নারান কথাটা শুনে মৃদু হেসে বলল, “তা যা বলেছ। এই বাজারে ছেলেমেয়ে হওয়াও চিন্তার কারণ।”
বিপিন চারদিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “আমার বড়ো ছেলে। বিয়ে-থা দিয়েছি, থাক আনন্দে বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে, তা না। ওই নেশা ধরে গেছে। ব্যবসা আলাদা করেও শান্তি নেই বুঝেছ? সব টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে মাগিবাজি করে। যুগের ধর্ম বুঝলে কি না? ছোটোটার আবার ব্যবসা পছন্দ না। পার্টি মিছিল মিটিং করে বেড়ায়। আমার হয়েছে জ্বালা। ভগবান দুটো ছেলে দিয়েছে তারা যদি এরকম হয় তবে কেমন লাগে বলো দিকি? বউটা আবার বড়ো ছেলেকে কিছু বললেই তেড়ে আসবে। পুরুষমানুষ নাকি! তা বাপু পুরুষমানুষ বলে কোথায় লেখা আছে খারাপ পাড়ায় মেয়েছেলে নিয়ে শুয়ে থাকবে।”
নারান বলল, “এটা নিয়ে তো তুমি অভিযোগ করতে পারো না। এসব রোগ তো চিরকালই ছিল।”
বিপিন নারানের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “তা জানি, আদিম রোগ, তা বলে আমার ঘরেই হতে হল? এর থেকে টাকাপয়সা থাকত না, বেঁচে যেতুম। তবু ভালো এখনও অবধি মেয়েছেলে নিয়ে বাড়িতে এসে ওঠেনি। শেষ বয়সটা নিয়ে বড়ো চিন্তা হয়ে গেল হে।”
নারান বলল, “চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা তোমার পেমেন্ট কত বাকি আছে একটু হিসাব করে বলবে? আমি হাজার পঞ্চাশেক টাকা এনেছি আজকে।”
বিপিন খুশি হল। টাকার গন্ধ তার বড়ো প্রিয়। সে ক্যাশিয়ার চট্টরাজকে নির্দেশ দিল নারানের হিসেব বের করে দিতে।
তারপর বলল, “অবশ্য এককালে ইয়ের নেশা আমার যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। তবে খারাপ পাড়ায় যেতে হয়নি কোনওদিন।”
নারান অবাক হল, “তাহলে?”
বিপিন বলল, “ছিল ছিল। সে অনেক কেচ্ছা। তা ছাড়া এখানে বলাও যাবে না। তোমার মতো ভদ্রলোকেদের অবিশ্যি এসব কথা কানে শোনাও পাপ।”
নারান হাসল, “তা বটে। সে সাহসই করে উঠতে পারলাম না সারাজীবনে। নিজের বউকেই…”
বিপিন গলা খাঁকরাল, আর-এক কাস্টমার এসে গেছিল। নারান উঠে বলল, “আমি একটু ঘুরে আসছি।”
বিপিন অবাক হল, “কোথায় যাবে?”
নারান বলল, “আসছি, হিসাবটা চট্টরাজবাবু করে নিন, আমি এসে টাকা মিটিয়ে দেব।”
বিপিন বলল, “আচ্ছা ঘুরে আস।”
নারান বেরোল। অনেকরকম দোকান বড়োবাজারে। সে একটা ইমিটেশনের দোকানে গিয়ে বউয়ের জন্য চুড়ি কিনল। দোকান থেকে টাকা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ তার মনে হল সবকিছু করার পরে মৃত নগ্ন শরীরটাতে যদি গয়না পরানো যায় কেমন হবে? ভিড় বাজারের মধ্যেই ছবিটা কল্পনা করল সে চোখ বন্ধ করে। উত্তেজনাটা ফিরে আসছে।
কলকাতাকে সে ভয় পায়। এত লোক, এই ভিড়ে থাকলে কি তার ইচ্ছা পূর্ণতা পেত?
