হাতের যন্ত্র ফেলে দিয়ে নিশীথ এতক্ষণে ধীরে ধীরে প্রতুলের দিকে মুখ ফেরাল ৷ এতক্ষণ যে ঝোলানো আলোটার নীচে নিশীথ কাজ করছিল, সেটা এখন তার পেছনে ৷ তার পরিবর্তে নিশীথের মুখে পড়েছে— প্রতুলের সামনে টেবিলের ওপর যে রিডিং-ল্যাম্প, তারই মৃদু আলো ৷ সে-আলোটা নিচু দিক থেকে মুখে পড়ায়, তার গরিলাকৃতি মুখখানা যেন সত্যিই পশুর মতো বীভৎস হয়ে উঠেছে ৷
প্রতুল স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ৷ বাইরে শীতের ঝড়ো হাওয়ার আর্তনাদ একটা খোলা জানলা দিয়ে ঘরে আসছে ৷ দুলছে ঘরের ঝোলানো আলোটা, আর আলো-আঁধারির বিচিত্র ঢেউ খেলে যাচ্ছে দেওয়ালে-দেওয়ালে ৷
আজও সেই স্বপ্নের কথা মনে হলে আমি যেন কীরকম হয়ে যাই প্রতুল ৷ কেমন একটা অস্থির আতঙ্ক আমায় যেন পাগল করে দেয় ৷ মনে হয়, সারাজীবন বুঝি এ-যন্ত্রণা ভোগ করে কাটাতে হবে ৷
বলতে বলতে নিশীথ এগিয়ে এসে প্রতুলের সামনে বসল ৷ ধীরে ধীরে তার মুখের পাশব-ভাব বদলে গিয়ে প্রশান্ত হয়ে এল ৷ চোখ-দুটো আস্তে আস্তে এল বুজে ৷ হাত দুটো জোড় হয়ে বুকের কাছে উঠে এল ৷ নিশীথ বলতে লাগল, কিন্তু অসীম করুণা ভগবানের, আমার এ ভাব কয়েক মুহূর্তের বেশি থাকে না ৷ যখন মনে পড়ে যায়, স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই, তখনই নিশ্চিন্ত প্রশান্তিতে মন আবার সুস্থ হয়ে ওঠে ৷
প্রতুলের পাইপটা নিভে গিয়েছিল ৷ কিন্তু তার স্থির দৃষ্টি তখনও নিশীথের মুখের ওপর ৷ ছাই ঝাড়বার জন্যে পাইপটা ঠুকতেই নিশীথ যেন ধ্যান থেকে জেগে উঠল ৷
মৃদু গম্ভীর গলায় ধীরে ধীরে সে বলতে শুরু করল: ঠিক এক বছর আগেকার কথা ৷ তারিখটা ছিল আজকেরই মতন ১৩ ডিসেম্বর আর রাতটাও ছিল ঠিক এমনি ঝড়ো, কনকনে ৷ পরের দিনই একখানা পোর্ট্রেট সম্পূর্ণ তৈরি করবার কথা ছিল ৷ কেননা, সেখানা জাহাজে করে বিদেশে যাবে ৷ তাই স্টুডিওতে সারাদিন কাজ করে ছবিখানা যখন শেষ করলাম, তখন সন্ধে উৎরে গেছে ৷ সারাদিন একনাগারে চোদ্দো-পনেরো ঘণ্টা কাজ করে ক্লান্তিতে শরীর যেন ভেঙে পড়েছিল ৷ সেদিন তুমিও আসোনি প্রতুল ৷ খানিকক্ষণ গল্প করে কাটাবারও সময় ছিল না তখন ৷ ভাবলাম, আজ সকাল-সকাল বিশ্রাম নেব ৷ ক্লান্তিতে বাড়ি ফেরারও উৎসাহ ছিল না— যদিও বাড়ি আমার স্টুডিও থেকে আধ মাইল দূরে ৷ নেপালি চাকরটাকে এক কাপ কফি আর দু’টুকরো রুটি দিতে বলে রাত্তিরের মতো তাকে ছুটি দিয়ে দিলাম ৷ স্টুডিওর চাবি আমাকে দিয়ে সে তার ঘরে চলে গেল ৷ তুমি জানো, এ হলটার পশ্চিম দিকে যে ছোট ঘরখানা, সেখানে একখানা লোহার খাটে আমার বিছানা সবসময় পাতা থাকে— কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু বিশ্রাম নেবার জন্যে ৷ কফি আর রুটি খেয়ে কোনোরকমে বিছানায় গিয়ে শুয়ে রইলাম ৷ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, ঘুম ভেঙে গেল দেবদারুর শাখায় শাখায় ঝড়ো হাওয়া আর কাতরানির শব্দে ৷ বাইরে শীতের রাত ঘন কুয়াশায় ঠিক এমনি থমথম করছে ৷
