“মানে দাদা।”
“রাখ শুয়োরের বাচ্চা।”
ফোনটা কেটে গেল। বাপ্পা একবার রূপমের দিকে তাকাল। রূপমের মুখটা থমথমে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কথোপকথনের খানিকটা ও আঁচ করতে পেরেছে। মাইতিবাবু হাসলেন, “কী হল? খুশি কথা বলে?”
বাপ্পা পানসে হাসি দিয়ে বলল, “আসছি স্যার।”
মাইতিবাবু বললেন, “দেখুন রূপমবাবু, অধৈর্য হবেন না। আইনকে আইনের পথে চলতে দিন। আপনি যে এই পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স খাটাতে গেলেন, এটা কিন্তু আপনার এগেইনস্টেই যাবে। আশা করি আপনি খানিকটা বুঝতে পেরেছেন বাপ্পাবাবু?”
রূপম কিছু না বলে বেরিয়ে এল। পিছন পিছন বাপ্পা।
থানা থেকে বেরিয়ে দুজনেই কোনও কথা বলল না। বাপ্পার বাইকের পিছনে রূপম খানিকটা গিয়ে বলল, “এক কাজ কর, আমাকে মোমের বাড়িতে নামিয়ে দে।”
বাপ্পা বলল, “কেন খামোখা জড়াতে চাইছিস বল তো? বাড়ি যা।”
রূপম ক্লান্ত গলায় বলল, “জড়াতে আর পারলাম কই।”
৩৯ মিলি
আমাদের বাড়িটা একেবারে সাধারণ একটা বাড়ি। অনেক মানুষ থাকে যারা চুরি করে, খুন করে, জেলে যায়, আদালতে যায়। আমাদের বাড়িতে কাউকে যে কোনওদিন থানায় যেতে হতে পারে সেটা আমাদের কারও ধারণাতেই ছিল না।
পুলিশের গাড়িটা চলে যাবার পর পাড়াপ্রতিবেশীরা ভিড় করে আমাদের বাড়ি আসা শুরু করল। মজা দেখতেই। মানুষ গুজব ভালোবাসে। অনেকেই উদ্বিগ্ন মুখে জানতে চেয়েছে দাদা গ্রেফতার হয়েছে নাকি।
দাদা ভালো ছাত্র ছিল, ভালো চাকরি করে। কলকাতার মেয়ে বিয়ে করেছে। পাড়ার অনেকেরই চোখ টাটায় স্বাভাবিকভাবেই। লোকের ভালো দেখতে পায় না কেউ। আমাদের মতো বাড়িতে যে পুলিশ এসেছে সেটা অনেকেরই খুশির কারণ হয়ে গেল।
প্রথমেই এল পাল কাকিমা আর দাস কাকিমা। এসে মা-র কাছে উদ্বিগ্ন গলায়, “ও বউদি, কী হয়েছে গো?”
মার মেজাজ ঠিক ছিল না। তবু যতটা পারে স্বাভাবিকভাবেই বলার চেষ্টা করল, “কই কিছু না তো!”
পাল কাকিমা বলল, “পুলিশ এসেছিল কেন গো?”
মা বলল, “ওই রূপমের সঙ্গে কী একটা দরকার ছিল ওইজন্যই হয়তো।”
মার কথা শুনে দুই কাকিমা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বলল, “পুলিশের সাথে আবার রূপমের কী দরকার গো বউদি?”
মা বলল, “আমি কী জানি।”
পাল কাকিমা মাকে বলল, “ওই যে মেয়েটা মরল, ওকে নিয়ে নাকি গো? ওই মেয়েটা তো খুব আসত তোমাদের বাড়িতে। আহা গো, চাঁদপানা চেহারা।”
আমার মাথা গরম হচ্ছিল। মা না থাকলে শিয়োর গালাগালি দিয়ে দিতাম।
দাস কাকিমা গলা নামিয়ে গলাটাকে নাটকীয়ভাবে কাঁদো কাঁদো করে বলল, “মেয়েটাকে রূপমের সঙ্গে বড়ো মানাত গো!”
