গোকুল বললেন, “এই যে আপনি ছাদে চলে আসছেন মাঝরাতে, এইসবই হল আপনার পুরোনো প্রেম চেগে ওঠার কনসিকোয়েন্স। আপনি এসব যত ভাববেন, তত আপনি নিজের মাথা খারাপ করবেন।”
রূপম বলল, “আমি তো সচেতন অবস্থায় ভাবিনি। স্বপ্নে এলে কী করব?”
গোকুল বললেন, “সবই তো অবচেতন মনে জমিয়ে রেখেছেন। আপনার চেঞ্জে যাওয়া দরকার এখন।”
রূপম বলল, “সে তো আপনারাই আটকে রেখে দিলেন। এখান থেকে বেরিয়ে গুরগাঁও গিয়ে অফিস জয়েন করতে পারলে ভালো হত।”
“গুরগাঁও? সেও তো ডেঞ্জার জায়গা শুনেছি। ওই খাপ পঞ্চায়েত-টেত আছে না কাছেপিঠে?”
রূপম হাসল, “এখন তো গোটা দেশ জুড়েই খাপ পঞ্চায়েত বসছে যত দিন যাচ্ছে। অত চিন্তা করে কী হবে আর?”
গোকুলবাবু মাথা নাড়লেন, “খুব একটা ভুল বলেননি। ক্রাইমের রেশিও আমাদের এখানেও হুহু করে বাড়ছে। রেপের প্রবণতা, ইভটিজিং কোনও কিছুই কন্ট্রোলের মধ্যে নেই। ক-দিন পরে হয়তো আপনাদের আশেপাশের শহরগুলোতেও এখানকার রেপিস্টের দেখাদেখি রেপ শুরু হবে। মানুষ তো খারাপটাকে আইডল বানিয়ে ফেলে তাড়াতাড়ি। নইলে আইএসআইএসে এত লোক ভরতি হয়?”
রূপম বলল, “আপনি রেপিস্টটাকে ধরতে পারবেন? যদি ধরতে পারেন, আমার হাতে একবার দিতে পারবেন? খুব বেশি সময়ের জন্য দরকার নেই। মিনিট পাঁচেক?”
গোকুলবাবু বললেন, “হিন্দি সিনেমা পেয়েছেন নাকি মশাই? ঢিসুম ঢিসুম করবেন?”
রূপম বলল, “এই লোকটার বেঁচে থাকার অধিকার নেই।”
গোকুলবাবু বললেন, “এটা কোনও কথা না, আমাদের কারও পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমরা যে হারে পলিউশন করি, গাছ কাটি, নিজের অজান্তেই আমরা এক-একজন বড়ো বড়ো খুনি।”
রূপম বলল, “আপনার এত সহানুভূতি আসে?”
গোকুলবাবু বললেন, “অপরাধকে ঘৃণা করো, অপরাধীকে নয়। অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ। মেনে চলুন। ভালো থাকবেন।”
রূপম বলল, “কোনও ক্লু পেয়েছেন?”
গোকুলবাবুর বিড়িটা শেষ হয়ে গেছিল, হাত বাড়িয়ে ছাদ বাড়িয়ে বিড়ির ধ্বংসাবশেষটা ছাদ থেকে ফেলতে ফেলতে বললেন, “ছাই পেয়েছি।”
রূপম হতাশ হল, “এতদিনে কিছুই পেলেন না?”
গোকুলবাবু মিটিমিট হাসতে হাসতে বললেন, “আপনি না একজন স্কলার? ছাইতেও অমূল্যরতন থাকতে পারে, কবি বলেছেন, ভুলে গেলেন?”
