এক, দুই, তিন—বারবারার তাস দেওয়া হয়ে গেল ৷ আগের মতোই সে তাসগুলি স্পর্শ করে মুদিত চক্ষে বিড় বিড় করে কী যেন বললে ৷ তারপর তাস তিনখানা উল্টে দিল ৷ সেই দিকে তাকিয়ে আমার চোখ দুটো পাথরের মূর্তির চোখের মতো পলকহীন হয়ে গেল ৷ বারবারা যে দান তুলেছে, তার চেয়ে বড় দান আর হয় না ৷ তুলেছে তিনখানা টেক্কা—ইস্কাবন, হরতন, আর চিড়েতনের ৷
এক মুহূর্তের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ৷ শেষ পর্যন্ত এই হল? শেষ বাজির খেলায় ভাগ্য আমাকেই ছলনা করল?
তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো বারবারার শান্ত-কঠিন কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে বিঁধল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, শেষ বাজি আমারই ৷
অন্ধ আক্রোশে আমার তাসগুলো তুলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিলাম ৷ কিন্তু একী!— আমার বরফের মতো ঠান্ডা থেমে-যাওয়া হৃৎপিণ্ড হঠাৎ যেন তপ্ত রক্তস্রোতে ফের খরবেগে চলতে শুরু করল ৷
সেই শাণিত ব্যঙ্গের হাসি হেসে বারবারা বলে উঠল, তোমার তাসগুলো অনর্থক দেখে লাভ কী, সেন? তিনখানা টেক্কার চেয়ে বড় দান আর হয় না—আশা করি, তা তোমার জানা আছে ৷ ভাগ্যের এই ঠাট্টাটুকু সহজভাবে নিতে চেষ্টা করো, সেন ৷
ফার-কোট আর টুপি নিয়ে বারবারা উঠতে যাচ্ছিল ৷ বললাম, বসো ৷ ভাগ্য আমাকে ঠাট্টা করেনি, করেছে তোমাকে ৷
বারবারা জিজ্ঞাসু চোখ তুলে তাকাল ৷ আমার হাতের তাসগুলো গুনে দেখলাম ৷ এক, দুই, তিন, চার ৷
এবারে হাসবার পালা আমার ৷ বললাম, শেষ বাজির খেলাটা আসলে খেলাই হয়নি ৷ উত্তেজনায় তাস তোমার দিতে ভুল হয়েছে বারবারা ৷ তিনখানার বদলে আমাকে চারখানা দিয়ে ফেলেছ ৷ সুতরাং এবারের খেলা নাকচ ৷—তারপর আমার কুৎসিত মুখে বীভৎস হাসি ফুটিয়ে থেমে থেমে বললাম, ভাগ্যের এই ঠাট্টাটুকু সহজভাবেই নিতে চেষ্টা করো সুন্দরী বারবারা!
বারবারার মুখ দেখতে দেখতে সাদা হয়ে গেল ৷ প্রবল চেষ্টায় নিজেকে সামলে নিয়ে সে শুধু বললে, বেশ, আবার নতুন করে খেলা শুরু হোক ৷
ঝড়ে যেমন দেবদারুর কচি শাখা কাঁপে, তেমনি কম্পিত হাত বাড়িয়ে বারবারা তাসগুলো কুড়িয়ে নিতে গেল ৷ কিন্তু তার আগেই আমার কালো কর্কশ মুঠির মধ্যে তার হাতখানা ধরে ফেলে বললাম, না, আর খেলা হবে না ৷
বারবারার মুখ-চোখ, সমস্ত দেহ পলকের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে উঠল ৷ কঠিন কণ্ঠে সে বললে, শেষ খেলা খেলতেই হবে সেন, নইলে ভাগ্যের সঙ্গে বোঝাপড়া হবে না ৷
বললাম, তার আগে আমার সঙ্গে বোঝাপড়া করো বারবারা ৷
হাত ছাড়ো—তাস দিতে দাও—
না ৷
হাত ছেড়ে দাও বলছি—
না—না—না!
