রূপম বলল, “ওহ। আমার কাছে তো এখন সিগারেট নেই।”
পাগলটা বিরক্তির ভাব করল।
রূপম বলল, “পাগল সেজে ঘুরছেন কেন? ইনভেস্টিগেশনের কাজ?”
পাগলটা বলল, “আর কী হতে পারে? যেমন জায়গা আপনাদের! আমার মতো ঘুঘু লোকেরও জিনা হারাম করে দিচ্ছে মশাই! একই পদ্ধতিতে খুন আর রেপ করে চলে যাচ্ছে অথচ কেউ ধরতেও পারছে না!”
“পারছে তো, আপনাদের পুলিশ পারছে, আমার স্টেশন লিভ একমাস পিছিয়ে দিল সাফল্যের সঙ্গে।” তিক্ত গলায় বলল রূপম।
পাগলটা খানিকক্ষণ দাড়ি চুলকে বলল, “ওটা তো আমিই বলে করিয়েছি।”
রূপম অবাক হল, “মানে?”
পাগলটা ছাদের উপরেই বসে পড়ল, “সীমান্তে সৈনিকরা গুলি খেয়ে মরছে আর আপনি দেশের জন্য এইটুকু করতে পারবেন না মশাই? একটা মারাত্মক খুনি, সাইকো দ্য রেপিস্ট বুক বাজিয়ে সমাজের বুকে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে, তাকে ধরতে হবে না? আপনাকে আটকানো হয়েছে শুনে সে তো দিব্যি খুশি হয়ে গেছে এতক্ষণে। পরের টার্গেটও ঠিক করে নিয়েছে নির্ঘাত। এইটুকু স্পেস তো তাকে দিতেই হত। আপনি সেটা দিলেন নিজে শহিদ হয়ে। ভয় পাবেন না। পরে আপনার যা যা ডকুমেন্ট লাগবে ডিপার্টমেন্ট থেকে আমি সাপ্লাই দিয়ে দেব।”
রূপমও বসল। খানিকক্ষণ চুপ করে বলল, “তা আপনি এখন কেন এলেন?”
পাগলটা বলল, “এই যে খ্যাপাচোদার মতো আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেটা উলটে আমাদের ইনভেস্টিগেশনেই প্রবলেম করে দিতে পারে সেটা বুঝছেন না বলে একান্ত নিরুপায় হয়ে আপনাকে দর্শন দিতে আসতে হল। আশা করি এবার বুঝতে পেরেছেন।”
রূপম বলল, “আমি তো এমন কিছু বিহেভিয়ার করিনি যাতে আপনাদের এটা মনে হতে পারে!”
পাগলটা বলল, “করেছেন। আপনি আপনার রাজনীতি করা আর-এক গান্ডু বন্ধুকে নিয়ে দ্বিতীয়বার থানায় গেছেন। থানার বড়োবাবুকে তো আর আমি বলিনি, অন্যভাবে বলানো হয়েছে। তার আলাদা সেটিং করতে হয়েছে। আপনার বন্ধু তার রাজনৈতিক দাদাকে ফোন করেছে। কপাল ভালো তিনি খিস্তি মেরে দিয়েছেন আপনার বন্ধুকে। নইলে আর-এক কেলোর কীর্তি হত।”
রূপম বলল, “ওই নেতা আপনাদের নেটওয়ার্কে নেই?”
“খেপেছেন আপনি? উনি থাকলে আর দেখতে হত না। ইনভেস্টিগেশন গাধার ইয়েতে ঢুকে যেত। ওনাকে শুধু আরও ওপর থেকে হালকা টাচ করে রাখা আছে এই এলাকায় যাকেই ঢোকানো হবে তাকে যেন ছাড়ানোর জন্য কেউ থানায় না যায়। উনি সেটা শুনেছেন সেটা আমার বাপের ভাগ্য ভালো।”
রূপম বলল, “তাহলে আমি এখন এই একমাস এখানেই বসে থাকব বলছেন?”
