সেবারে গরমের ছুটিতে লীনারা দার্জিলিং বেড়াতে গেল ৷ লীনার যদিও যাওয়ার ইচ্ছে আদৌ ছিল না, কিন্তু বাড়ির সকলেই যখন যাচ্ছে তখন কোন ছুতোয় বা সে কলকাতায় পড়ে থাকবে! অগত্যা মা-বাবার সঙ্গে তাকেও যেতে হল ৷ যাওয়ার আগের দিন লীনা নিজে থেকেই আমাকে আউটরাম ঘাটে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ৷ সেদিন থেকে কলেজে গরমের ছুটি পড়বে ৷ বিকেলের ক্লাস শেষ করে লীনা আমাকে ডেকে নিয়ে গেল ৷ গঙ্গার ধারে একটা নির্জন বেঞ্চে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম আমরা ৷ দুজনের বুকের ভেতর এত বেশি কথা এসে ভিড় করছিল যে, সেগুলোকে ধীরে-সুস্থে প্রকাশ করার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না কেউ ৷ শুধু এক অব্যক্ত বেদনায় ছটফট করে গুমরে-গুমরে কেঁদে মরছিল মনটা ৷ একটু-একটু করে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে এল তাকিয়ে দেখিনি ৷ আমাদের স্বপ্নের দিনগুলোর ওপরও বুঝি নিয়তি সন্ধ্যার কালো ছায়া টেনে দিল ৷
মাস-দেড়েক বাদে যখন লীনা ফিরে এল, তখন আর তাকে যেন চেনাই যায় না ৷ আপেলের মতো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে ওর নিটোল গালদুটো ৷ সারা গায়ে টসটস করে ফেটে পড়ছে গোলাপি আভা ৷ শুধু চেহারাতেই নয়, ইতিমধ্যে হাবভাব, স্বভাব-চরিত্রেও যেন এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেছে ওর ৷ কলেজের করিডরে আমাকে দেখে আড়ষ্ট, ফ্যাকাশে হয়ে গেল ওর মুখ ৷ কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে চলে গেল দ্রুতপায়ে ৷ আমি ব্যথা-বিস্মিত দু-চোখ তুলে তাকিয়ে রইলাম ওর চলে-যাওয়া-পথের দিকে ৷
এর পরের দিন থেকে লীনা আর কলেজেই এল না ৷ শুনলাম, ওর বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে ৷ পাত্র এক তরুণ ডাক্তার ৷ দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে আলাপ হয়েছে দুজনের ৷ তারপর ছেলেটা সুযোগ বুঝে আত্মীয়তা পাতিয়ে নিয়েছিল ওদের পরিবারের সঙ্গে ৷ লীনার বাবাও মৃদু হেসে প্রসন্ন মনে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাকে ৷ এর মাসখানেক বাদে বিয়ে হয়ে গেল ওদের ৷
আমার সে-দিনগুলোর কথা আপনাদের বোঝাই কেমন করে! দুঃখে, অপমানে, লজ্জায়, হতাশায় সমস্ত বিশ্বটাই ঝাপসা হয়ে এল দু-চোখের সামনে ৷ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অস্তিত্বটাও বুঝি আর টের পাচ্ছিলাম না নিজের মধ্যে ৷ পাগলের মতো দিনকতক ঘুরে বেড়ালাম সকাল-সন্ধে ৷ তারপর একসময় লীনার স্মৃতিটা ঘুমিয়ে পড়ল বুকের গভীরে ৷
আমি যেবার কলেজ থেকে পাশ করে বেরোলাম, সেই বছরের ডিসেম্বরে মা-ও গত হলেন ৷ এতদিন ধরে মাকে দেখে আসছি, কিন্তু তাঁর যে মরবার মতো বয়েস হয়েছে, এ-কথা কখনও ভাবিনি ৷ তাই প্রথমটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম ৷ মনে হল, এই দুনিয়ায় আমার আর কোনও প্রয়োজনই নেই ৷ সকলের মধ্যে থেকেও আমি যেন সম্পূর্ণ একা ৷ সঙ্গীহীন, সাথীহীন একক নিঃসঙ্গ জীবন ৷ শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যেই সময় কাটিয়ে যাওয়া ৷
