কুটিরের দরজায় গিয়ে টেলকম দিলো ললি।
সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল গনি। কিন্তু দরজা খুললো না। আবার টোকা দিলো ললি।
কে? সন্ন্যাসীর গলা ভেসে এলো ভেতর থেকে।
ব্যাটা বিড়াল তপস্বী! আপন মনে গজগজ করে উঠলো লক্সলি। তারপর বললো, খুলুন! আমি লক্সলি।
ভয়ের কিছু নেই, নাইটের দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী বললেন। তারপর খুলে দিলেন দরজা।
ভেতরে কে, সন্ন্যাসী? জিজ্ঞেস করলো লক্সলি।
আমাদের পথের এক ভাই। সারারাত ধরে আমরা প্রার্থনা করছি।
হ্যাঁ, মাইল খানেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিলো আপনাদের প্রার্থনা। হাসলো ললি। এখন শুনুন, নষ্ট করার মতো সময় নেই একদম। আপনি আপনার পথের ভাইকে নিয়ে এক্ষুনি চলুন আমাদের সাথে। যেখানে যাকে পাওয়া যায়, সবাইকে আমার দরকার হবে।
আর কথা বাড়ালেন না ফাদার, তাড়াতাড়ি তিনি গাউন খুলে ডাকাতের সবুজ পোশাক পরতে লাগলেন। এই ফাকে লক্সলি ঘরের এক কোনায় টেনে নিয়ে গেল ব্ল্যাক নাইটকে।
আমার মনে হয় আপনাকে আমি চিনি, বললো সে। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনে আপনিই তো বাঁচিয়েছিলেন আইভানহোকে?,
যদি বাঁচিয়ে থাকি তো কি হয়েছে?
সত্যিই যদি আপনি সেই নাইট হন, বুঝবো আপনি দুর্বলের সহায়, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আপনার স্বভাব।
সত্যিকারের নাইট মাত্রেরই কর্তব্য সেটা। এখন তুমি কি বলতে চাইছো বলো তো।
আমি যে কথা বলবো তা শুনতে হলে শুধু নাইট হলেই চলবে না, খাঁটি ইংরেজও হওয়া চাই।
ইংল্যান্ড আর ইংরেজ!–পৃথিবীতে এই দুটো জিনিসের চাইতে প্রিয় আমার আর কিছু নেই।
তাহলে বলছি শুনুন, এক দল নরম্যান বদমাশ স্যাক্সন সেড্রিক আর তার মেয়েকে বন্দী করেছে। তার সঙ্গে আর যারা ছিলো তাদেরও আটকেছে। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি ওরা এখন টরকুইলস্টোন দুর্গের দিকে যাচ্ছে। সেড্রিককে উদ্ধারের কাজে আমি আপনার সাহায্য চাইছি, নাইট।
খুশি মনেই আমি করবো সাহায্য। কিন্তু তার আগে জানতে চাই, তুমি কে?
আমি আমার দেশ ও আমার দেশকে যারা ভালোবাসে তাদের বন্ধু। এর বেশি কিছু আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। আমাকে পীড়াপীড়ি করবেন না।
বেশ, আর কিছু জিজ্ঞেস করবো না, বললো ব্ল্যাক নাইট। পরে, আশা করি, আমরা একে অন্যকে আরো ভালোভাবে জানতে পারবো।
সন্ন্যাসী ইতোমধ্যে প্রায় তৈরি হয়ে গেছেন। রাজদ্রোহী দস্যুদের পোশাকের ওপর আবার তার ঢোলা গাউন পরে নিয়েছেন তিনি। গাউনের নিচে কোমরে তলোয়ার, কাঁধে তীর ধনুক।
চলুন, বিড়াল তপস্বী, চলুন নাইট, লক্সলি বললো। গাৰ্থ আর ওয়াম্বার দিকে তাকিয়ে যোগ করলো, তোমরাও এসো। যত বেশি লোক হয় ততই ভালো। ঐত দ্য ববায়েফের দুর্গ দখল করা চাট্টিখানি কথা নয়।
ফ্রঁত দ্য বোয়েফ! সবিস্ময়ে উচ্চারণ করলো নাইট, রেজিনাল্ড ট্রুত দ্য বোয়েফ রাজার বিশ্বস্ত প্রজন্তুদের ওপর হামলা চালিয়েছে! ও আজকাল ডাকাতি শুরু করেছে নাকি?
