বাপ্পাদার কথা শুনে মা মুখে আঁচল দিল। বাবা কেমন পাথর পাথর মুখ করে বসে থাকল।
আমার বাবা আর দাদার মুখটা দেখে বুকটা কেমন করে উঠল। ভালোমানুষদের সঙ্গেই কি সবসময় এরকম হতে হয়?
মা বলল, “পুলিশ কি রূপমকে সন্দেহ করছে?”
দাদা রেগে বলল, “থামো না, আমার আর এসব কথা ভালো লাগছে না।”
মা চুপ করে গেল।
বাপ্পাদা বলল, “চিন্তা করবেন না কাকিমা, আমি দেখছি, বুঝতেই পারছেন পলিটিক্যাল অনেক কিছু সমস্যার জন্য নির্দোষ লোকেদের নিয়েও টানাটানি হয়। তবে আমি বেঁচে থাকতে রূপমের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না কেউ।”
বাপ্পাদার কথায় অন্যান্য দিন হাসি পায়। বাপ্পাদা এভাবেই কথা বলে। কিন্তু এ কথাটা শুনে বোঝা গেল বাপ্পাদা ফালতু ফালতু কথাটা বলল না। খুব সিরিয়াস হয়েই কথাটা বলল।
বাপ্পাদা যে দাদাকে কতটা ভালোবাসে এই কথাটা শুনে বুঝতে পারলাম।
কেন জানি না, খানিকটা সাহসও এল।
৪০
“পুলিশ নাকি বিভাসবাবুর ছেলেকে ডেকে পাঠিয়েছিল?”
ভটচাজবাবুর কথাটা শুনে নারাণের কান খাড়া হল। অবশ্য মুখটা নির্বিকার থাকল। সান্যালবাবু ভটচাজবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমিও শুনেছি। ছেলেটা তো পড়াশোনায় বেশ ভালো। তা ছাড়া এলাকায় থাকেও না। ওকে খামোখা ফাঁসানো হচ্ছে যা বুঝতে পারছি।”
ভটচাজবাবু বললেন, “কার মনে কী আছে তুমি করে বুঝবে সান্যাল? তুমি জানো কত ছেলে কী থেকে কী হয়ে যায়? সামনে দেখলে বুঝতে পারবে না ভিতরে ভিতরে কী যন্তর চিজ আছে। ওই তো কিছুদিন আগেই পড়লাম না কোন বাঙালির ছেলে আইসিসে যোগ দিয়েছে? কেউ ভাবতেও পেরেছিল? সবকিছু অত সহজ ভাব নাকি হে।”
দাসবাবু ভটচাজের কথাটা শুনে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “কথাটা মন্দ বলোনি। তা ছাড়া…” একটা গলা খাঁকারি দিলেন দাসবাবু।
সান্যাল সহ বাকিরা উদগ্রীব হয়ে দাসবাবুর দিকে তাকালেন, “কী ব্যাপার হে? কী বলতে গিয়ে চেপে যাচ্ছ?”
দাসবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “ও ছেলের সঙ্গে এককালে মেয়েটার সম্পর্ক ছিল হে। কী ছিল মনে আমরা কী জানি?”
সান্যালবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগলেন, “তোমরা কিছুতেই বুঝতে পারছ না। এ খেলা অন্য খেলা। মেয়েটাকে কীভাবে মেরেছে দ্যাখো! হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে, কোনও স্বাভাবিক পাবলিক এসব পারে নাকি? খুব নিম্নমানের জন্তু প্রকৃতির লোকের কাজ। যারা আগের রেপগুলো করেছে এগুলো তাদেরই কাজ।”
একটা হিসাবের খাতা আছে নারানের। সেটায় দোকানের হিসেব লিখছিল। সান্যালবাবুর কথাটা শুনে পেনটায় একটু জোর দিয়ে ফেলল সে। সামান্য কাটাকুটি হল খাতায়।
দাসবাবু বললেন, “জন্তু প্রকৃতির লোক, সে ব্যাপারে তো কোনও সন্দেহ নেই। এ কাজগুলো তো মেইনলি সাইকোরা করে। এদের মাথা খুব ঠান্ডা হয়, প্ল্যানিং করে কাজগুলো করে। তবে কী জানো তো, যেদিন ধরা পড়বে না, গণধোলাই খেয়ে যাবে।”
নারান উদাস চোখে বাজারের দিকে তাকাল। শান্ত স্বাভাবিক বাজার। অন্যান্যদিনের মতোই।
ভটচাজবাবু বললেন, “বিভাসবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করতে গেলে হত। টেনশনে আছেন হয়তো।”
সান্যাল বললেন, “তা যাওয়া যেতেই পারে। বিকেলে যাবে নাকি?”
