পাথরের মতো ভাবলেশহীন চোখে বারবারা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল ৷ চোখে পলক পড়ছে না, দেহ স্থির ৷ যেন মৃতদেহ কথা কইছে, এমনি করে শুধু ঠোঁট নেড়ে বারবারা হঠাৎ বলে উঠল, ভাগ্য যদি আমায় এনে দিয়ে থাকে, তবে আজ ভাগ্য-পরীক্ষা করো ৷
ভাগ্য-পরীক্ষা ৷
হ্যাঁ, যদি তোমার জিৎ হয়, তোমার প্রাপ্য তুমি পাবে ৷
জিজ্ঞাসা করলাম, আর যদি আমি হারি?
জবাব এল, ভাগ্যকে দোষ দিয়ে আমার পথ থেকে চিরদিনের মতো তুমি সরে যাবে ৷—রাজি আছ ভাগ্য-পরীক্ষায়?
এক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম ৷ ভাগ্যের জুয়াখেলায় কী হবে আমার? হার না জিৎ? … হার না জিৎ? … হার না জিৎ? কেমন যেন একটা নেশা আমায় পেয়ে বসল ৷ যদি জিৎ হয়, তবে আমার পুরস্কার ওই সুন্দরী — বারবারা—সুতনু, সুমধ্যমা, সুদীপ্তযৌবনা ৷ আমার নিঃসঙ্গ জীবনের, আমার বঞ্চিত জীবনের—
কিন্তু ভাগ্যের পাশাখেলায় মন্দভাগ্য পাণ্ডবদের মতো যদি আমার হার হয়? না, না, হার হবে কেন? হার হবে না—আমার হার হতে পারে না ৷ … বারবার আমার মনে হতে লাগল, আমার জিৎ হবেই—আমার জিৎ হবেই! আবার মনটা দুলে উঠল—যদি জিৎ না হয়, যদি শেষ পর্যন্ত হেরে যাই? বারবারার পথ থেকে চিরদিনের মতো আমাকে সরে যেতে হবে? মুহূর্তে শরীরের সমস্ত রক্তস্রোত যেন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে গেল ৷ মধুর সুধার পাত্র মুখের কাছে এগিয়ে ধরে ভাগ্য আবার তা কেড়ে নেবে? না, তা হতে পারে না ৷ কেড়ে নিতে আমি দেব না ৷ বারবার আমার মন, আমার যৌবনের সমগ্র চেতনা যেন লক্ষ করতাল বাজিয়ে বলতে লাগল, এ খেলায় জিৎ আমার হবেই ৷ ক্রমশ সেই নেশাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে আমার শিরা-স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ৷
রুদ্ধ নিশ্বাসে বলে উঠলাম, রাজি আছি—আমি রাজি আছি ৷
বারবারার সবুজাভ চোখের তারা দুটি হীরার টুকরোর মতো ঝকঝক করে উঠল ৷ দেখতে দেখতে তার আইভরির মতো পাণ্ডুর মুখ রক্তোচ্ছ্বাসে রাঙা হয়ে উঠল ৷ কতকটা স্বগতোক্তির মতোই সে বলে উঠল, রাজি আছো! বেশ, তাহলে শুরু হোক আমাদের ভাগ্যপরীক্ষা ৷ তাস আছে?
আছে ৷
আনো ৷
এক মুহূর্ত চিন্তা করে স্টুডিয়োর দরজায় চাবি দিলাম ৷ তারপর পাশের ছোট ঘর থেকে তাস আনতে গেলাম ৷ তুমি তো জানো প্রতুল, অবসর যাপনের জন্যে একজোড়া তাস আমার স্টুডিয়োতে এনে রেখেছি ৷ কতদিন সন্ধ্যায় তুমি আসোনি, একা একা পেশেন্স খেলে কাটিয়েছি ৷
পাইপ মুখে বসে বসে প্রতুল এতক্ষণ নিঃশব্দে স্বপ্ন-কাহিনি শুনে যাচ্ছিল ৷ ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় মুখখানা তার অস্পষ্ট হয়ে গেছে ৷ সেই ধূম্রজালের আড়াল থেকে আওয়াজ ভেসে এল, হুঁ, তারপর?
