আরও কিছুক্ষণ বাদে লীনাকে আমি ঘরে এনে বসালাম ৷ ওকে দেখে আমার মন আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল, না বেদনায় নীল হয়ে গেল ঠিক বুঝতে পারলাম না ৷ আমার সমস্ত অনুভূতি একবারে অসাড় হয়ে গিয়েছিল ৷ লীনার সঙ্গে কোনো কথাই বলতে পারলাম না ৷
আমার পেছন-পেছন লীনাও ঘরে এসে ঢুকল ৷ প্রথমে একটু ইতস্তত করল ৷ তারপর আমার অনুমতি নিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল ৷ যদিও তার কোনো প্রয়োজন ছিল না ৷ কেননা, এই অসময়ে কেউ কোনোদিন আমার কাছে আসে না ৷
প্রথম কথা কে বলবে লীনা বোধহয় তাই ভাবছিল ৷ দু-একবার ঢোক গিলল ৷ মুখ ফুটে কী যেন বলতে গেল ৷ তারপরই মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ৷
বিস্ময়ের প্রথম চমকটা কেটে যাওয়ার পর আমি ওকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম ৷ এই ক’বছরে বেশ খানিকটা ভারী হয়ে পড়েছে লীনা ৷ দু-চোখের তারায়-তারায় ঝকমকে হাসির ছটাও কেমন নিষ্প্রভ হয়ে গেছে ৷ মুখটা আরও বেশি স্থুল ৷ এরমধ্যে পুরোপুরিই বদলে গেছে লীনা! ওকে দেখতে এখন আমার ভীষণ বিশ্রী লাগল ৷ ওর এই কান্নাটাও যেন রং-মাখা অভিনেত্রীর ছলাকলা ৷ চোখের জলে মুখের প্রসাধন ধুয়ে গিয়ে ওকে আমার রীতিমতো অসহ্য লাগছিল ৷
আমার তখন সময়ের কোনও হুঁশ ছিল না ৷ কতক্ষণ ও ফুলে-ফুলে কাঁদল তা-ও জানি না ৷ অবশেষে একসময় বর্ষণ-ক্লান্ত লীনা একটু-একটু করে থেমে-থেমে ওর নিজের কথা বলল ৷
ওদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম ক’টা বছর নিরবচ্ছিন্ন সুখের মধ্যে দিয়েই কেটেছিল ৷ আদরে সোহাগে ওর স্বামী ওকে ভরিয়ে রেখেছিল ৷ কিন্তু চিরটাকাল কবে কার একভাবে কেটেছে! ওদের স্বপ্ন-রঙিন প্রেমের আকাশেও অবসাদের কালো মেঘ জমে উঠল ৷ ওর তরুণ স্বামী ডাক্তার অরুণাংশু নবাগতা এক নার্সের আকর্ষণে বৃন্তচ্যুত হয়ে পড়ল ৷ প্রথম-প্রথম ব্যাপারটা সে গোপন রাখার চেষ্টা করত ৷ লীনাকে কিছু বুঝতে দিত না ৷ কিন্তু ক্রমশই তার সে-ভাব কেটে গেল ৷ অরুণাংশু এখন প্রকাশ্যেই সেই নার্সকে নিয়ে ঘোরাফেরা করে ৷ নাইট শো- তে চৌরঙ্গি পাড়ায় সিনেমা দেখতে যায় দুজনে ৷ অনেক রাতে আকণ্ঠ মদ গিলে টলতে-টলতে বাড়ি ফেরে ৷ লীনা মরে গেলেও কিছুতেই অমন একটা লম্পট লোকের ঘর করতে পারবে না ৷ ইতিমধ্যে এক উকিলকে দিয়ে কোর্টে ডিভোর্সের আবেদন জানাবার ব্যবস্থা করেছে ও ৷ তারপর অনেক খুঁজে আমার বর্তমান আস্তানার সন্ধান পেয়েছে ৷ ও এখন নতুন করে আবার আমায় ফিরে পেতে চায় ৷
একটু-একটু করে থেমে-থেমে লীনা ওর নিজের কথা বলছিল ৷ ওর নিজস্ব যা কিছু অলঙ্কার সব এই সুটকেসের মধ্যে ভরে নিয়ে এসেছে ৷ এখন এটা আমার কাছে রেখে যাবে ৷ হপ্তাখানেক বাদে ও যখন অরুণাংশুকে সবকিছু জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে আসবে, তখন যদি এগুলো নিয়ে কোনো গন্ডগোল বাধে, সেইজন্যেই আগে থেকে এই সাবধানতা ৷
লীনাকে দেখে, লীনার কথা শুনে, আমার ভীষণ অস্বস্তি হতে লাগল ৷ ভাবলাম, এ কী উটকো ঝঞ্ঝাট হঠাৎ করে আমার ঘাড়ে এসে চাপল! আমার নির্জন শান্তির প্রাঙ্গণে এই স্থুল আপদটা তবে কি চিরকাল অনড় হয়ে বসে থাকবে! কিন্তু লীনাকে আমি ফেরাই কোন মুখে? বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে ও আজ আমার কাছে এসেছে ৷ বিপদে পড়ে ছুটে এসেছে লীনা৷ কোন মুখে আমি ওকে ফিরে যেতে বলব!