মনের যখন এইরকম অবস্থা সেইসময় একদিন হঠাৎ ট্রামের মধ্যে নীরেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ৷ শুনলাম, টালিগঞ্জে ও এখন একটা পোলট্রি ফার্ম ফেঁদে বসেছে ৷ কী খেয়াল চাপল, নীরেনের সঙ্গে ওর পোলট্রি দেখতে গেলাম ৷ তারপর থেকে আমার মাথাতেও পোলট্রির মতলব ঘুরে বেড়াতে লাগল ৷ পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে আমাকে একটা উপায়ের ব্যবস্থা দেখতে হবে ৷ আর শহরের ভিড়ে চাকরি করে বেঁচে থাকার কথা ভাবতেই আমার অসহ্য লাগে ৷ হিসেব করে দেখলাম, ব্যাঙ্কে এখনও হাজার পনেরোর মতো অবশিষ্ট পড়ে আছে ৷ সেই টাকা দিয়েই একটা চান্স নেব ঠিক করলাম ৷ সব যদি ডুবেও যায় তাতেই বা ক্ষতি কী? আমি এখন কোনো কিছুরই পরোয়া করি না ৷
এইসব ভেবেচিন্তে দিনকতক নীরেনের সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম ৷ পোলট্রি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হল আমার ৷ তারপর আমার কাজ শুরু করলাম ৷
এদিক থেকে ভাগ্য আমার সুপ্রসন্নই ৷ বলতে হবে ৷ প্রথমে টলমল করলেও আস্তে-আস্তে আমার ফার্ম নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখল ৷ আমিও দিনরাত এই ফার্ম নিয়েই পড়ে রইলাম ৷ শহরের এক নির্জন প্রান্তে একা-একা দিনগুলো মন্দ কাটছিল না ৷
চার বছরের মধ্যে আমি আমার পোলট্রিটাকে মোটামুটিভাবে বৈজ্ঞানিক প্রথায় গড়ে তুললাম ৷ কাঠা-ছয়েক জমি নিয়ে আমার এই পোলট্রি ৷ চারধারে উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা ৷ মুরগিদের জন্যে জাল দিয়ে ঘেরা দুটো বিরাট খাঁচা ৷ এককোণে অ্যাসবেসটসের শেড দেওয়া আমার থাকার আস্তানা ৷ বারান্দার একধারে ইনকিউবেটর, আর মুরগিদের জন্যে মাংসের কিমা বানাবার প্রমাণ সাইজের সেই মেশিনটা ৷ যদিও আমার ছোট ফার্মের পক্ষে এত বড় মেশিনের দরকার ছিল না, তবে পার্ক স্ট্রিটের এক নিলামের দোকানে জিনিসটা খুব সস্তায় পেয়েছিলাম বলেই কিনে এনেছিলাম ৷
সেটা শরৎকাল ৷ আকাশ থেকে হিম-হিম ঠান্ডা ঝরছিল সন্ধেবেলা ৷ আমার সারাদিনের কাজের লোক তিনকড়িও ছুটি নিয়ে চলে গেছে কিছু আগে ৷ একা-একা ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে একটা বিলিতি ক্রাইম নভেলের পাতা ওলটাচ্ছিলাম অলসভাবে ৷ খুব বেশি আগ্রহ ছিল না বইটার ওপর ৷ এমন সময় সদরে কলিংবেলের আওয়াজ শুনে বাইরে বেরিয়ে এলাম ৷ এসে দেখি, ছোট একটা সুইকেস হাতে লীনা দাঁড়িয়ে ৷ লীনা যে আবার কোনো দিন আমার কাছে আসবে, আবার কোনো দিন আমি ওর দেখা পাব, সে-কথা স্বপ্নেও ভাবিনি ৷ আমার বিমূঢ়, বিস্মিত চোখের সামনে লীনা দাঁড়িয়ে ছিল ৷
