বনে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে এলো চারদিক। ধীর গতিতে ঘোড়া চালিয়ে চলেছেন সেড্রিক ও অ্যাথেলস্টেন। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠে করুণ কান্নার শব্দ। মাঝে মাঝে কাতর চিৎকার: বাঁচাও! একটু সাহায্য করো আমাদের!
শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেলেন সেড্রিক। কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলেন, পথের পাশে পড়ে আছে ঘোড়া ছাড়া একটা পাল্কি-গাড়ি। পাশে বসে অপূর্ব সুন্দরী এক তরুণী। ইহুদী ঢং-এ কাপড় পরা। কাঁদছে সে-ই। সামান্য দূরে এক বৃদ্ধ অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। তাঁরও পরনে ইহুদী ধাঁচের পোশাক। মাথায় ইহুদীদের হলদে টুপি। দেখা মাত্র সেড্রিক চিনতে পারলেন বুড়ো ইহুদী আইজাক ও তার মেয়ে রেবেকাকে।
আইজাক যা বললেন তার মর্মার্থ: অসুস্থ এক বন্ধুকে বয়ে নেয়ার জন্যে অ্যাশবি থেকে একটা পাল্কি-গাড়ি আর ছয়জন রক্ষী ভাড়া করেছিলেন তিনি। চুক্তি হয়েছিলো ডাঙ্কেনস্টার পর্যন্ত তাদের পৌঁছে দেবে ওরা। এ পর্যন্ত নিরাপদেই এসেছেন কিন্তু তারপর এক কাঠুরিয়ার সাথে দেখা হয়ে যায় তাঁদের তখন সন্ধ্যা হতে সামান্য বাকি। কাঠুরিয়া রক্ষীদের নিষেধ করে আর এগোতে। কারণ সে নাকি দেখেছে, একটু সামনে একদল ডাকাত ওঁৎ পেতে বসে আছে। এই শুনে আর একমুহূর্ত দেরি করেনি ভাড়াটে লোকগুলো। ঘোড়া কটা নিয়ে চম্পট দিয়েছে। পাল্কি-গাড়িটা কেবল রেখে গেছে, সম্ভবত অসুস্থ লোকটাকে নামিয়ে রাখতে গেলে যেটুকু দেরি করতে হতো সেটুকু করারও সাহস পায়নি তারা। বৃদ্ধ, তার মেয়ে আর অসুস্থ লোকটাকে ফেলে রেখে গেছে ডাকাতদের দয়ার ওপর।
যতক্ষণ না বন পার হচ্ছি ততক্ষণ দয়া করে আমাদের সাথে নেবেন আপনারা? বিনীত ভঙ্গিতে প্রার্থনা জানালেন আইজাক।
না, সেড্রিক কিছু বলার আগেই বলে উঠলো অ্যাথেলস্টেন। ইহুদী কুকুর! টুর্নামেন্টের সময় গ্যালারিতে বসবার জন্যে আমার সাথে কেমন অদ্র ব্যবহার করেছিলে ভুলে গেছ এর মধ্যে? ডাকাতরা যদি ধরেই তুমি তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, না পালিয়ে যাবে, না আপোষে তাদের সাথে মিটমাট করবে তা তুমি জানো। আমাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাবে না। এতদিন নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে সুদ খেয়ে খেয়ে পেট মোটা করেছে, এবার তার খেসারত দাও।
অ্যাথেলস্টেনের কথা শুনে মাথা নাড়লেন সেড্রিক। কেন যেন ইতস্তত করছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বলেই ফেললেন, না, অ্যাথেলস্টেন, বেচারা যখন এত করে বলছে, কিছু হলেও আমাদের সাহায্য করা দরকার। আমি বলি কি, গোটা দুই ঘোড়া আর জনা দুই লোক দিয়ে যাই। তাহলে, আমার মনে হয়, সামনে প্রথম যে গ্রাম পড়বে সেখানে গিয়ে ওরা একটা আশ্রয় খুঁজে নিতে পারবে। আমাদের দুজন লোক কমে যাবে বটে, কিন্তু অ্যাথেলস্টেন, তুমি যখন সঙ্গে আছো, বোধহয় কোনো দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে আমাদের, কি বলো?
