আমি তাতে আরও হাসা শুরু করি। আর ও আরও রাগে।
ছেলেটা ওকে বলেছে ও নাকি একটা কী হারলে ডেভিসন কোম্পানির একটা বাইক পনেরো লাখ টাকা দিয়ে কিনবে। আমি সেটা শুনে বলেছি বাইকটা মাটিতে চলবে তো রে? নাকি আকাশেও চলবে?
শুনে আরও রেগেছে।
আমি একবার ছেলেটার প্রোফাইল দেখেছি। কেমন পান্তাভাত পঞ্চু মার্কা চেহারা। বোঝাই যাচ্ছে মধুমিতাকে ভাট মারছে। আর ও সেটাকে খেয়ে যাচ্ছে।
আমি দেখেছি এটাই হয়। ভাট কেসগুলোর কপালে ভাট কেসগুলোই জোটে। কয়েকটা এক্সসেপশন থাকে, যেমন অয়নদার সাথে যদি আমার…
এই যে, আবার অয়নদার লাইনে চলে যাচ্ছি।
আগে মধুমিতার কথা বলে নি।
মধুমিতার খুব ইচ্ছা একদিন কলকাতা গিয়ে ছেলেটার সঙ্গে দেখা করে। আমি ওকে বলেছি তুই কেন কলকাতা যাবি। ছেলেটা যদি তোকে সত্যিকারের ভালোবাসে তাহলে ছেলেটাকেই এখানে আসতে বল। তাতে মধুমিতা আমাকে কটমট করে দেখে বলেছে, “যেটা বুঝিস না সেটা নিয়ে একদম কথা বলবি না। তুই জানিস ও কত ব্যস্ত একজন ছেলে? ইচ্ছা করলে বাইক নিয়েই ও চলে আসতে পারে। কিন্তু এখন ওর জিম আছে, ডান্স আছে। ও কিছুতেই আসবে না।”
আমি অবাক হয়ে বলেছি, “ও ডান্সও করে?”
মধুমিতা গম্ভীর হয়ে বলল, “করে তো। ও খুব ভালো পাগলু ডান্স নাচতে পারে। দেখবি একটা ভিডিয়ো আপলোড করেছিল। আমার তো দেবের থেকেও ওর পাগলু ডান্স বেশি ভালো লাগে।”
শুনে আমি হাসব না কাঁদব কিছু বুঝতে না পেরে বললাম, “তুইও শিখে নে। বিয়ের পর বর বউ লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স বলে নাচতে থাকবি।”
মধুমিতা বলল, “তুই কি ইয়ার্কি মারছিস আমার সাথে?”
আমি সিরিয়াস মুখ করে বললাম, “ইয়ার্কি মারব কেন? এতে ইয়ার্কি মারার কী আছে? তুইও তো নাচ জানিস। জানিস না?”
মধুমিতা আমার সিরিয়াস মুখ দেখে সিরিয়াস হয়ে বলল, “আরে আমাদের স্যার পাগলু শেখায় না। সেই শ্যামলসুন্দর পাঁচ বছর ধরে শিখিয়ে যাচ্ছে। ওই পাড়ার টিঙ্কুদা আছে, টলিউড আর বলিউড শেখায়। আমি ঠিক করেছি বাবাকে বলে ওখানে শিখতে যাব। এইসব রবীন্দ্রনৃত্য আজকাল চলে বল? ওকে যখন বলেছি তখন কী হাসি, জানিস? বলে ওইসব ওল্ড হয়ে গেছে।”
আমি বড়ো বড়ো চোখ করে বললাম, “তাই? রবীন্দ্রনৃত্য ওল্ড হয়ে গেছে বলেছে?”
মধুমিতা জোর পেয়ে বলল, “বলেছে তো! এখন তো এসবেরই যুগ বল?”