পাগলটা রূপমের কথার উত্তর না দিয়ে নিজের ঝুলি খুঁজতে শুরু করল। একটু পর একটা ঠোঙা বের করে বলল, “ইউরেকা।” তারপর তার থেকে একটা আধখাওয়া মুরগির ঠ্যাং বের করে চিবোতে চিবোতে বলল, “থাকবেন। কী সমস্যা? বাড়িতে থাকবেন, বাপ-মা-বোনদের সাথে বন্ডিং শক্ত করবেন। আজকাল তো বাঙালি ফ্যামিলি নিয়ে থাকা ভুলে গেছে। আপনিও তো বউ নিয়ে আলাদা থাকবেন। এখন থাকুন, ভালো থাকবেন।”
রূপম খানিকক্ষণ পাগলটার ঠ্যাং চিবোনো দেখে বলল, “এটা আপনি খেতে পারছেন?”
পাগলটা বলল, “কেন? খেতে পারব না কেন?”
রূপম বলল, “এটা খেলে তো কলেরা, আমাশা, জন্ডিস সব হতে পারে!”
রাস্তার ভেপারের আলো পাগলটার চুলের ওপর পড়ে একটা হলুদ আভা তৈরি করছিল। পাগলটা ঠ্যাংটা ঠোঙায় রেখে রূপমের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের দেশে কত শতাংশ মানুষ পরের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকে এ সম্পর্কে ডু ইউ হ্যাভ এনি ফাকিং আইডিয়া? কত শতাংশ শিশু রাস্তায় ফুটপাথে শুয়ে থেকে প্রতি রাতে হারিয়ে যায় আপনি জানেন? কোনওদিন সুযোগ পেলে আমি আপনাকে দেখাব। আমি কেন তবে তাদের মতো জীবন কাটাতে পারব না বলতে পারেন?”
রূপম বলল, “আপনার নাম জানতে পারি?”
পাগলটা বলল, “ডিপার্টমেন্টে সবাই গোকুল বলে ডাকে। আপনিও ওই নামটা ধরে আমাকে ডাকতে পারেন। তবে না ডাকাই ভালো। আমার কথা নিশ্চয়ই কাউকে বলবেন না।”
রূপম বলল, “তা বলব না। তবে আপনার আসল নামটা কী?”
পাগলটা বলল, “বাপের দেওয়া নাম, দাঁড়ান মনে করি।”
তারপর বেশ খানিকক্ষণ দাড়ি চুলকে বলল, “ভুলে গেছি মশাই। মনে পড়ছে না। আচ্ছা। আপনি এখন ঘুমিয়ে পড়ুন। আমিও জায়গায় যাই। গুডনাইট।”
বলে পাগলটা রূপমের উত্তরের অপেক্ষা না করেই ছাদ থেকে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গেল। রূপম বেশ খানিকক্ষণ অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকল।
৪৩
মধুমিতার একটা বয়ফ্রেন্ড হয়েছে।
তাও ফেসবুকে।
পড়া থেকে বেরিয়েই ফোন কানে দিয়ে “সোনু, জানু” করে ন্যাকামি করে আমায় জ্বালিয়ে খাচ্ছে।
প্রথম প্রথম মজা পাচ্ছিলাম, এখন বিরক্তি ধরে গেছে।
ধরাটাই স্বাভাবিক। হঠাৎ করে গলার টোন চেঞ্জ করে অনেকদিনের চেনা বন্ধু কাউকে যদি ফোন করে বলে “জানু আই অ্যাম মিসিং ইউ” তাহলে বিরক্তি ধরাটাই স্বাভাবিক। ছেলেটা দিনে একটা করে ফটো আপলোড করে আর দুনিয়াসুদ্ধ মেয়েকে ট্যাগ করে।
সে নাকি মধুমিতার বয়ফ্রেন্ড।
কাল পড়া থেকে ফিরছি, আর মধুমিতা যথারীতি ফোনে ন্যাকামি সেরে আমায় গর্ব গর্ব গলা করে বলেছে, “জানিস ও যে জিমটায় যায় সেটায় দেবও আসে জিম করতে।”
আমি একটা আইসক্রিম খাচ্ছিলাম।
ওর কথায় বিষম-টিষম খেয়ে অস্থির হয়ে গেছি। আর আমার হাসি দেখে ওর কী রাগ! বলে, “তুই হিংসা করছিস এখন। নিজের তো কোনও বয়ফ্রেন্ড নেই, তাই আমাকে হ্যাটা দিচ্ছিস, আমি বুঝি না ভেবেছিস?”
