রক্ত জাগতে শুরু করছে আবার।
নিজের ওপরেই বিরক্ত লাগছিল তার। এরকম তো কখনও হয় না। কচি মেয়ের অভিজ্ঞতা তো আগেও হয়েছিল।
তাহলে এর আকর্ষণী শক্তি এত প্রবল মনে হচ্ছে কেন?
৪১
“ঘুমিয়ে পড়েছিস?”
বিভাসবাবু কখন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন বুঝতে পারেনি রূপম। সে শুয়ে শুয়ে মোবাইল ঘাঁটছিল। বাবার গলা শুনে উঠে বসল, “না না, এসো।”
বিভাসবাবু ইতস্তত করছিলেন। রূপম লাইট জ্বালাল। বলল, “বসো খাটেই বসো।”
বিভাসবাবু বসলেন, “বউমাকে জানিয়েছিস?”
রূপম বলল, “হ্যাঁ। জানিয়েছি।”
বিভাসবাবু বললেন, “খুব রাগারাগি করছে নাকি?”
রূপম কিছু বলল না। বাড়িতে কিছুই বলা হয়নি এখনও শ্রাবন্তীর ব্যাপারে। বলবে নাকি ভাবছিল।
বিভাসবাবু বললেন, “তুই কলকাতা যেতে পারবি, না তাও পারবি না?”
রূপম বাবার দিকে তাকাল। বাবার বয়স হচ্ছে। অথচ এই বাবাই তাকে নিয়ে একসময় কত ঘুরত সাইকেলে করে। সময় কীভাবে কেটে যায়। দূরত্ব তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।
সে বলল, “থানায় কথা বলতে হবে। দেখি। ও যদি আসতে চায় তাহলে নিয়ে আসব।”
বিভাসবাবু বললেন, “বউমা যা চায় তাই কর। এখানে কমফর্টেবল নাও হতে পারে।”
রূপম বলল, “হ্যাঁ। সেটা ভেবেছি।”
বিভাসবাবু বললেন, “তুই চিন্তা করিস না। পুলিশ নিরপরাধকে অপরাধী করে দেয়। এখন তো বোঝাই যাচ্ছে পলিটিক্যাল কারণে হেনস্থা করার চেষ্টা করছে তোকে। তোর মা আমাকে বলছিল পলিটিক্যাল লোকজনদের কাছে যেতে, আমি বারণ করেছি। সৎ লোকেদের কারও কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তুই দেখিস। ওরা কিচ্ছু করতে পারবে না।”
রূপম কিছু বলল না। আজ কি তার বা মোমের এই অবস্থার জন্য বাবাকে দায়ী করা যায়? কোনওভাবেই না। বাবা মা-রা কখনও খারাপ চাইতে পারে না। আজ যেটুকু সে হতে পেরেছে বাবার জন্যই তো! তখন মোমের সঙ্গে প্রেম করে বেড়ালে কি সে এই জায়গায় যেতে পারত? তারও তো সন্তান আসছে। বাবার মতন বাবা কি সে হতে পারবে? একসময় কত কষ্ট করেছে তারা, অথচ শত কষ্টেও বাড়ির সবথেকে ভালো জামাটা তার জন্য নিয়ে এসেছে বাবা।
বিভাসবাবু বললেন, “অফিসে জানিয়েছিস?”