আমি অনেক কষ্টে জিভ কামড়ে হাসি সামলাতে সামলাতে বললাম, “হ্যাঁ তো। স্টেজের একদিক থেকে তুই দৌড়ে আসবি আর একদিক থেকে তোর পঞ্চু হিরো দৌড়ে এসে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স করবে, জমে যাবে কিন্তু, তুই এখনই ভরতি হ।”
এইটুকু বলে আর পারলাম না। হিহি করে হেসে দিলাম। তারপর থেকে মধুমিতা আমার উপর হেবি খচে আছে। দেখলেই গম্ভীর হয়ে যায়। পড়ার পরে ছুতোনাতায় একা একা বেরিয়ে যায় আমাকে না নিয়েই।
বাড়ির গল্প আবার আরও সরেস। বউদি ফিরেছে।
সবাই দুপুরে ঘুমোচ্ছিলাম।
কলিংবেল বাজতে দরজা খুলে দেখি বউদি দাঁড়িয়ে আছে।
অবাক হয়ে বললাম, “তুমি?”
বউদি আমার দিকে গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে বলল, “কেন আসতে বারণ নাকি? তোমার দাদা কোথায়?”
আমি বললাম, “ঘরে।”
বউদি গটগট করে ঢুকে ওদের ঘরের দরজায় নক করল। দাদা দরজা খুলে দেখল বউদি দাঁড়িয়ে আছে।
আমার হেবি হাসি পাচ্ছিল। দাদার মুখটা বউদিকে দেখে কেমন পেটো পাঁচুর মতো হয়ে গেল।
বেচারা ভালোই ছিল বাড়িতে।
বউদি যে বিনা নোটিসে চলে আসবে বুঝতে পারেনি।
দাদা বলল, “তুমি?”
বউদি বলল, “সবাই মিলে তুমি তুমি করছ কেন? হ্যাঁ আমি। এলাম।”
দাদা বলল, “তুমি একা একা চলে এলে?”
বউদি বলল, “কেন একা আসতে পারি না?”
দাদা বলল, “জানাতে পারতে তো একবার।”
বউদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “মিলি, যা খাবার আছে বের করে দাও তো। আমার দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি।”
দাদা কেমন ক্যাবলা ক্যাবলা মুখ করে বউদির দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি হাসি চাপতে চাপতে ফ্রিজের দিকে ছুটলাম।
দুপুরে চারাপোনা হয়েছিল।
বউদি আবার ছোটোমাছ খেতে পারে না।
৪৪
শিয়ালদা স্টেশনে নারান যখন নামল তখন দুপুর বারোটা। দোকানের মাল নিতে প্রতি মাসেই কলকাতা আসতে হয়। অন্যান্যবার দোকানের ছেলেটাকেই পাঠায়, শুধু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে নিজেই আসে। ছেলেটাও খুশি হয়। অনেক মাল বইতে হয়। নারান গেলে ট্রান্সপোর্টে নিয়ে আসে। ছেলেটা গেলে ওর ঘাড় দিয়েই সব যায়।
বিপিনের হোলসেলারের ব্যবসা বড়োবাজারে। নারান যেতেই বিপিন খুব খুশি হল। নারানের মতো শান্ত স্নিগ্ধ স্বভাবের লোককে বিপিন বড়ো পছন্দ করে। নিজেই বলে সারাক্ষণ খিট খিট করতে করতে আর দাম নিয়ে ঝগড়া করতে করতে জীবন চলে গেল। নারানের সঙ্গে কথা বলে তার মাথা ঠান্ডা হয়।
“বসো বসো, শরবত খাবে তো?” দোকানের একটা ছেলে চেয়ার এগিয়ে দিল।
নারান বসল।
বিপিন বলল, “কী খবর তোমাদের ওদিকে? প্রায়ই তো খবরে দেখাচ্ছে কীসব রেপ-টেপ হচ্ছে? খুব বাজে অবস্থা তো!”
নারান বলল, “হ্যাঁ খুব বাজে অবস্থাই বটে।”
“পুলিশ কী করছে? কাউকে ধরতে পারল?”
নারান না-সূচক মাথা নাড়ল।
বিপিন বলল, “এখন চারদিকে এই একই অবস্থা চলছে। তুমি দেখবে, নিশ্চয়ই কোনও কমবয়সি ছোঁড়াদের কাজ। এই মোবাইল হল যত অনিষ্টের মূল। হাতে হাতে মোবাইল। সবাই ব্লু-ফিল্ম দেখে, আর এইসব করে বেড়ায়।”
