তোমাকে যে লোকে অলস বলে, বোধ হয় মিথ্যে বলে না। এত সব চমৎকার অস্ত্রশস্ত্র রেখে কিনা বের করলে বীণা! ঠিক আছে, তুমি আমার অতিথি, তোমার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। এসো গেলাস ভরে নাও, তারপর তুমি বাজাও আমি শুনি।
কিন্তু দুগেলাস পেটে পড়তেই শুধু শুনে আর চললো না সন্ন্যাসীর। বাজনার সাথে সাথে হেঁড়ে গলায় গান ধরলেন তিনি। একটু পরে নাইটও গলা মেলালো। কিছুক্ষণের ভেতর বিভোর হয়ে গেলেন দুই শিল্পী।
কতক্ষণ কেটে গেছে এভাবে কেউ বলতে পারবে না। হঠাৎ মৃদু টোকার শব্দ হলো দরজায়। মুহূর্তে থেমে গেল গান বাজনা। মাংসের থালা আর মদের বোতল গেলাস লুকিয়ে ফেলার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সন্ন্যাসী। নাইট দ্রুত হাতে পরে নিলেন শিরোস্ত্রাণ।
আবার টোকার শব্দ হলো।
কে? চিৎকার করে উঠলেন সন্ন্যাসী।
ব্যাটা বিড়ালতপস্বী! শোনা গেল একটা কণ্ঠস্বর। খুলুন! আমি লক্সলি।
১১. অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়া বিজয়ী নাইট
সেড্রিক যখন দেখলেন অচেতন হয়ে পড়ে যাওয়া বিজয়ী নাইট আর কেউ নয়, তারই একমাত্র ছেলে আইভানহো, ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে হলো তার। কিন্তু তাঁর অহঙ্কার তাঁকে পেছনে টেনে রাখলো। যে ছেলে পিতার অবাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, যাকে তিনি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, এত লোকের সামনে তার ব্যাপারে দুর্বলতা দেখাতে সংকোচ বোধ করলেন তিনি। ধীরে ধীরে সরে এলেন সে জায়গা থেকে। কিন্তু ছেলের জন্যে আকুলতা তাঁর গেল না। শেষ পর্যন্ত অনেক ভেবে চিন্তে বিশ্বস্ত ভৃত্য অসওয়াল্ডকে পাঠিয়ে দিলেন আইভানহোর দেখাশোনা করার জন্যে। ভাবলেন, অবাধ্য ছেলের জন্যে এর চেয়ে বেশি আর কি করবেন তিনি?
অসওয়াল্ড এগিয়ে গেল নাম না জানা নাইট যেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলো সেখানে। কিন্তু কোথায় নাইট? আঁতিপাতি করে খুঁজলো অসওয়াল্ড। কোথাও দেখলো না আইভানহোকে। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে বিচারকদের শরণাপন্ন হলো সে। আইভানহো কোথায় কি অবস্থায় আছে, জানতে চাইলো। বেশিরভাগ বিচারকই বললেন তারা জানেন না। একজন কেবল বললেন, তিনি জানেন। এক মহিলা দর্শক খুব যত্নের সাথে তাকে নিজের পালকিতে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেছে। বাহকরা পালকি নিয়ে কোথায় বা কোন দিকে গেছে তা তিনি বলতে পারলেন না।
আরো দুচারজনকে জিজ্ঞেস করলো অসওয়াল্ড। কিন্তু কেউই নতুন কিছু বলতে পারলো না। মনিবকে খবরটা জানানোর জন্যে ফিরে আসছে, এমন সময় গার্থের ওপর নজর পড়লো তার। হঠাৎ করে আইভানহো অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বেচারা শুয়োর পালক এমন দিশেহারা হয়ে পড়েছে যে ছদ্মবেশ সম্পর্কে তার যে সতর্ক হওয়া দরকার তা তার একদম মনে নেই। অসওয়াল্ড দেখামাত্র ওকে চিনে ফেললো। এবং দুদিন ধরে নাম না জানা নাইটের ভৃত্য হিশেবে যাকে দেখা যাচ্ছিলো সে যে গাৰ্থই তা-ও বুঝতে পারলো। পাকড়াও করে মনিবের কাছে নিয়ে এলো ওকে অসওয়াল্ড।