মা এবার রাগল। বলল, “রূপমের সঙ্গে মানাত না মানাত সেসব কথা এখন বলার কি কোনও দরকার আছে? কেন এসব কথা বলছ এখন?”
দুই কাকিমা চুপ করে গেল। তারা যেতে এল রায় কাকিমা। রায় কাকিমা বরাবরই সব কথাকে রহস্যের মোড়কে বলতে ভালোবাসে। ঘরে ঢুকেই মা-র কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলল। মা বলল, “কী বলছেন?”
রায় কাকিমা এবার গলার স্বর তুলে বলল, “রূপমকে নাকি পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে?”
মা রেগে গেল এবার, “কীসব অলুক্ষুণে কথা বলছেন দিদি। রূপমকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে কেন? রূপম কি সে ধরনের ছেলে?”
রায় কাকিমা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, “সে কী! মিনু যে বলল পুলিশ এসে রূপমকে ধরে নিয়ে চলে গেছে।”
আমি বুঝলাম মার প্রেশার বাড়ছে। বললাম, “না কাকিমা, কোনও ভয় নেই। দাদাকে ধরতে আসেনি। তা ছাড়া দাদা ছিলও না বাড়িতে। এত চিন্তা কোরো না গো, প্রেশার উঠে যাবে, সুগারও ধরতে পারে। তোমার যা চেহারা আরও অনেক কিছুই হতে পারে। ইবোলা, থাইরয়েড, এমনকি ফটোসিন্থেসিস এইচআইভি-ও হতে পারে।”
রায় কাকিমা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এগুলো কী রে মিলি? রোগ?”
দিদি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ছিল। আমার পেট ফেটে হাসি আসছিল। সেটাকে ম্যানেজ করতে করতে বললাম, “হ্যাঁ কাকিমা, ফটোসিন্থেসিস এইচআইভি মারাত্মক রোগ। আফ্রিকার গাছেদের থেকে হয়। যাদের নিজেদের থেকে পরের সমস্যায় বেশি চুলকোয় তাদের ফটোসিন্থেসিস এইচআইভি হয়।”
বলেই হেসে ফেললাম ফিক করে। মা একটা ধমক দিল, “এই মিলি, এগুলো কী ভাষা? বড়োদের সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলে বুঝি?”
আমি সড়াৎ করে সরে গেলাম। রায় কাকিমার মুখটা কেমন কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছিল আমার কথা শুনে, ভেবে বেশ খানিকক্ষণ হেসেই গম্ভীর হয়ে গেলাম। দাদা কলকাতা থেকে আসবে ভেবে ভীষণ টেনশন হওয়া শুরু হল। বাবা তখন থেকে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। নিজেই বলল বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। পুলিশ যদি মনে করে অকারণ কেস দিয়ে ফাঁসিয়ে দেবে তাহলে অনেক কিছু হতে পারে। আজকালকার যা সমাজ তাতে অপরাধী দোষী না নির্দোষ সেটুকু পর্যন্ত কেউ ভেবে দ্যাখে না। সবাই শুধু লোকের গায়ে কাদা ছেটাতে ব্যস্ত।
***
দাদা যখন এল তখন রাত দশটা। বাড়ির সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে সামনের ঘরে বসে ছিলাম। দাদার সঙ্গে বাপ্পাদাও এল। ঘরে ঢুকে দাদা বসল ড্রয়িংরুমের টেবিলে। মা বলল, “কী রে, তুই কখন এলি?”
দাদা বলল, “ওই তো, থানায় গেছিলাম। তারপর মোমের বাড়িও।”
বাবা বলল, “থানায় কী বলল?”
দাদা গম্ভীর হল। বাপ্পাদা বলল, “কী বলবে, একমাস স্টেশন লিভ করতে পারবে না। এখানেই থাকতে হবে।”