ঘুম ভেঙে যেতে ইচ্ছে হল, পোর্ট্রেটটাকে একবার ভালো করে দেখি, যদি আর এক-আধটুকু তুলির টান দরকার হয় ৷ আমার শোবার ঘরের মোটা পর্দা ঠেলে এই হলের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম ৷ হলের ঝোলানো বাতিটা তখনও জ্বলছিল— বোধ হয় নিভিয়ে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম ৷ সেই আলোয় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম— আলোর সামনে হলের মাঝখানে পোর্ট্রেটটা ইজেলের ওপর দাঁড় করানো ৷ আর তারই সামনে আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে ৷ ঘন নীল রঙের সিল্কের পোশাক তার পরনে ৷ শুধু অনাবৃত কাঁধ দুটি শঙ্খের মতো সাদা ৷ মসৃণ কালো চুলগুলি কাঁধ পেরিয়ে আর নীচে নামেনি ৷ বোঝা গেল, এদেশের মেয়ে নয়— বিদেশিনী ৷ পাশের সোফায় মেয়েদের একটা টুপি আর ফার-কোট পড়ে আছে ৷ জীবনে এতখানি আশ্চর্য আর আমি কখনও হইনি ৷ রাত তখন কত কে জানে! এত রাতে এই নির্জন স্টুডিওর মধ্যে অচেনা বিদেশিনী মেয়েটি এল কেমন করে? কেনই বা এল? একি স্বপ্ন, না সত্যি, না ভৌতিক ব্যাপার! আপনা থেকেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল— কে?
মেয়েটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে ছবি দেখছিল ৷ আমার গলার আওয়াজে চমকিয়ে ফিরে তাকাল ৷ আশ্চর্য— ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গেলাম ৷ মনে হল, পোর্ট্রেট থেকে জ্যান্ত হয়ে নেমে মেয়েটি যেন হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ৷ আজ সাতদিন এই চেহারাই তো আমি রং আর তুলি দিয়ে এঁকেছি ৷ সেই সবুজাভ চোখের তারা, সেই ঈষৎ স্ফুরিত রক্তবর্ণ ওষ্ঠ, সেই পানের মতো মুখের গঠন— পোশাকটার সঙ্গে ছবিটাও হুবহু মিলে যাচ্ছে, পা পর্যন্ত ঝোলানো কাঁধকাটা গাঢ় নীল রঙের সিল্কের পোশাক— ছবি কি কখনও জীবন্ত হয়? না আমার দৃষ্টিবিভ্রম হয়েছে? মনে করে দেখলাম, না, অন্যদিনের মতো আমি তো আজ হুইস্কি খাইনি! তবে— তবে এ কী দেখছি?
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মেয়েটি কুণ্ঠিত স্বরে বললে, ক্ষমা করবেন ৷ আমি না বলে ছবিখানা দেখছিলুম ৷ যদিও আমার এই ছবিখানা আঁকবার ফরমাস আমিই দিয়েছি ৷ তবু— চিত্রকরের দেখা পেলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিতাম ৷
তার প্রয়োজন হবে না ৷ ছবির মালিকের ছবি দেখবার নিশ্চয়ই অধিকার আছে ৷ — আমি জানালাম ৷
মেয়েটির ঈষৎ স্ফুরিত ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে কয়েকটি কুন্দদন্ত দেখা গেল ৷ বললে, অনেক ধন্যবাদ ৷