ডাকাতি, হাহ! মাথায় হুড লাগাতে লাগাতে বললেন সন্ন্যাসী টাক। আমার চেনা বহু ডাকাতের চেয়ে অনেক বেশি দুশ্চরিত্র ও।
.
বন্দীদের নিয়ে সারা রাত পথ চললো দ্য ব্রেসি আর টেম্পলার ব্রায়ান দ্য বোয়া-গিলবার্ট। ভোরের সামান্য আগে পৌঁছে গেল টরকুইলস্টোন দুর্গের কাছাকাছি।
এবার বোধহয় তোমার বিদায় নেয়া উচিত, দ্য ব্রেসি, বললো বোয়াগিলবার্ট। পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশের নায়ক তো তুমি। তৈরি হয়ে এসো
প্রেমিকাকে উদ্ধার করার জন্যে।
না, আমি মত বদলেছি। তোমার সাথেই থাকছি আমি। মত বদলেছে! সবিস্ময়ে বললো টেম্পলার ব্রায়ান। কেন?
ইতস্তত করছে দ্য ব্রেসি। যা বলতে চায় তা বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না। দেখে ব্রায়ান আবার বললো, তুমি কি ভাবছো সুন্দরী রোয়েনাকে আমি কেড়ে নেবো তোমার কাছ থেকে? না, বন্ধু, ভুল ভেবেছো তুমি। তোমার রোয়েনাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই আমার। দলে আরেকটা মেয়ে আছে দেখোনি?–রোয়েনার চেয়ে অনেক সুন্দরী ও।
মানে! তুমি আইজাকের মেয়ে রেবেকার কথা বলছো? ঠিক তাই।
আমি তো ভেবেছিলাম বুড়ো ইহুদীর টাকার থলেটার ওপরই তোমার লোভ। এখন বলছো মেয়েটাকেও চাও!
হ্যাঁ। যদি চাই তো কে বাধা দেবে? টাকার মাত্র অর্ধেক আমি পাবো। বাকি অর্ধেক দিয়ে দিতে হবে রেজিনান্ডকে। ও কি মনে করো আমোক ওর দুর্গ ব্যবহার করতে দিচ্ছে?–মেয়েটাকে যদি না বাগাতে পারি আমার লোকসান হয়ে যাবে না?
কিন্তু, তুমি টেম্পলার, আজীবন অবিবাহিত, থাকার পবিত্র শপথ নিয়েছে। এই অবস্থায় বিয়ে তো বিয়ে, একেবারে ইহুদীর মেয়েকে—
দেখ, দ্য ব্রেসি, কোনো শপথই আমি নেইনি। যদি নিয়েও থাকি নিয়েছি লোক দেখানোর জন্যে। তাতে যদি পাপ হয়ে থাকে, ক্রুসেডে যোগ দিয়ে তিন তিনশো বিধর্মীকে হত্যা করেছি, নিশ্চয়ই সে পাপ স্খলন হয়ে গেছে। আমার তো মনে হয় কিছু পুণ্যও সঞ্চয় হয়েছে। সুতরাং কোনো কাজই আমার কাছে গহিত নয়।
কি জানি–তোমার ব্যাপার তুমিই ভালো বোঝো, মিইয়ে যাওয়া গলায় বললো দ্য ব্রেসি।
ভয় পেও না, দ্য ব্রেসি, আশ্বাস দিলো বোয়া-গিলবার্ট, তোমার রোয়েনাকে আমি কেড়ে নেবো না তোমার কাছ থেকে। বিশ্বাস হচ্ছে না আমাকে?
হচ্ছে– কিন্তু, ঐ একই কথা, আমি যাচ্ছি তোমার সাথে টরকুইলস্টোনে।
কয়েক মিনিটের ভেতর পৌঁছে গেল ওরা দুর্গের সামনে। কোমর থেকে শিঙা খুলে নিয়ে তিনবার ফু দিলো দ্য ব্রেসি। ঘড় ঘড় শব্দে নেমে এলো ঝুলসেতু। বন্দীদের নিয়ে দুর্গে ঢুকলো দুই নাইট।
