বাপ্পা হাসল, “গুরু এটা একটু বেশি হেবি কথা বলে দিলে তুমি। আমরা ছোটোবেলায় পড়েছিলাম না, কী যেন ইংরেজিটা?”
রূপম বলল, “সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট?”
বাপ্পা বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। তা নিরীহ লোক না খেলে কী করে হবে গুরু?”
রূপম বলল, “বেঁচে থাকার জন্য লড়াইটা কি চিরকালই হবে নাকি? একটা কোথাও গিয়ে তো আমরা থিতু হব নাকি? ধর না দেশভাগের সময়টা। কত লোক ওপার থেকে এপারে চলে এলেন। সেসময়টা তো স্ট্রাগল ছিলই। স্ট্রাগল ফর এগজিস্টেন্স যাকে বলে। কিন্তু ধীরে ধীরে কলোনি হল, তার বাসস্থানের সুরাহা হল, জল এল, ইলেক্ট্রিসিটি এল, যে মানুষটা খেতে পেত না সে খেতে পেল। ধীরে ধীরে একটা স্থিতাবস্থা এল। এরপর তো স্বাভাবিকভাবেই লড়াই করার ব্যাপারটা কমে এল। কিন্তু এখন যে সময়টা এসেছে সেটা অন্য সময়। আমরা নিজেরাই এই স্থিতাবস্থাকে নষ্ট করে দিতে শুরু করেছি। যে কারণেই আবার স্ট্রাগলের কথাটা আসছে। আজ দেখ না, স্বাধীনতার এত বছর পরেও তোকে চিন্তা করতে হচ্ছে কোন টেন্ডারটা পাবার জন্য তোকে কোন কোন জায়গায় খুশি রাখতে হবে। আমাকে একটা অন্যায় কেসে ফাঁসিয়েছে বলে সেই তোকেই তো অন্য রূপে দেখলাম। আমরা সবকিছুই খুব তাড়াতাড়ি এক্সপ্লয়েট করে ফেললাম বোধহয়।”
বাপ্পা খানিকক্ষণ রূপমের দিকে তাকিয়ে বলল, “গুরু অনেকদিন পরে তোর সাথে কথা বলে ভালো লাগল। তুই তো কোনওদিনও আর পাঁচটা ভালো ছেলের মতো আমাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকতিস না। তুই আমাদের সঙ্গে চিরকালই মিশেছিস। কাকিমা কাকাবাবুরাও কোনওদিন বারণ করেননি আমাদের সঙ্গে মিশতে। ভালো লাগে তোর সঙ্গে কথা বলতে। তুই পালটে যাস না কিন্তু কোনওদিন।”
রূপম হেসে ফেলল, “আর পালটাব কবে? যা-তা বলছিস তো। আচ্ছা শোন আমি বাড়ি যাই এবার। রাতে আসব, আড্ডা হবে।”
বাপ্পা গলা নামিয়ে বলল, “গুরু বিয়ার খাবে নাকি?”
রূপম বলল, “না, সেই তো বাড়িতে ফিরতে হবে। বাড়িটা এখনও আমার কাছে একটু আলাদা জায়গা রে। বাবা তো। যতদিন বেঁচে আছে, সম্মানটা প্রাপ্য লোকটার, তাই না?”
বাপ্পা বলল, “উফ গুরু, সেন্টু দিয়ে দিচ্ছ পুরো। আচ্ছা, যা, বিকেলে আসিস নাহয়।”
***
রূপম বাড়িতে ঢুকে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে একটা ধাক্কা খেল। বেশ খানিকক্ষণ মনে হল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
শ্রাবন্তী রান্নাঘরে মার কাছে চাপ নিয়ে রান্না শিখছে। মিলি আর রূপসীও আছে।
৪৬
একটা নর্দমার পাশে মোমের নগ্ন শরীরটা পড়ে আছে। শরীর থেকে রক্ত ভেসে নর্দমায় পড়ছে।
মোমের মুখের কাছে ভনভন করছে মশা।
অজস্র লাল পিঁপড়ে শরীর জুড়ে একটু একটু করে বাসা বাধছে। একটা সময় ধীরে ধীরে মোম উঠে দাঁড়াল। তারপর শহরে হাঁটতে বেরোল। শহরের সব লোক মোমের নগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। মোমের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। নিশ্চিন্তে সে হেঁটে চলেছে রাস্তা জুড়ে। একটা সময় মোম রূপমের সামনে এসে দাঁড়াল। রূপমকে বলল, “ভালো আছ?”