ভাবতে-ভাবতে আমি খুব বিব্রত হয়ে পড়লাম ৷ প্রথম যৌবনে ভালোবাসার যে-পাখিটা বুকের মধ্যে মরে গেছে, হাজার বসন্তের ডাকেও সে আর কখনও সাড়া দেবে না ৷ একটা জটিল প্রশ্নের জিজ্ঞাসা-চিহ্নের মতো লীনা আজ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ৷ আমি এর সমাধান করব কোন পথে?
লীনা আমার মনের অবস্থা ঠিকমতো অনুভব করতে পারেনি ৷ সেদিকে কোনো নজর-ই ছিল না ওর ৷ ছটফট করতে-করতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি ৷ ভাবনা-চিন্তার গ্রন্থিগুলো সব যেন জট পাকিয়ে গেল মাথার মধ্যে ৷ অতিরিক্ত রক্তের চাপে ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল কান দুটো ৷ আর লীনা তখনও টেবিলে মুখ গুঁজে আমার উত্তরের অপেক্ষায় বসেছিল ৷
আমি যখন ঘুরতে-ঘুরতে ওর চেয়ারের পেছনে এসে-দাঁড়ালাম, তখনও লীনা আমার দিকে চোখ তুলে চায়নি ৷ মাঝে-মাঝে শুধু বোবা কান্নার দমকে থরথর করে কেঁপে উঠছিল ওর সারা শরীরটা ৷ কিন্তু আমি আর সে-দৃশ্য বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলাম না ৷ সবল পেশল দুটো হাত দিয়ে প্রাণপণ শক্তিতে ওর গলাটা টিপে ধরলাম ৷
না…না, আমি ওকে ফিরে যেতে বলব কেমন করে?
লীনা প্রথমটা ধড়ফড় করে উঠল ৷ ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে বোধহয় বুঝতে পারেনি ৷ তারপরই আমার হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল জোর করে ৷ কিন্তু ওর সে-প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল ৷ দাঁতে দাঁত চেপে দেহের সমস্ত শক্তি একত্র করে আমি ওর গলাটা টিপে ধরেছিলাম ৷ ধীরে-ধীরে লীনার মাথাটা নেতিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর ৷ আর আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে ক্লান্ত কুকুরের মতো হাঁপাতে লাগলাম দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ৷ আমার সারা গা বেয়ে ঘাম ঝরছিল দরদরিয়ে ৷
লীনাকে খুন করার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার কোনো বোধশক্তি ছিল না ৷ একটা চেয়ারে গা এলিয়ে নেশাচ্ছন্নের মতো বসে রইলাম চুপচাপ ৷ তারপর ক্রমে-ক্রমে সংবিৎ ফিরে পেলাম ৷
আমি যে কী করলাম আর কেনই-বা করলাম ভেবে ঠিক করতে পারলাম না ৷ যাবতীয় ভাবনা-চিন্তা একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে গেল মাথার মধ্যে ৷ তুহিন-শীতল ভয়ের একটা স্রোত ছড়িয়ে পড়ল দেহের শিরায়-শিরায় ৷ লীনার মৃতদেহটা সাক্ষাৎ যমদূতের মতো ঘাড় মটকে পড়ে আছে চোখের সামনে ৷ ওকে যতই দেখতে লাগলাম, ততই ভয়ে আড়ষ্ট হতে শুরু করল আমার সর্বাঙ্গ ৷ একবার ভাবলাম, সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যাই ৷ কিন্তু কোথায় যাব? কোথায় গেলে এই বীভৎসতার হাত থেকে নিস্তার পাব? এই দুনিয়াটা যে বড়ই ছোট! তা ছাড়া, আমার মনে হল, আমি যেখানেই যাই না কেন, লীনা নিশ্চয়ই তাড়া করে ফিরবে আমার পেছন পেছন ৷ কোনো দিনই ও আমাকে মুক্তি দেবে না ৷
