আমার কথাবার্তার ধরনে প্রকাশ মিত্তির একটু ঝিমিয়ে পড়ল ৷ এখান থেকে অনেক কিছু খোঁজখবর পাবে বলে ছুটে এসেছিল, কিন্তু যে-তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেল ৷ তবু অমায়িক হেসে বলল, মিথ্যেই আপনি ভয় পেয়ে নার্ভাস বোধ করছেন ৷ আপনার আর ফ্যাসাদের কী আছে? শুধু একটু কষ্ট করে আমার সঙ্গে একবার আপনাকে থানায় যেতে হবে ৷ এই সুটকেসটা সেখানে আমরা জমা করে দেব ৷ এর মধ্যে কী-কী আছে তার একটা লিস্ট করা দরকার ৷ তারপর আপনার ছুটি ৷
আমি ভয়ের সুরে বললাম, কী জানি মশাই, কোত্থেকে কী হয়ে যায়! কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা ৷ আপনারাও তো বাঘের চেয়ে কিছু কম যান না ৷
আমার কথার ধরনে প্রকাশ দারোগা হো হো করে হেসে উঠল ৷ তারপর তার বাইকে চেপেই থানায় হাজির হলাম৷ তিনকড়িকে দিয়ে এককুড়ি ডিমও তুলে দিলাম তার ক্যারিয়ারে ৷ দারোগাসাহেব খুশি হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে বলল, আপনাদের মতো ইয়াং ছেলেদেরই তো এখন দরকার আমাদের দেশে ৷ কী গভীর অধ্যবসায়েই না তিল-তিল করে গড়ে তুলেছেন এই পোলট্রিটাকে! অথচ আজকালকার সব ছেলে-ছোকরাদের দেখুন…রকে বসে গুলতানি করছে, আর মাঝে-মধ্যে এর-ওর কাছ থেকে চাকরির জন্যে দরখাস্ত লিখিয়ে আনছে ৷ নিজের থেকে একটা কিছু করার আগ্রহ একবারেই নেই ৷
আমি তার কথায় বাধা দিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে বললাম, এ আর কী দেখছেন! কোনোরকমে এটাকে দাঁড় করিয়েছি মাত্র ৷
থানা থেকে কাজ শেষ করে যখন বাইরে বেরুলাম তখন আমার প্রাণ মুক্তির আনন্দে ভরপুর ৷ বিপদের কালো পাথরটা এতদিন ধরে বুকের ওপর চেপে বসেছিল ৷ আজ সেটা নেমে যেতে মনটা হালকা হল ৷ জলভারহীন মেঘের মতো স্ফূর্তির হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে পোলট্রিতে ফিরে এলাম ৷ এখন ওরা অনন্তকাল ধরে লীনার খোঁজ করুক ৷
খুন করাটা যে এত সহজ এ-কথা আগে কখনও ভেবে দেখিনি ৷ সত্যি বলতে কী, খুন করার পর লোকগুলো কী করে ধরা পড়ে সেটাই এখন আমার কাছে খুব আশ্চর্যের মনে হল ৷ আর এইসব মোটা মাথাওয়ালা প্রকাশ মিত্তিররাই তো তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পোরে!
এর পরও প্রকাশ দারোগা আমার ডেরায় বারদুয়েক এসেছিল ৷ ঘুরে-ঘুরে সমস্ত পোলট্রি দেখল ৷ আমার সব কাজ-কারবারও লক্ষ করল খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে ৷ অবশেষে একদিন হাল ছেড়ে দিয়ে বিরস বদনে বিদায় নিল ৷
.
