গোলা – জয়ন্ত দে
নোটন মার্ডার হল ৷
নোটনকে মার্ডার করল ছক্কারা ৷ ছক্কারা নোটনকে কীভাবে মেরেছিল এখন আমরা সবাই তা জানি ৷ আমরা মানে আলোদার ছেলেরা ৷ বা পাবলিকের ভাষায় বললে আলোর গ্ৰুপের ছেলেরা ৷
কিন্তু নোটন যখন বেঁচে, আমরা তখনই আঁচ করতে পেরেছিলাম সে মরতে চলেছে ৷ এই মৃত্যুর আঁচ হয়তো আরও অনেকে করেছিল ৷ তারা আলোদার লোকজন নয় ৷ তারা নোটনকে চেনা বান্ধবনগরের পাঁচ পাবলিক ৷ তারা সাহসে ভর দিয়ে মুখে বলত না ৷ কিন্তু বলত, নির্ঘাত বলত, গিলতে গিলতে এবার লিভার ফেটে মরবে ছেলেটা ৷
এই লিভার নিয়ে নোটনের নিজেরও চিন্তা ছিল ৷ তাই সকালের ভাতে পেঁপে সেদ্ধ তার চাই-ই ৷ সকালের ভাত মানে ন’টা নাগাদ ঘুম ভাঙার পর ব্রেকফাস্ট কাম লাঞ্চ কাম সারাদিনের বাড়ির খাবার এটাই ৷ নোটনের পেঁপে সেদ্ধ খাওয়ার মধ্যে লিভারের দর্শন ছিল ৷ সেদ্ধ পেঁপে লিভার চাঙ্গা রাখে ৷ তেমনই ওর অদ্ভুত যুক্তি ছিল এক বেলা ভাতের ৷ নোটন বলত, চার বেলা বাড়ির ভাত খেয়ে লোহা-লক্কড়ের কারবারি হওয়া যায় না ৷
আমরা আলোদার উদাহরণ দিতাম ৷ বলতাম, এক নম্বর কারবারি তো আলোদা, নোটন হাসত ৷ বলত, আলোদা খোদ কোম্পানি ৷ আর আমরা হলাম লোহা লক্কড়ের খুচরো বিক্রেতা ৷
তো এই এলাকার এক নম্বর কোম্পানি আলোদা বলত, লোহা লক্কড় কোমরে নিয়ে ঘুরলেই কেউ কারবারি হয় না৷ তোকে সবাই জানে— তুই মাতাল ৷ নেতা সেজেছিস মদো মাতালের ৷
তবু আমরা সেই মদো মাতালরাও মিলে মিশে আলোদাকে ঘিরে প্রত্যহ নরক গুলজার করি ৷ আর এখানেই আমরা মাঝে মাঝে এঁকে ফেলি নোটনের মৃত্যুদৃশ্য ৷ আমাদের সামনের চেয়ারে নোটন ৷ সে তখন দাঁতে নখ খোঁটে ৷ মরণদৃশ্যটা আমরা এভাবে আঁকি, বান্ধবনগর পোস্ট অফিসের উলটো দিকের সেই গলি ৷ গলিটা এঁকে বেঁকে নোটনের বাড়ির দিকে গেছে ৷ নোটন মধ্যরাতে সেই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরে ৷ রাস্তার ধারে পর পর ক’টা ডোবা আর পুকুর ৷ আমরা বলেছিলাম, সেই পুকুরের কথা ৷ এঁকে ছিলাম, সেই পুকুর ভরা জলের ছবি ৷
এটা ছিল স্রেফ সাদা কালো একটা দৃশ্য ৷ এখানে যে যেমন খুশি রং দিত ৷ রং ছেটাত ৷ কেউ বলত, জলে একবার পড়লে ও হাঁটু জলে হাবুডুবু খেয়েই শেষ ৷ কেউ বলত, পাঁকে মুন্ডু গুঁজে যাবে ৷ আর নেশার ভারে বাটখারা হয়ে ওই মুন্ডু টপ করে গেঁথে যাবে ৷
নেশা করে করে নোটনের এখন হাত পা কাঁপে ৷ ও যদি পুকুরে পড়ে আর উঠতে পারবে? আমাদের কথা শুনে নোটন হাসত ৷ বলত, এখানকার সব পুকুরের দম আমি জানি— কেউ আমাকে হজম করতে পারবে না!
