আমি বললাম, আপনিই তাহলে বারবারা স্মিথ? নিজে এসে সিটিং না দিয়ে পোর্ট্রেট আঁকবার জন্যে ফোটোগ্রাফার পাঠিয়েছিলেন কেন জানতে পারি কি?
আমি এক মার্চেন্ট অফিসে স্টেনোগ্রাফারের কাজ করি ৷ আসবার সময় পাই না ৷ কিন্তু আমার বরাবর ইচ্ছে ছিল এখানে আসবার, চিত্রকরের সঙ্গে দেখা করবার ৷— বারবারার দুই চোখে আগ্রহ ফুটে উঠল ৷
বললাম, তার সময় কি এই? এই অন্ধকার ঝোড়ো শীতের রাত; আপনি একা শহরের বাইরে এতদূরে এলেন কী করে? কে-ই বা আপনাকে দরজা খুলে দিলে?
বারবারা বললে, অনেক খুঁজে আমায় আসতে হয়েছে, এসে দেখলাম দরজা খোলাই আছে ৷ ভেতরে ঢুকে দু-তিনবার ডাকলাম, কোনো সাড়া পেলাম না ৷ তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবিখানা দেখছিলাম— তখন আপনি এলেন ৷
বারবারা কি সত্য কথা বলছে? এতরাত্রে স্টুডিওর দরজা খোলা ছিল? তাই হবে ৷ টেবিলের ওপর ওই তো চাবি পড়ে আছে ৷ বন্ধ করতে আমি নিশ্চয় ভুলে গেছলাম ৷
বারবারা বলতে লাগল, কাল আমি সানফ্রান্সিসকো চলে যাব ৷ কাল হয়তো আসবার সময় হবে না, তাই এলাম আজকে ৷ রাত অবশ্য অনেক হয়েছে, তবু তো চিত্রকরের সঙ্গে দেখা করবার সুযোগ হারাইনি ৷ কোথায় চিত্রকর? একবার দেখা হবে না?— বারবারার সাগ্রহ কণ্ঠস্বর মধুর বাজনার মতন বেজে উঠল ৷ সে-কণ্ঠস্বরে ছিল উৎসুক আশা আর গভীর শ্রদ্ধা ৷
চিত্রকরের সঙ্গে আজ দেখা হবে না? বারবারা আবার জিজ্ঞাসা করল ৷
সংক্ষেপে বললাম, হবে ৷ আজ রাত্রেই দেখা হবে— আপনি চলে যাওযার আগেই ৷
বারবারার সবুজাভ চোখের তারায় প্রত্যাশার আনন্দ ৷ ঊর্ধ্বমুখী ফুলের মতো আমার দিকে মুখ তুলে সে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় তিনি?
বললাম, এই স্টুডিওতেই তিনি আছেন ৷
বারবারা অধীর স্বরে বলল, এই স্টুডিওতেই আছেন? আমার ভাগ্য ভালো দেখছি! চলুন— আমাকে এখুনি তাঁর কাছে নিয়ে চলুন ৷
বারবারা আমার দিকে এক পা এগিয়ে এল ৷
বাধা দিয়ে বললাম, দাঁড়ান!
আমার কণ্ঠস্বরে কী ছিল জানি না, বারবারা স্তব্ধ হয়ে থেমে গেল ৷
বললাম, তার আগে একটা কথা আমার বলবার আছে ৷ আর্টিস্ট নিশীথ সেনের সঙ্গে আপনি দেখা করতে এসেছেন বটে, কিন্তু দেখা না করে ফিরে যাওয়াই ভালো ৷ যাবার সময় আপনার ছবিখানা আজই নিয়ে যেতে পারেন ৷
বারবারা কয়েক মুহূর্ত আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে রইল ৷ তারপর বলতে লাগল, কেন একথা বলছেন? আর্টিস্ট নিশীথ সেনের সঙ্গে দেখা না করাটাই ভালো কেন? না-না-না, তা হতে পারে না, দেখা আমি করবই ৷ তাঁর সঙ্গে দেখা না করে আমার সানফ্রান্সিককো যাওয়া হতে পারে না!
কেন বলুন তো? আপনার ছবিখানা কি মনোমতো হয়নি? কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে?