এই ঘটনার মাসদুয়েক বাদে আমি তিনকড়িকে খুন করলাম ৷ তিনকড়ির সেবায় মুরগিগুলো বেশ ভালোই ছিল ৷ তিনকড়িকে সেবা করে তারা আরও পুলকিত হল ৷ ঘাড় ফুলিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও কার্পণ্য করল না ৷ পরের দিন সকালে আমি নিজে থানায় গিয়ে তিনকড়ির নামে একটা ডায়েরি করে এলাম ৷ বললাম, গতকাল রাতে তিনকড়ি আমার আলমারি থেকে হাজার-দুয়েক টাকা নিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেছে ৷ ডায়েরি লিখতে-লিখতে গম্ভীর গলায় প্রকাশ মিত্তির আমায় উপদেশ দিল : এখনকার দিনে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই, মশাই! কার মনে কোন মতলব খেলা করছে আগে থেকে তার কোনো আঁচ পাওয়া যায় না ৷ এবার তো শুধু দু-হাজার টাকার ওপর দিয়ে ফাঁড়া কেটে গেছে ৷ ও যে আপনাকে খুন করে যথাসর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে যায়নি এর জন্যে মঙ্গলময় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিন ৷
আমি বিনীত হাসি হেসে থানা থেকে বেরিয়ে পড়লাম ৷ প্রকাশ দারোগাকে দেখে আজ আমার খুব মজা লাগছিল ৷
গত দেড় বছরে আরও তিনটে খুন করেছি আমি ৷ তবে শেষের খুনটা আমার মনটাকে একেবারে বিষিয়ে দিয়েছে৷ অনেক খুঁজে-পেতে বিশুকে জোগাড় করেছিলাম ৷ শ্যামবাজারের এক রেস্তোরাঁয় বয়-এর কাজ করত ৷ বছর চোদ্দো বয়েস৷ খুব চটপটে, শরীর-স্বাস্থ্যও খুব ভালো ৷ মুখে সবসময় একটা হাসি-হাসি ভাব ৷ বেশি মাইনে কবুল করায় আমার পোলট্রিতে কাজ করতে রাজি হল ৷ দেশে তার বুড়ো বাপ-মা আছে ৷ মাসে-মাসে মানি-অর্ডার করে টাকা পাঠায় তাদের নামে ৷ মাসদুয়েক কোনো খোঁজখবর না পেয়ে একদিন বুড়ো-বুড়ি দুজনেই সশরীরে হাজির হল আমার ফার্মে ৷ কিন্তু আমি তো কোন ছার, আমার মুরগিগুলোও হয়তো এতদিনে বিশুর কথা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে ৷ তাদের বললাম, অনেকদিন হল বিশু আমার এখান থেকে কাজ ছেড়ে চলে গেছে ৷ তার হিসেব-পত্তরও সব কড়ায়-গন্ডায় মিটিয়ে দিয়েছি সঙ্গে-সঙ্গে ৷
আমার কথা শুনে বুড়ি মা-টা তো ভেউভেউ করে কান্না জুড়ে দিল ৷— তবে আমাদের বিশু কোথায় গেল…বাবু? সে কি বুড়ো-বুড়িকে কোনও খবর না দিয়েই পালিয়ে গেল?
তার এই নাকি কান্না আমার ভীষণ অসহ্য লাগল ৷ কড়া ধমক দিয়ে দুজনকেই গেটের বাইরে বের করে দিলাম ৷ কাঁদতে-কাঁদতে ফিরে গেল তারা ৷ কিন্তু এরপর থেকেই আমার মনটা অস্বস্তিতে ভরে গেছে ৷ ভাবছি, এবার থেকে খুন করার অভ্যেসটা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করব ৷ বড্ড বেশি ঝামেলা পোহাতে হয় ৷ আগে থেকে হিসেব করে আটঘাট বেঁধে কাজে নামা, কোথাও একচুল ভুলচুক হওয়ার উপায় নেই— তাহলেই একবারে আকাশ ভেঙে পড়বে মাথার ওপর ৷ আর সত্যি বলতে কী, এতে আমার লাভও তেমন কিছু নেই ৷ মাঝে-মধ্যে মুরগিদের পেছনে মাংসের খরচাটা বেঁচে যায় এইমাত্র! তার জন্যে মানুষ খুন করা খাটুনিতে পোষায় না ৷ তবে প্রকাশ মিত্তিরকে দেখলেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায় ৷ ওকে বাগে পেলে আমি ছাড়ব না ৷ ওই গোবরগণেশ লোকটা মাসে-মাসে গভর্নমেন্টের এতগুলো করে টাকা গিলছে এটাই বা সহ্য করা যায় কেমন করে! একদিন ফাঁক বুঝে দারোগাসাহেবকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এখানে নিয়ে আসতে হবে ৷ মুরগির বিরিয়ানি আর ঝাল-ঝাল কষা মাংসের লোভ দেখালে নিশ্চয়ই না এসে থাকতে পারবে না ৷ তবে সেটা লোকচক্ষুর অগোচরে হওয়া প্রয়োজন ৷ কেউ যেন তার আগমন-বার্তা ঘুণাক্ষরেও টের না পায় ৷ পুলিশের লোক বলে কথা! কোথা থেকে কী হয়ে যায় বলা যায় না ৷ তার জন্যে স্পেশাল কেয়ার নিতে হবে ৷ তা ছাড়া, দারোগাসাহেব যদি আবার নিজের বাইকে চেপে আসে তবে তো আর-এক ফ্যাসাদ ৷ বাইকটার একটা সদগতির ব্যবস্থা আগে থেকে ভেবে রাখতে হবে ৷ কেননা, সেটা তো আর জোর করে মুরগিদের গিলিয়ে দেওয়া যাবে না ৷