বাবা, ঠিকই বলেছো, রোয়েনা সমর্থন করলো সেড্রিকের কথা।
এমন সময় রেবেকা এগিয়ে এলো। রোয়েনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে চুমু খেলো ওর গাউনের প্রান্তে।
দয়া করুন আমাদের, কাতর কণ্ঠে মিনতি করলো সে। আপনাদের সাথে যাওয়ার সুযোগ দিন দয়া করে। আমি আমার জন্যে বলছি না, আমার বুড়ো বাবার জন্যেও না, আমি বলছি ঐ অসুস্থ ভদ্রলোকের জন্যে। অনেকের কাছেই তার প্রাণ খুব দামী, আপনার কাছেও। যদি ওঁর কিছু হয়ে যায় সারাজীবন আপনি এ নিয়ে আক্ষেপ করবেন।
রেবেকার কাতর স্বরে মন নরম হয়ে গেল রোয়েনার। সেড্রিকের কাছে গিয়ে সে বললো, বুড়ো বাপটা দুর্বল; মেয়েটা যুবতী, সুন্দরী; সঙ্গী অস্থ। আমি বলি কি, বাবা, ওদের সাথে নিয়ে নাও। একটা ঘোড়াই পাল্কি-গাড়িটা টানতে পারবে, আর ওদের বাপ-বেটির জন্যে লাগবে দুটো ঘোড়া। আমার মনে হয় না তিনটে ঘোড়া দিয়ে দিলে আমাদের খুব অসুবিধা হবে। যে ঘোড়াগুলো মালপত্র বইছে তাদের বোঝা একটু বাড়বে এই যা, তা-ও খুব বেশিক্ষণের জন্যে নয়। সামনের গ্রামটায় পৌঁছে গেলেই তো ওরা ওদের পথে চলে যেতে পারবে।
রাজি হয়ে গেলেন সেড্রিক। ভৃত্যরা জিনিসপত্র নামিয়ে তিনটে ঘোড়া খালি করে দিতে লাগলো।
সেড্রিক তার কথা না শোনায় একটু ক্ষুন্ন হয়েছে অ্যাথেলস্টেন।
ওরা তাহলে আমাদের একেবারে পেছনে থাকবে, রুক্ষ কণ্ঠে বললো সে। আর, ওয়াম্বা, তুই তোর শুয়োরের মাংসের ঢাল নিয়ে ওদের রক্ষা করবি।
আমার চেয়ে অনেক বড় বড় বীর টুর্নামেন্টে বর্ম ফেলে এসেছেন, ওয়াম্বা জবাব দিলো। তাদের দেখাদেখি আমিও আমার ঢালটা ফেলে এসেছি ওখানে।
অপমানে চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো অ্যাথেলস্টেনের। সত্যি সত্যিই তাকে পরাজিত হয়ে বর্ম ফেলে আসতে হয়েছে। ওয়াকে উচিত একটা শিক্ষা দেয়ার ইচ্ছা হলেও আপাতত সামলে নিলো সে। ওয়াম্বা ক্রীতদাস হলেও সেড্রিকের প্রিয় পাত্র। ওকে কিছু বললে সেড্রিক তা সুনজরে দেখবেন না।
তুমি তো আমার পাশে পাশে যেতে পারো, রেবেকার কাছে গিয়ে রোয়েনা বললো।
না, জবাব দিলো রেবেকা। সেটা ভালো দেখাবে না। আপনি যে অনুগ্রহ দেখিয়েছেন তা-ই যথেষ্ট আমার জন্যে।
একটা ঘোড়ার পিঠে দুহাত বাঁধা অবস্থায় বসে ছিলো গাৰ্থ। সেড্রিকের নির্দেশে ওয়াম্বা তাকে নামিয়ে ঘোড়াটা দিলো বৃদ্ধ ইহুদীকে। এরই ভেতর এক ফাঁকে সে দয়া পরবশ হয়ে গার্থের হাতের বাঁধনটা একটু ঢিলে করে দিলো। সব কিছু যখন ঠিক ঠাক করে আবার রওনা হলো দলটা তখন এক সুযোগে গার্থ হাতের বাঁধন পুরো খুলে ফেলে এক ছুটে ঢুকে পড়লো বনের ভেতর। দলের কেউ তা খেয়াল করলো না।