ঘরের ভেতর পুরুষ ও নারীর এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের মাঝখানে বাইরের ঝড়ের বেগ কখন যে বেড়ে উঠেছিল, খেয়াল করিনি ৷ হঠাৎ হু-হু করে ক্ষুব্ধ আত্মার আক্ষেপের মতো শীতল দমকা হাওয়ার ঝলক খোলা জানলা-পথে এসে টেবিলের ওপর থেকে তাসগুলোকে এক ফুঁয়ে ঘরময় ছড়িয়ে দিয়ে গেল ৷ প্রবলভাবে দুলতে লাগল ঝোলানো বাতিটা, আর বিচিত্র ঢেউয়ে প্রকাণ্ড হলটা যেন প্রেতরাজ্যের গুহার রূপ ধারণ করল ৷
সঘন নিশ্বাসে বারবারার পীবর বক্ষ, দুই নাসারন্ধ্র ফুলে ফুলে উঠছে ৷ চোখের তারায় শিহরিত আতঙ্ক আর তিক্ত ঘৃণায় মেশানো অদ্ভুত দৃষ্টি ৷ আর আমার মনে হতে লাগল, কোনো এক তীব্র উত্তেজক ওষুধের প্রতিক্রিয়ার ফলে আমার প্রত্যেকটি অণু-পরমাণু যেন ক্রমশ বদলে যাচ্ছে ৷ ডাঃ জেকিল যেন মিঃ হাইডে পরিণত হচ্ছে ৷
কী চাও তুমি?—দম নিয়ে বারবারা জিজ্ঞাসা করল ৷
কালো কর্কশ মুঠির মধ্যে ধরা সুন্দর মসৃণ হাতখানা আকর্ষণ করতেই, টেবিল পার হয়ে আচমকা বারবারা আমার বুকের ওপর এসে পড়ল—একরাশ পপি ফুলের স্তবকের মতো ৷ তেমনি সুরভিত, তেমনি মদির, তেমনি মোহময় ৷ ললিতযৌবনা নারীদেহের চক্ষে, অধরে, মোহময় রূপে আর মায়াময় স্পর্শে চিরকালের যে বিচিত্র ইন্দ্রজাল, তার নেশায় আমার বন্য বর্বর যৌবন মাতাল হয়ে উঠল ৷ আর সেই নেশা আকণ্ঠ পান করে মিঃ হাইড অপরূপযৌবনা বারবারার কানে কানে বলতে লাগল, কী চাই? তুমি কি জানো না বারবারা, তোমার কাছে আমি কী চাই? চাই তোমার এতটুকু ভালোবাসা, করুণা আর কোমল দৃষ্টি—পরিণামে যদি তোমার রূপের আগুনে লোভী পতঙ্গের মতো আমি নিঃশেষে পুড়ে ছাই হয়ে যাই, তবুও—
বারবারার সবুজাভ চোখের তারায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল ৷ প্রবল বিতৃষ্ণায় তার মুখের পেশিগুলো কুঁচকে গেছে ৷ হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে সে বলে উঠল, তোমার কি নরকের ভয় নেই?
বিশ্রী বীভৎস একটা হাসির আওয়াজ আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল ৷ বললাম, তুমি যদি নরক হও বারবারা, তবে সে আমার স্বর্গের চেয়েও—
কথা আমার শেষ হল না ৷ তার আগেই আমার মুখময় থুতু ছিটিয়ে এক ঝটকায় নিজেকে টেনে নিয়ে বারবারা দূরে সরে গেল ৷
তারপর—
তারপর শুরু হল শিকারি আর শিকারে দ্বন্দ্বের খেলা ৷ এধার থেকে ওধার, এ- কোণ থেকে ও-কোণ ৷ কেবলই ধরতে চাওয়া—আর এড়িয়ে যাওয়া ৷ একজনের আক্রমণ, আর একজনের আত্মরক্ষা ৷ উল্টে গেল সোফা, ভেঙে পড়ল টেবিল, টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল কত মূর্তি আর ছবি ৷ একটা চীনে ফুলদানীর টুকরো লেগে রক্তাক্ত হল আমার কপাল, আর নখের আঘাতে বারবারার ছিঁড়ল নীল বক্ষবাস ৷ কনকনে শীতের রাত্রেও কপালে দেখা দিয়েছে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সঘন নিশ্বাসে দম যেন প্রতি মুহূর্তে ফুরিয়ে আসছে ৷ শিকারি আর শিকারের এ খেলা যেন কোনোদিনও আর শেষ হবে না!
