকলির গল্প আমাদের পড়াবেন না?”
স্যার রেগেমেগে বললেন, “এরপর যদি দেখেছি এইসব বলছ একদম সরাসরি বাড়িতে জানিয়ে দেব। নাও লেখো যা বলছ।”
ধমকধামক দিয়ে স্যার নোটস দেওয়া শুরু করলেন।
আমার একটা সমস্যা আছে। সেটা হল আমি কিছুতেই হাসি চাপতে পারি না। স্যার এদিকে আকবরের ধর্মনীতি নিয়ে নোটস দেওয়া শুরু করলেন আর আমার থেকে থেকে হাসি পেতে লাগল। হাসিটাকে অনেক কষ্টে চেপে রাখছিলাম। কিন্তু যেই একবার মধুমিতা আমাকে জোরে চিমটি কাটল আমি জোরে জোরে হেসে দিলাম।
স্যার নোটস দেওয়া থামিয়ে আমাকে বললেন, “কী হল তোমার? এত হাসি আসছে কোত্থেকে? বাড়িতে বলব?”
