যুদ্ধের পোশাক ছেড়ে আবার সে টুলে গিয়ে বসলো। সন্ন্যাসীর দেখাদেখি মুখে দিলো দুতিনটে শুকনো বীন। এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো কি বোকামিই না করেছে। এমন শক্ত জিনিস মানুষের খাদ্য হতে পারে না। সন্ন্যাসী হয় ঠাট্টা করেছেন নয়তো বোকা বানিয়েছেন ওকে। কোনো মতে চিবিয়ে বীন কটা গিলে ফেলে পানীয় চাইলো নাইট।
এক জগ ঠাণ্ডা পানি রাখলেন সন্ন্যাসী তার সামনে। বললেন, পান করো, বৎস, সেইন্ট ডানস্ট্যানের পবিত্র কূপের পানি।
নাইট ইতস্তত করছে দেখে জগটা ঠোঁটের কাছে তুলে চুমুক দিলেন তিনি।
এবার আর থাকতে পারলো না নাইট। বিদ্রুপের সুরে বললো, শুকনো বীন আর ঠাণ্ডা পানি খেয়ে যে বাহারের চেহারা বানিয়েছেন, আপনাকে দেখে তো যে কারো হিংসে হওয়ার কথা! চেহারা দেখে কে বলবে আপনি সন্ন্যাসী, বনের ভেতর নির্জন কুটিরে বসে উপাসনা আর ঈশ্বরের ধ্যানে দিন কাটান?
স্যার নাইট, তুমি ভুলে যাচ্ছো আমার শাদামাঠা খাবারের ওপর স্বর্গবাসী সন্তদের আশীর্বাদ আছে, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন সন্ন্যাসী।
আচ্ছা! তাহলে স্বীকার করতেই হয় স্বর্গ অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে অসাধ্য সাধন করেছে। দোষ নেবেন না, ফাদার, এই পাপীর মনে একটা কৌতূহল জেগেছে, আপনার নামটা কী জানতে পারি?
তুমি আমাকে কপম্যানহা-এর সন্ন্যাসী বলে ডাকতে পারো। সবাই সাধারণত এ নামেই আমাকে ডাকে। কেউ কেউ অবশ্য সন্ন্যাসীর আগে পবিত্র শব্দটা জুড়ে দেয়। কিন্তু, সত্যিই বলছি, এই উপাধির যোগ্য আমি নই। তোমার নামটা কি এবার জানা যায়?
নিশ্চয়ই, ফাদার। আপনি আমাকে ব্ল্যাক নাইট বলে ডাকতে পারেন। কেউ কেউ অবশ্য অলস শব্দটা জুড়ে দেয়, কিন্তু, সত্যিই বলছি, এই উপাধির যোগ্য আমি নই।
হাসলেন সন্ন্যাসী। কথা শুনে তো মনে হচ্ছে বিদ্যেবুদ্ধি আছে পেটে। ভদ্রলোকদের ভেতর দিন কাটিয়ে অভ্যস্ত তাই না?
হ্যাঁ বা না কিছু বললো না নাইট। সন্ন্যাসী এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, এই মাত্র একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। কদিন আগে এক বন-রক্ষী কিছু রান্না করা মাংস দিয়ে গেছিলো আমাকে। সারাদিন জপ তপ নিয়ে থাকি তো, তাছাড়া ওসব খাবার আমি খাই না, তাই একদম মনে ছিলো না। একটু চেখে দেখবে নাকি?
আপনার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছি, ফাদার, আপনার কুটিরে শুকনো বীনের চেয়ে ভালো খাবার আছে। এখন বের করুন দেখি তাড়াতাড়ি। খিদেয় নাড়ীভুড়ি পর্যন্ত হজম হয়ে গেল।
ঘরের অন্ধকার এক কোণে গিয়ে ছোট্ট একটা লুকানো আলমারি থেকে বিরাট এক থালা মাংস বের করে আনলেন সন্ন্যাসী। থালাটা তিনি টেবিলে রাখতে না রাখতেই খেতে শুরু করলো নাইট।
আহ্, খুব ভালো তো খেতে! বললো সে। আপনার সেই বন-রক্ষী, কবে দিয়ে গেছে এ জিনিস?