গার্থকে দেখেই ভয়ানক ক্ষেপে উঠলেন সেড্রিক। ওর পোশাক আশাক দেখে তিনিও বুঝতে পেরেছেন এই দুদিন আইভানহোকে সাহায্য করেছে ও।
বদমাশকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখো! চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন তিনি।
এরপর সেড্রিক অসওয়ান্ডের কাছে জানতে চাইলেন আইভানহোর খবর। যা যা জানতে পেরেছে সব বললো অসওয়াল্ড। শুনে একটু স্বস্তি বোধ করলেন সেড্রিক। এবার তার মনে জেগে উঠলো অভিমান। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, হতভাগা যে চুলোয় খুশি যাক! আমার কি? যাদের জন্যে ও আমাকে ছেড়ে গেছে তারাই ওর সেবা যত্ন করুক পারে তো। তোমরা সব তৈরি হও, ভৃত্যদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন তিনি, আমরা এক্ষুনি রওনা হবো।
কয়েক মিনিট লাগলো তৈরি হতে। তারপর রওনা হলেন সেড্রিক দলবল নিয়ে। ইতোমধ্যে অ্যাথেলস্টেন একটু বিশ্রাম নিয়ে, যথাসম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে এসে যোগ দিয়েছে তাদের সাথে। স্যাক্সন হওয়া সত্ত্বেও নরম্যানদের হয়ে কেন লড়লো সে সম্পর্কে তাকে একটা প্রশ্নও করলেন না সেড্রিক।
সন্ধ্যার কিছু পরে বার্টন-অন-ট্রেন্ট-এ পৌঁছুলেন ওঁরা। বার্টন-অনট্রেন্টের সেইন্ট উইদহোন্ড মঠের প্রায়োরকে আগেই সেড্রিক খবর দিয়ে রেখেছিলেন, তারা আসছেন; মঠে রাতটা থেকে ভোরে বাড়ির পথে রওনা হবেন।
মঠের স্যাক্সন প্রায়োর অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অভ্যর্থনা জানালেন ওঁদের। আগে থাকতে খবর পাওয়ায় ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করতে পেরেছিলেন তিনি। মঠে ঢুকেই খেতে বসে গেল সবাই। খাওয়া দাওয়ার পর অতিথিরা কে কোথায় ঘুমাবেন দেখিয়ে দিলেন প্রায়োর।
সকালে ঘুম থেকে উঠে পেট ভর্তি নাশতা করে দলবল নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন সেড্রিক।
সারাদিন একটানা পথ চলে দিন শেষে এক বনের কাছে পৌঁছুলেন তাঁরা। পথচারীদের জন্যে খুব খারাপ জায়গা এ বন, চোর, ডাকাত, আইন বিরোধীদের স্বর্গ। রাতে তো বটেই দিনের বেলায়ও মাঝে মাঝে পথিকদের সর্বস্ব কেড়ে রেখে দেয় এ বনের দস্যুরা। কিন্তু সেড্রিক ভয় পেলেন না। কারণ তিনি জানেন ইংল্যান্ডের বেশিরভাগ ডাকাতই স্যাক্সন। নরম্যান রাজশক্তির কোপানলে পড়ে তারা ডাকাত হয়েছে। আগে ওরা সব সাধারণ মানুষই ছিলো। এখন নিছক বেঁচে থাকার জন্যে ডাকাতি করে। তার ধারণা তার আর অ্যাথেলস্টেনের নাম শুনলে ডাকাতি দূরে থাক সম্মান জানিয়ে কূল পাবে না ওরা। তাছাড়া তিনি নিজে এবং অ্যাথেলস্টেন দুজনই যোদ্ধা, সঙ্গে আছে বারো জন অনুচর। সুতরাং ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