রূপম বলল, “না। এখনও বুঝে উঠতে পারছি না কী বলব।”
বিভাসবাবু বললেন, “জানিয়ে দে। কোনও কিছু ঢাকতে হবে না। মিথ্যা কথা বা অর্ধসত্য বলার দরকার নেই।”
রূপম বলল, “ওরা দোষী প্রমাণিত করলে আমার চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে বাবা। তখন আমরা কী খাব? দুটো বোনের বিয়ে বাকি আছে এখনও।”
বিভাসবাবু বললেন, “এই কথাগুলো তোর মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এখন? তোর মনে আছে ক্লাস টেনে যখন পড়তি তখন টেস্টে স্কুলের বাগচীবাবুর কাছে প্রাইভেট টিউশন নিতি না বলে ফেল করিয়ে দিয়েছিলেন? আমারও ধারণা হয়ে গিয়েছিল তুই বোধহয় মাধ্যমিক ফেল করে যাবি। সেই টেস্টের সেকেন্ড লিস্টে তুই পাশ করেছিলি। আর মাধ্যমিকে এলাকার মধ্যে সবথেকে বেশি নাম্বার পেয়েছিলি। ইঞ্জিনিয়ারিং যখন পড়তি তোকে কত হাতখরচা দিতে পারতাম আমি? নিজেই তো পড়েছিস। টিউশনি করেছিস, স্কলারশিপ পেয়েছিস, সব নিজের জেদে। এত কিছুর একটা লড়াই, সামান্য একটা পলিটিক্যাল কন্সপিরেসিতে শেষ হয়ে যায় নাকি? ভাবলি কী করে?”
রূপম বাবার দিকে তাকাল। বাবা সব মনে রেখেছে। তাকে নিয়ে বাবার সবথেকে বেশি গর্ব। সে অনেকক্ষণ পরে হাসল। তারপর বলল, “চাকরি চলে গেলে কী করব এই রেজাল্ট দিয়ে সেটা তো বলো!”
বিভাসবাবু বললেন, “তুই আরও চাকরি পাবি। নইলে দেখা যাবে। তোর বয়স কত? এই বয়সে এত চিন্তা করতে হবে না। কষ্ট করে সৎভাবে যারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে তাদের কিচ্ছু হয় না। এই লড়াইটা তো তোর একার না, আমাদের গোটা পরিবারের, টিকে থাকার লড়াই। অনেক রাত হল। তুই ঘুমিয়ে পড় এবার।”
বিভাসবাবু হঠাৎ করে কথাটা শেষ করে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন। রূপম একটু অবাক হল। বাবা কেমন চুপচাপ থাকে অন্যান্য সময়। এখন হঠাৎ করে এত স্পষ্টবক্তা হয়ে তাকে এভাবে আশ্বাস দিয়ে গেল!
সময় মানুষকে কখনও ভেঙে দেয়, কখনও শক্ত করে তোলে। বাবার ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টা হয়েছে।
ভালো লাগছিল রূপমের। এখনই ভেঙে পড়ার কিছু হয়নি তাহলে!
***
বেশ খানিকক্ষণ ভেবে ভেবে যখন ঘুম চলে আসছিল তখনই জানলায় ঠকঠক শব্দ হতে শুরু করল। সে অবাক হল। রাত সাড়ে বারোটা বাজে প্রায়। এত রাতে জানলায় নক করছে কে? প্রথমে ভাবল বাড়ির সবাইকে ডাকবে। তারপর মনে হল পরিচিত কেউ এসেছে।
সে গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব কম করে বলল, “কে ওখানে?”
জানলার ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, “ছাদে আসুন, কথা আছে।”
রূপম অবাক হল। গলার স্বর অপরিচিত। সে বলল, “আপনি কীভাবে আসবেন?”
ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, “আহ, আপনি আসুন না। তারপর দেখবেন নাহয়।”
রূপম বেরোল ঘর থেকে। ছাদে যাওয়ার সিঁড়িতে নিচে তালা নেই। উপরে ছিটকিনি দেওয়া। রূপসী আর মিলিরা জেগে আছে।
সে ধীর পায়ে নিঃশব্দে ছাদে উঠল। ছিটকিনি খুলে দেখল পাগলটা দাঁড়িয়ে আছে।
৪২
-সিগারেট আছে মশাই?
পাগলটার কথা শুনে চমকাল রূপম। এ তো রীতিমতো সুস্থ মানুষের গলা!
সে বলল, “আপনি…?”
“পাগল না মশাই, আইবি-র লোক। তবে বেশিদিন এই ভূমিকায় থাকতে থাকতে ওই ধারেকাছেই চলে গেছি বলতে পারেন।”