না-না, মোটেই তা নয় ৷ এমন চমৎকার পোর্ট্রেট আমি জীবনে কখনও দেখিনি ৷ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, এ আমারই ছবি! আর্টিস্টকে আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই ৷
বললাম, আপনার সে-কৃতজ্ঞতা আমি পৌঁছে দেব আর্টিস্টের কাছে ৷
ধন্যবাদ ৷ কিন্তু আমি বড় আগ্রহ নিয়েই এসেছি ৷
বেশ তো, আপনি ছবি ভালোবাসেন, এই স্টুডিওতে আর্টিস্টের আঁকা আরও ছবি রয়েছে ৷ এগুলো দেখে যান, আপনার আগ্রহ মিটতে পারে ৷
অধীর স্বরে বারবারা বললে, শুধু সৃষ্টিই দেখে যাব? স্রষ্টাকে দেখে যাব না?
স্রষ্টাকে দেখতে পাওয়া যায় না ৷ যেমন দেখতে পাওয়া যায় না বিধাতাকে ৷ রাত অনেক হল, আপনি ফিরে যান মিস স্মিথ ৷
নিজের কণ্ঠস্বর আমার নিজের কানেই রূঢ় লাগল; বারবারার সবুজাভ চক্ষু ম্লান হয়ে এল ৷ ধীরে ধীরে শুভ্র হাত দুটি জোড় করে বুকের কাছে তুলে ধরল ৷ তার ডান হাতের মুঠির মধ্যে ছোট্ট একখানি নীল রুমাল— নীল পদ্মের একটি কুঁড়ির মতো ৷
বারবারা বলতে লাগল, আপনি কে, তা জানি না ৷ যে-ই হোন, আপনাকে মিনতি করছি, চিত্রকরের সঙ্গে একবার দেখা করতে দিন ৷ আমি শপথ করছি, আমি তাঁর বেশি সময় নষ্ট করব না ৷ আপনি জানেন না, আমি আর্টিস্ট সেনের ছবির কতখানি অনুরাগিনী ৷ তাঁর আঁকা ছবি আমার কতখানি ভালো লাগে— তা বলে আমি বোঝাতে পারব না ৷ কলকাতা, প্যারিস, বার্লিন, রোম, পিকিং— পৃথিবীর যেখানে যেখানে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে, সব জায়গায় আমি ঘুরে এসেছি ৷ আর্টিস্ট সেন আমার কাছে দেবতা ৷ কত রাত্রে আমি তাঁর স্বপ্ন দেখি!
বারবারার চোখ-মুখের ভাব আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম ৷ কেননা, তার মুখের সামনে ছিল ঝোলানো আলোটা ৷ কিন্তু আমার মুখ তার দৃষ্টির সামনে অন্ধকার অস্পষ্ট ৷ আমি দাঁড়িয়েছিলাম ঝোলানো আলোটা পেছনে রেখে ৷— আমার এই আত্মগোপন যে ইচ্ছাকৃত— তা তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ প্রতুল!
বারবারা তখনও মিনতির ভঙ্গিতে বলে চলেছে, দয়া করুন— আমাকে ফিরে যেতে বলবেন না— আর্টিস্ট সেনকে, আমার স্বপ্নের দেবতাকে একবার দেখেই আমি চলে যাব ৷ আমি শপথ করছি— ৷
উত্তেজনায় বারবারার গাল দুটি রক্তাভ হয়ে উঠেছে ৷ ঘন নিশ্বাসে তার নাসারন্ধ্র, তার পীবর বক্ষ ফুলে ফুলে উঠছে ৷ বারবারা, সুন্দরী— সুতনু বারবারা বলছে, ‘আমি আর্টিস্ট সেনের অনুরাগিণী ৷ আমি তাঁর স্বপ্ন দেখি?’ মনে হল, আমি খুব দামি নেশা করেছি ৷ আর সেই নেশা আমার মাথার মধ্যে রিমঝিম করছে ৷
তবুও কণ্ঠস্বর আরও রূঢ় করে বললাম, স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই স্মিথ ৷ তোমার স্বপ্নের দেবতার সঙ্গে আর্টিস্ট সেনের যদি কিছুমাত্র মিল না থাকে? যদি—যদি সে কুৎসিত হয়? যদি তার মুখের চেহারা হয় পশুর মতো, জানোয়ারের মতো কুৎসিত? তাহলে কি তুমি সহ্য করতে পারবে বারবারা? তার চেয়ে কাজ নেই দেখা করে ৷ তোমার সুন্দর স্বপ্ন, সুন্দর ধারণা নিয়ে ফিরে যাও ৷