সবাই মতৈক্যে আসতে বেশি সময় নিলেন না। নারান বোকাসোকা মুখ করে ওঁদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “বিভাসবাবুর ছেলেকে কি ধরেছে পুলিশ?”
সান্যালবাবু মাথা নাড়লেন, “না বোধহয়। তবে এইসব কেসে সাসপেক্টকে চোখে চোখে রাখাটাই নিয়ম।”
নারান যেন খুব বুঝেছে এরকম মাথা নেড়ে মন দিয়ে হিসাব করতে লাগল।
তার যোগের হাত খুব ভালো। ক্যালকুলেটর ছাড়াই সে বড়ো বড়ো যোগ করে দিতে পারে। কালকে অনেক কিছু বিক্রি হয়েছিল, কী একটা পুজো ছিল, সে মন দিয়ে তার হিসেব মেলাতে লাগল।
তিনশো তেত্রিশ আর সাতশো আটাত্তর মেলাতে যাচ্ছিল এমন সময় নজর পড়ল মেয়েটা পড়া থেকে ফিরছে। দূর থেকেই নারান সেই গন্ধটা পেল।
নারানের পেনটা থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে। সান্যালবাবু বলছিলেন, “আজকাল এমন সময় এসেছে, আত্মীয়স্বজনকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করতেও লজ্জা লাগে। জায়গাটা কুখ্যাত হয়ে গেল ক-দিনের মধ্যেই।”
দাসবাবু বললেন, “সেই তো, বাপু, রেপ করছিস কর, জামাকাপড়টা তো পরিয়ে দে, ওভাবে সবকিছু …।”
নারান পরিষ্কার বুঝতে পারল খানিকক্ষণ আগে বড়ো বড়ো কথা বলা দাসবাবুর চোখটা একটু জ্বলে উঠে নিভে গেল।
সে দোকানের ছেলেটাকে বলল, “একটা ছোটো হাতুড়ি কিনে আনিস তো। দোকানের হাতুড়িটা পাচ্ছি না ক-দিন ধরে।”
ছেলেটা বিরক্ত গলায় বলল, “আরও কিছু টাকা দেবেন, পেরেক নিয়ে আসব। ঠাকুরের আসনটা আলগা হয়ে আছে। ঠিক করতে হবে।”
নারান বলল, “আলগা হয়ে গেছে সেটা আগে দেখবি না? যা যা, নিয়ে আয়।”
ক্যাশ থেকে বের করে ছেলেটাকে টাকা দিল নারান।
মেয়েটা একটা দোকান থেকে কিছু একটা কিনছে। নারান খানিকক্ষণ আড়চোখে তাকাল।
তার মাথায় অবশ্য আর-একটা কথাও ঘুরছিল। পুলিশ বিভাসবাবুর ছেলেকে ডেকেছে। তার মানে এখন বিভিন্ন নির্দোষ লোককে কেস দিয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা থাকবে পুলিশের মধ্যে।
এখন ক-দিন চুপচাপ থাকলে খেলাটা জমে যাবে।
কিন্তু মেয়েটার দিকে চোখ চলে যেতেই তার মনটা বাঁধ মানছে না। নব অঙ্কুরিত শরীরের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। মেয়েটার চোখদুটো ডাগর। সবে যৌবন আসছে। গলা টিপে ধরলে চোখদুটো যখন তাকে চিনতে পারবে সেটা ভেবে দোকানের মধ্যে সে অতি কষ্টে মনটা শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