ইমিটেশনের দোকানে ফিরে গেল সে। পছন্দ করে গয়না কিনল কয়েকটা। গয়নাগুলো রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
হঠাৎ মনে পড়ল, হাতুড়ি কিনতে হবে একটা। হাতুড়ির কথা তার মনে ছিল না কেন?
বিপিন দোকানেই ছিল। দোকান ফাঁকা। নারানের হাতে ব্যাগগুলো দেখে বিপিন বলল, “কী কিনলে হে?”
নারান মাথা চুলকে বলল, “এই ঘরের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস।”
বিপিন বলল, “আচ্ছা আচ্ছা। আমি তোমার কথা ভাবি মাঝে মাঝে। নিরীহ নির্ভেজাল লোক। কোনও দোষ নেই, নেশা নেই, আচ্ছা থাকো কী করে বলো তো?”
নারান অমায়িক হাসি হাসল, “ওই চলে যায় আর কি।”
বিপিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সবাই যদি তোমার মতো হতে পারত। আজকাল ভালো লোকের বড়ো অভাব।”
নারান হাসি হাসি মুখ করে বসে থাকল।
৪৫
পাড়ার ক্লাবে ক্যারাম খেলা হচ্ছিল। রূপম খেলছিল।
বাপ্পা এসে ডাকল সিরিয়াস মুখে, “গুরু, এদিকে শুনে যা।”
রূপম বেরোল। ক্লাবের বাইরে একটা ছাতিমগাছের তলায় বেঞ্চি আছে। তারা সেখানে গিয়ে বসল। বাপ্পা বলল, “থানায় গেছিলাম।”
রূপম বলল, “কী করতে?”
বাপ্পা বলল, “এই একটু খোঁজখবর নিতে। তোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।”
রূপম বলল, “কী বলল?”
বাপ্পা বলল, “বড়োবাবু মুডে ছিলেন আজ। বলে দিলেন একমাস পরে স্টেশন লিভ করতে পারবি। নো প্রবলেম।”
রূপম বলল, “এখন করতেই বা কী সমস্যা?”
বাপ্পা বলল, “সে কীসব আছে, আমি অত বুঝি না। একটু কষ্ট করে থেকেই যা, কী করবি।”
রূপম মনে মনে হাসল। মুখে বলল, “যাক। অনেকটা করলি আমার জন্য। থ্যাংকস।”
বাপ্পা বলল, “কী করলাম বল? তোর চাকরি নিয়ে সমস্যা না হয়। একমাস থাকা মানে অনেকটা।”
রূপম বাপ্পার দিকে তাকাল। রাজনীতি, স্বার্থপরতা, সবকিছুর পরেও মানুষের মধ্যে এখনও মানুষের কথা ভাবার জন্য একটা মন আছে তাহলে? সে বলল, “তুই চিন্তা করিস না। কিছু একটা ম্যানেজ হয়ে যাবে। অনেকদিন পরে মনে হল তুই খুব একটা চেঞ্জ হোসনি। সেই আগের মতোই আছিস।”
বাপ্পা বলল, “দেখ ভাই, বেঁচে থাকার জন্য যেরকম যেরকম করতে হয় সেরকমটাই করি। তোর মতো তো আর ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিলাম না। চাকরি করে খাবার ক্ষমতা আমার কোনও কালেই ছিল না সেটা আমার থেকে ভালো আর কে জানবে! এবার এসবের জন্য কারও কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করে ফেলি। কিন্তু বিশ্বাস কর, কারও ক্ষতি হোক চাই না কোনওদিন। কী করব, আমাদের সমাজটাই এরকম হয়ে গেছে। টাকা ছাড়া এখন একটা পাতাও নড়ে না। তুই বেঁচে গেছিস এসবের থেকে বেরিয়ে যেতে পেরেছিস।”
রূপম বলল, “স্বাভাবিক, মানুষ তো পরিবর্তিত হয় সমাজের চাহিদা মেনেই। যেমন সমাজ, মানুষ তেমনই হবে। তুই অত ভাবিস না, শুধু দেখিস, কোনও নিরীহ মানুষের যেন কোনওদিন ক্ষতি না হয়।”