নিশীথ আবার শুরু করলে:
তারপর এই টেবিলের মুখোমুখি বসলাম দুজনে ৷ শুরু হল ভাগ্যের জুয়াখেলা ৷ তাসগুলো বারবারা উল্টো করে আমার সামনে বিছিয়ে দিল ৷ তারপর নিজের একখানা টেনে নিয়ে আমাকে বললে, নাও ৷
টেনে নিলাম একখানা তাস—রুইতনের সাহেব ৷ বারবারা তার হাতের তাসখানা দেখাল—ইস্কাবনের নওলা ৷ বললে, তুমি ‘ডিল’ করো ৷
জিজ্ঞাসা করলাম, ক’দান খেলতে চাও?
বারবারা বললে, তিন দানই যথেষ্ট ৷
প্রথমবার আমি ‘ডিল’ করলাম ৷ একখানা করে তিনবার ৷ বারবারা তার তাসগুলি টেবিলের ওপর চিত করে মেলে ধরল ৷ হরতন আর চিড়েতনের টেক্কা, আর রুইতনের বিবি ৷
এবার আমার পালা ৷ উপুড় করা তিনখানা তাস তুলতে গিয়ে আমার আঙুলগুলো একবার কেঁপে উঠল ৷ এ তিনখানা তাসের উল্টো পিঠে আমার ভাগ্যের কী ফলাফল লেখা আছে, কে জানে!
এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলাম ৷
বারবারা বললে, তোমার তাস দেখাও ৷
আঙুলে যেন জোর করে শক্তি এনে আমার তাস তিনখানা উল্টে দিলাম ৷ ইস্কাবনের আট-নয়-দশ!
উল্লাসে চিৎকার করে উঠলাম, দান আমার!
বারবারার মুখ আবার বিবর্ণ হয়ে এল ৷ অস্বাভাবিক শান্ত গলায় সে শুধু বললে, দ্বিতীয় দানের তাস দাও ৷
বাহান্নখানা তাস ভেঁজে দ্বিতীয়বার তাস দিলাম ৷ বারবারা এবার তার তাস তিনখানা স্পর্শ করে বিড় বিড় করে কী যেন বললে ৷ তারপর ধীরে, অতি ধীরে একখানা করে তাস উল্টে ধরল ৷ তিনখানা বিবি—ইস্কাবন, রুইতন আর হরতন ৷ তারপর আমার দিকে তাকাল ৷
এক নিমেষে আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল ৷ বললাম, ভাগ্য এবার তোমার প্রতি কৃপা করেছে দেখছি ৷ বিবির ট্রায়ো তুলেছ ৷ কিন্তু আমিও যদি সাহেবের ট্রায়ো তুলি?
বটে! তোমার ভাগ্য আরও ভালো বলব ৷—বারবারার ওষ্ঠ প্রান্তে সুতীক্ষ্ণ একটু হাসি দেখা দিল ৷ সে কি তিক্ত ব্যঙ্গ?
আমার তাস তিনখানা তুলে সশব্দে টেবিলের ওপর মেলে ধরলাম ৷ না, সাহেবের ট্রায়ো নয় ৷ সাহেব মাত্র একখানা, বাকি দু’খানা পাঁচ আর চার ৷ এবারের দান আমার নয়—বারবারার ৷
সমস্ত তাসগুলো কুড়োতে কুড়োতে অত্যন্ত শান্ত গলায় বারবারা বললে, তোমার জন্যে আমি দুঃখিত, সেন ৷
মাথার ভেতরটা আমার দপ দপ করে উঠল ৷ উত্তপ্ত রূঢ় গলায় বললাম, চুপ করো! আমার জন্য দুঃখিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই তোমার ৷
বারবারার ওষ্ঠপ্রান্তে সেই সুতীক্ষ্ণ হাসি আবার ঝিলিক দিয়ে উঠল ৷ তাসগুলো ভাঁজতে ভাঁজতে আরও শান্ত গলায় সে শুধু বললে, এবার শেষ বাজির খেলা ৷
সহসা লক্ষ মৌমাছির একটানা গুঞ্জনের মতো কথাগুলো আমার মাথার মধ্যে ক্রমাগত বাজতে লাগল: ‘শেষ বাজির খেলা!’ ‘শেষ বাজির খেলা!’ শেষ বাজি কার? আমার না বারবারার? শরীরের সমস্ত রক্ত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠতে লাগল ৷
