.
সদলবলে এগিয়ে চলেছেন সেড্রিক বন-পথ ধরে। পথ ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। শেষকালে এমন হলো পাশাপাশি দুজন চলাও দায় হয়ে পড়লো। সামনে একটা নালা। নালার পরেই শুরু হয়েছে জলাভূমি। মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেছে সরু পথ। সেড্রিক ভাবলেন, ডাকাতরা যদি হামলা করে এখানেই করবে। সবাইকে তাড়াতাড়ি এগোনোর নির্দেশ দিলেন তিনি।
ঠিকই ভেবেছিলেন সেড্রিক। দলের অর্ধেক সবে মাত্র পার হয়েছে নালা, এই সময় চারদিক থেকে সবুজ পোশাক পরা ডাকাত দল আক্রমণ করলো তাদের। আচমকা আক্রান্ত হয়ে সবাই এমন হকচকিয়ে গেলেন যে দস্যুদের ঠিক মতো বাধাও দিতে পারলেন না। একমাত্র ওয়াম্বা ছাড়া আর সবাই বন্দী হলো ডাকাতদের হাতে।
তলোয়ার হাতে বেশ কিছুক্ষণ লড়লো ওয়া। কয়েকজন ডাকাতকে কাবুও করলো। তবে শেষ পর্যন্ত গতিক সুবিধার নয় দেখে হৈ–চৈ-এর ভেতর এক ফাঁকে পালিয়ে গেল জঙ্গলে।
.
বনের ভেতর কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালো ওয়া। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। তারপর হঠাৎ নিচুকণ্ঠের একটা ডাক শুনে চমকে উঠলো ও। ওর নাম ধরেই ডাকছে।
ওয়াম্বা! আবার শোনা গেল ডাকটা।
এবার চিনতে পারলো ওয়াম্বা গার্থের গলা।
গার্থ নাকি? নিচু কণ্ঠে প্রশ্ন করলো ও।
জবাবে কাছের একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো গার্থ।
ব্যাপার কি, ওয়াম্বা? জিজ্ঞেস করলো সে। একটু আগে চিৎকার চেঁচামেচি আর তলোয়ারের ঠোকাঠুকি শুনলাম!
আমাদের মনিব আর তাঁর মেয়ে দলবলসুদ্ধ বন্দী হয়েছেন ডাকাতদের হাতে। আমি পালিয়ে এসেছি কোনোমতে।
দুশ্চিন্তার ছাপ পড়লো গার্থের মুখে।
ওয়া, বললো সে, তোমার কাছে তলোয়ার আছে, বুকের ভেতর কলজেটাতে সাহসও আছে, তার ওপর আছি আমি। চলো, দুজনে মিলে মনিবকে উদ্ধার করা যায় কিনা দেখি। এসো–
থামো!