এবার আমাদের আঁকা নোটনের মরণ দৃশ্যে রং দিল আলোদা ৷
বলল, ছক্কার কথা ৷
আলোদার কাছের ছেলে নোটন মানতে পারল না এ কথা ৷ ও কাঁপা হাত উঁচিয়ে বলল, ছক্কা ভালো হতে চায় আলোদা ৷
আলোদা বলল, ছক্কা ক্রিমিনাল ৷
আজ আমার নাইট ডিউটি ৷ অগত্যা সকালে আলোদার অফিসে ৷ খবরের কাগজ থেকে মুখ নামিয়ে আমি বললাম, এলাকার লোকে কিন্তু আমাদেরও ক্রিমিনাল বলে ৷
আলোদা বলল, আমাদের বলছিস কেন? বল, তোমাদের!
আমি বললাম, অবশ্য ক্রিমিনাল বলার আগে পলিটিক্যাল কথাটা জুড়ে দেয় ৷
আলোদা বলল, ওই জন্যেই তো পার্টিটা ছাড়লাম ৷ সকলের মনে রাখা উচিত বয়েস বাড়ছে ৷ এখনও আমাদের চলতি আছে ৷ যে যেভাবে পারিস ব্যবসা ধান্দা করে গুছিয়ে নে ৷
আমি চাকরি করি ৷ এমন চার-ছ’জন ৷ আর সবাই ধান্দা খুঁজছে ৷ আর ধান্দার তো এখন একটাই জাতীয় সংগীত— কনস্ট্রাকশন ৷ যে সংগীতের মুখড়া দালালি, অস্থায়ী ইট বালি সাপ্লাই, অন্তরা প্রমোটিং ৷
আর এইসব কাজকারবার লাগলে ভালো, না লাগলে ছিঁচকে ! তো আমাদের সবার সব রকম ধান্দা ছিল ৷ হাতে কলমে না থাকলেও মনে মনে তো ছিলই ৷ কিন্তু নোটনের একটাই ধান্দা ছিল, সে মদ খাবে ৷ দিনে খাবে, রাতে খাবে, সারা দিন খাবে ৷ আমরা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম সারা দিন খাস না ৷ রাতে খা আর দশটা বাজার আগে বাড়ি ঢুকে যা ৷ নোটন আমাদের কথা শুনত এই পর্যন্তই ৷ পাত্তা দিত না ৷ বলত, এখন আমাদের ভালো টাইম ৷ কোনো ঝামেলা নেই ৷ যখন সাহেব বাগানের চিল্কা, কালী বাড়ির যিশু-নয়নরা ধরলেই দানা ভরে দিত তখনও আমি এমনই থেকেছি ৷
নোটনের কথায় আলোদা চোখ বন্ধ করল ৷ তারপর আমাদের আঁকা নোটনের সেই মরণ-দৃশ্যের ওপর ভয়ঙ্কর এক পোঁচ কালি বুলিয়ে দিত ৷ বলত, ছক্কারা তোর জন্যে একটাও দানা খরচ করবে না ৷ সেরেফ একটা ধাক্কা মেরে পুকুরে ফেলে দেবে ৷ নোটন তোর নম্বর লেগে গেছে!
নোটন দু’হাতের চেটোয় মুখ মুছে আমাদের কথাও মুছে ফেলত ৷ তবে এসব কথায় সব সময়ই ও কিছু একটা বলত বিড় বিড় করে ৷ যা আমরা শুনতে পেতাম না ৷
এদিকটা আমাদেরই চলতি ৷ আগে আমরাই পার্টি ছিলাম ৷ পার্টির জন্যে ইলেকশন করতাম ৷ আর পার্টি আমাদের পুলিশটা দেখে দিত ৷ আমাদের যা ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটি সব ওই ইলেকশনের আগে পিছে ৷ আর ইলেকশনের দিন আমরা খুল্লাম খুল্লা ওয়ান ডে খেলে দিতাম ৷ এতেই আমাদের বারো মাস চলে যেত ৷ পার্টি প্রশাসন আমাদের ৷ ফলে গড়িয়ে খেলেও ফুরোত না ৷ আর বাদবাকি যেটুকু হাত চালাতে হত তা কিছুটা সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায়, কিছু অন্য কোনও দাদা গজালে ৷ তারপর এত বড় টিম, এত বড় এলাকা— ঝামেলা তো আছেই ৷