তা প্রায় দুমাস তো হবেই।
আরেকটা আশ্চর্য ঘটনা, বড় এক টুকরো মাংস মুখে পুরতে পুরতে বললো নাইট।
সতৃষ্ণ নয়নে ফাদার দেখছেন তার খাওয়া। একেকটা টুকরো সে মুখে ফেলছে আর আঁতকে আঁতকে উঠছেন তিনি। অতি দ্রুত খালি হয়ে আসছে থালা।
ফাদারের মনের অবস্থা বুঝতে অসুবিধা হলো না নাইটের।
বুঝলেন, ফাদার, আমি প্যালেস্টাইনে ছিলাম, বললো সে। ওখানে দেখেছি, প্রত্যেক গৃহস্থই সবচেয়ে ভালো খাবার দিয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করে, এবং অতিথির সঙ্গে নিজেও খায়। খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও খায়। এটা ওদের ভদ্রতা। তাছাড়া প্রমাণ দেয় খাবারে বিষ মেশানো নেই। আপনি সন্ন্যাসী মানুষ এসব উপাদেয় খাবারে রুচি নেই আমি জানি, তবু আমার অনুরোধ প্যালেস্টাইনীদের মতো আপনার অতিথির সাথে আপনিও কিছু মুখে দিন।
চক চক করে উঠলো সন্ন্যাসীর চোখ। খাবো? তুমি বলছো?
ইচ্ছে করছে না? আরেকটা বড় টুকরো মুখে পুরে বললো নাইট।
না, না, করছে, বলে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সন্ন্যাসী ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাংসের ওপর। বিরাট একটা টুকরো তুলে চালান করে দিলেন মুখে।
অনেক কষ্টে হাসি সামলালো নাইট। খাওয়া শেষে সে বললো, আপনার সেই বন-রক্ষী মদ টদ কিছু দিয়ে যায়নি?
হেসে লুকানো আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেলেন সন্ন্যাসী। বিরাট একটা বোতল আর দুটো গেলাস নিয়ে এলেন। শুরু হলো পান পর্ব।
গেলাসে চুমুক দিয়ে নাইট বললো, আপনাকে যত দেখছি, ততই রহস্যময় মনে হচ্ছে, ফাদার। আশা করি বিদায় নেয়ার আগে আরো অনেক কিছু জানতে পারবো আপনার সম্পর্কে।
সন্দেহ নেই তুমি সাহসী নাইট, বললেন ফাদার, কিন্তু তোমার মাত্রাজ্ঞান একটু কম মনে হচ্ছে। দেখ, আমার ব্যাপারে যদি বেশি কৌতূহল দেখাও, তোমাকে এমন শিক্ষাই দেবো, বাকি জীবনে আর তা ভুলতে পারবে না।
আচ্ছা! ঈশ্বরভক্ত সন্ন্যাসীর মতো কথাই বটে। বেশ, আপনার চ্যালেঞ্জ আমি গ্রহণ করছি। কি নিয়ে লড়বেন বলুন।
তোমার যা খুশি, বলতে বলতে আলমারিটা আবার খুললেন ফাদার। এর ভেতর যা যা আছে তার থেকে যে কোনোটা তুমি বেছে নিতে পারো।
নাইট এগিয়ে গিয়ে দেখলো, ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুকে প্রায় বোঝাই আলমারির একটা তাক। এক পাশে পড়ে আছে একটা বীণা।
বাহ বাহ! বললো নাইট। ঈশ্বরের উপাসনার জন্যে দারুণ সব উপকরণ মওজুদ করেছেন দেখছি! ঠিক আছে, আপনাকে আর প্রশ্ন করবো না, আমার সব কৌতূহলই মিটে গেছে। অস্ত্রশস্ত্র থাক, তার চেয়ে বরং আসুন এটা নিয়ে কিছু করা যায় কিনা দেখি। বীণাটা বের করে আনলো নাইট।