ঝোপ ঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো এক লোক। পরনে সবুজ পোশাক। ওয়াম্বা ভাবলো এ-ও বোধহয় ডাকাতদেরই একজন। সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার বাগিয়ে ধরলো ও। কিন্তু গাৰ্থ চিনতে পারলো লোকটাকে। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনে তীর ছোঁড়া প্রতিযোগিতায় যে বিজয়ী হয়েছিলো সেই লক্সলি।
কি ব্যাপার? এখানে কারা কাকে আক্রমণ করে বন্দী করলো? জানতে চাইলো সে।
খানিকটা এগিয়ে গেলেই দেখতে পাবে কারা, ঝঝের সাথে বললো ওয়াম্বা। পোশাক দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি তাদেরই দলের লোক। আর কাকে, শুনবে? আমার মনিব মহান স্যাক্সন সেড্রিক আর তার মেয়ে রোয়েনাকে।
একটু যেন থমকালো লোকটা।
আচ্ছা, দাঁড়াও তোমরা, আমি দেখে আসছি। আমি না ফেরা পর্যন্ত নোড়ো না, নইলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাবে।
বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল লক্মলি। ফিরে এলো একটু বাদেই।
তোমাদের মনিবকে কারা আটকেছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানতে পেরেছি, বললো সে। ওরা সংখ্যায় এত বেশি, আমরা মাত্র তিনজন এই মুহূর্তে কিছু করতে পারবো না ওদের। তাই বলে ভেবো না আমি বসে থাকবো। আমার সব লোকদের জড় করে আমি উদ্ধার করবো স্যাক্সন সেড্রিককে। এসো আমার সাথে।
১২. দ্রুত গতিতে হেঁটে চলেছে লক্সলি
দ্রুত গতিতে হেঁটে চলেছে লক্সলি। তার সাথে তাল রাখার জন্যে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে গার্থ আর ওয়াম্বাকে।
এইভাবে পাক্কা তিন ঘণ্টা চলার পর বনের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গায় উপস্থিত হলো তারা। জায়গাটার মাঝখানে বিশাল এক ওক গাছ মাথা তুলেছে। তার নিচে শুয়ে আছে পাঁচজন লোক। সবুজ পোশাক প্রত্যেকের গায়ে। পাঁচজনই ঘুমিয়ে। ষষ্ঠ একজন পাহারা দিচ্ছে ঘুমন্ত লোকগুলোকে। এরও পরনে সবুজ পোশাক।
কে! থামো!
ওদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো পাহারাদার। অমনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো ঘুমিয়ে থাকা লোকগুলো। মুহূর্তের ভেতর তীর ধনুক বাগিয়ে তৈরি।
তিনজন এগিয়ে গেল আরো খানিকটা। এবার ওরা চিনতে পারলো ললিকে। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাকে অভ্যর্থনা জানালো। গাৰ্থ, ওয়া দুজনের কারোই বুঝতে বাকি রইলো না, এই রাজদ্রোহী ডাকাত দলটার নেতা ললি।
মিলার কোথায়? প্রথম প্রশ্ন করলো সে।
রদারহ্যামের রাস্তায়। ছজনকে সাথে নিয়ে গেছে।
অ্যালান আ-ডেল?
ওয়াটালিং স্ট্রীটের দিকে গেছে। জরভক্স মঠের প্রায়োরকে ধরার জন্যে। ঘাপটি মেরে থাকবে।
আর আমাদের সাধু টাক?
কপম্যানহা-এ ওঁর কুটিরে।
ঠিক আছে, আমি নিজেই যাচ্ছি ওঁর কাছে। তোমরা শোনো! মন দিয়ে শোনো! ভোর হওয়ার আগেই আমাদের সবাইকে এখানে জড় করতে হবে। জরুরি একটা কাজ আছে। দুজন এক্ষুনি চলে যাও রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফের টরকুইলস্টোন দুর্গে। একদল নরম্যান গুপ্তা আমাদের মতো পোশাক পরে কয়েকজন স্যাক্সনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যতটুকু বুঝেছি ওরা বোয়েফের দুর্গের দিকেই যাচ্ছে। দুৰ্গটার ওপর চোখ রাখবে তোমরা দুজন। ওরা দুর্গে ঢুকে পড়ার আগেই আমাদের গিয়ে উদ্ধার করতে হবে বন্দীদের।
লক্সলির নির্দেশ মতো যে যার কাজে চলে গেল। আর ও নিজে গাৰ্থ আর ওয়াম্বাকে নিয়ে রওনা হলো কপম্যানহাস্ট আশ্রমের দিকে। ভাঙা গির্জাটার কাছাকাছি পেীছে ওরা শুনতে পেলো, পাশের ছোট্ট কুটির থেকে ভেসে আসছে ফাদার ও তার অতিথির গান। দুই শিল্পীই যে প্রচুর পরিমাণে পান করেছেন তা তাদের গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে।
শোনো! গার্থের কানে কানে বললো ওয়াষা, সাধুবাবার আশ্রমে প্রার্থনা চলছে, শোনো।