৪৭
মাঝরাতে ঘুম ভেঙেছে অনেকবার।
ভোররাতের দিকে আর শুয়ে থাকতে পারল না নারান। দিন যত এগিয়ে আসে উত্তেজনা তত বাড়তে থাকে। আর আজ তো সেই দিন।
ঘড়ির দিকে তাকাল সে।
পাঁচটা পঁয়ত্রিশ। উঠে আয়নার কাছে গেল।
নিজের মুখটা অনেকক্ষণ ধরে দেখল।
দাড়ি কাটা হচ্ছে না দু-দিন ধরে। মেয়েটা যখন তার মুখ দেখবে, হঠাৎ বিস্ময় আর আতঙ্কমিশ্রিত ভয় নিয়ে তার মুখের দিকে তাকাবে, তখন দাড়ি থাকলে দেখতে ভালো লাগবে না। নারান দাড়ি কাটতে বসল।
অনেকক্ষণ ধরে গালে ক্রিম মাখাল সে।
তারপর ক্ষুর দিয়ে একটু একটু করে মন দিয়ে দাড়িটা কাটল। দাড়ি কাটা শেষ হলে আফটারশেভ লোশন দিল মুখে। ক্ষুরটা মগে বসানো ছিল।
অনেকক্ষণ ধরে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। এটাও তো একটা চমৎকার অস্ত্র। ওখানে চালাতে পারলে…
ভাবতেই শরীরটা উত্তেজিত হতে শুরু করল তার।
উঠল সে।
খাটের তলায় স্যুটকেসটা আছে।
সেটা বের করে বড়োবাজার থেকে কেনা ইমিটেশনগুলো বের করল।
একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে সেগুলো ভরে নিজের ঘরের দরজা সন্তর্পণে বন্ধ করে হাঁটতে শুরু করল। ভোরবেলা। খুব বেশি লোক রাস্তায় বেরোয়নি। নারান মাঝে মাঝেই সকালে হাঁটে। অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়। সে নিরীহ মুখ করে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। পরিত্যক্ত ইটভাঁটার কাছে এসে গাছের ঝোপের ভিতরে গয়নার ব্যাগটা নামাল।
তারপর হাঁটু গেড়ে বসল সে।
দোকানের সামনে বুড়োদের আলোচনায় সে শুনেছিল প্রতিটা ম্যাচের শুরুর আগে পিচের কাছে গিয়ে সচিন চোখ বন্ধ করে ভাবত কীভাবে বোলার বল করবে আর কীভাবে সে খেলবে।
সে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে নিচ্ছিল পুরোটা। প্রথমে আধলা মেরে মাথা ফাটানো, তারপরই টার্গেট পড়ে যেতেই বেশি নাড়াচাড়া করলে মাথায় হাতুড়ি চালানো, বডি নিস্তেজ হয়ে এলে ক্ষুর? নারান খানিকক্ষণ ভাবল। কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। ঠিক করল পরিস্থিতির উপরে ছেড়ে দেবে। সবকিছু হয়ে গেলে ইমিটেশনের গয়নাগুলো পরিয়ে দিলেই হবে।
মনে মনে ভাবছিল, আজ দুপুরে যখন কাণ্ডটা হবে আর বিকেলে গোটা প্রতাপনগরের লোক দেখবে নগ্ন মেয়েটাকে গয়না পরিয়ে গেছে সে, তখন কেমন প্রতিক্রিয়া হবে।
বাবা দিয়েছিল হাতঘড়িটা। দম দিয়ে চালাতে হয়। নারান সময় দেখল। পৌনে সাতটা বাজে। এবার আর দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না। পা চালাল সে। রাস্তায় দু-শালিকও দেখে নিল। মন দিয়ে প্রণাম করল। খুশি হল। দু-শালিক মানে আবার ছক্কা হাঁকাবে আজ।
আজ মনঃসংযোগের দিন। অন্য কোনও দিকে তাকালে হবে না। প্রথমে দোকানে যাবে। দোকান খুলে বসতে হবে। ছেলেটাকে দোকানে বসিয়ে বেরিয়ে গিয়ে এক ঘণ্টার ছোট্ট অপারেশন।
নারান বাড়ি এল। বউ উঠে পড়েছে। গোটা বাড়িটা জল দিয়ে ধোয়া চলছে এখন। সে ঢুকল না। দাঁড়িয়ে থাকল। জল দিয়ে ধোয়ার সময় ঘরে ঢুকলেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলবে শুচিবাই মহিলা।
নারান বাইরের বেঞ্চিতে বসল। রোদ উঠছে, গরম পড়বে আজ।