রূপম কী বলবে বুঝতে পারছে না, মোমের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। আবার মাথা নীচু করলে চোখ চলে যাচ্ছে মোমের নগ্ন শরীরের দিকে। রূপম কথা বলতে চাইছে, বলতে পারছে না, তার অসহ্য কষ্ট হচ্ছে…
রূপম ধড়মড় করে উঠে বসল। ঘড়িটা নাইটবাল্বের পাশেই। দেখল রাত আড়াইটা বাজে। পাশে শ্রাবন্তী ঘুমোচ্ছে। সে খানিকক্ষণ চুপচাপ খাটে বসে রইল। দিনে ভুলে গেলেও স্বপ্নে অবধারিতভাবে মোম চলে আসছে।
সে খাট থেকে নামল। টেবিলে বোতল রাখা আছে। বেশ খানিকটা জল খেয়ে সোফায় বসল।
মিনিট দশেক পর উঠে দরজা খুলে ছাদে গেল। গোটা পাড়া ঘুমোচ্ছে।
গোকুলবাবুও নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।
রূপম বেশ খানিকক্ষণ গোকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা এভাবে থাকে কী করে? অবশ্য কাশ্মীরে সে দেখেছে সেনারা মাঠেঘাটেই সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে ডিউটি করেই এঁরা অভ্যস্ত।
মোবাইলটা নিয়ে এসেছিল সে। অনেকদিন পরে হোয়াটসঅ্যাপ খুলল। অফিসের বিভিন্ন কলিগ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইছে সব ঠিক আছে কি না। রূপম সবাইকে নিশ্চিন্ত করল। ছাদে হাওয়া দিচ্ছে খুব হালকা। রূপম ছাদের মেঝেতেই চুপচাপ বসে রইল। পাড়াটা দিন দিন কেমন চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। তাদের বাড়ির সামনে আগে মাঠ ছিল। এখন বাড়ি হয়ে গেছে। পাড়ায় কোথাও খালি জমি পড়ে নেই। এই মফস্সলেই জমির দাম হুহু করে বাড়ছে। মানুষের সব জায়গাতেই বাড়ি করতে হবে। গাছ কাটা হচ্ছে। মানুষে মানুষে হানাহানি বাড়ছে।
রূপম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছোটোবেলাটাই ভালো ছিল। এত কিছু মাথায় আসত না তখন। আজকাল ছোটো ছোটো ব্যাপারগুলো কেমন উত্তেজিত করে দিচ্ছে।
“কতদিনের রিলেশন ছিলে মেয়েটির সঙ্গে আপনার?”
রূপম চমকে তাকাল। গোকুলবাবু কখন নিঃশব্দে ছাদে চলে এসেছেন।
সে বলল, “আপনি তো খুব সুইফট।”
গোকুলবাবু একটু দূরত্ব রেখে বসলেন। বললেন, “আজ বিড়িও আছে, লাইটারও আছে। আপনার কাছে আর হাত পাততে হবে না। দাঁড়ান, একটা সুখটান দিয়ে নি।”
বিড়ি জ্বালিয়ে একটা টান দিয়ে গোকুল বললেন, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম, কতদিনের রিলেশন ছিল?”
রূপম বলল, “বেশ কিছুদিন, স্টেডি রিলেশন ছিল বলতে পারেন। তবে এইসব কথা না বললে ভালো হত।”
