রাজপুত্রের সাথে দেখা করার জন্যে রওনা হলেন তিনি।
.
বোয়া-গিলবার্ট আইভানহোর কাছে পরাজিত হবার পর আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না ব্ল্যাক নাইট। টুর্নামেন্ট ময়দান ছেড়ে রওনা হয়ে গেল নিজের পথে। উত্তরে ইয়র্ক নগরীর দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলো সে। লোক চলাচলের সাধারণ পথে গেল না। মানুষ জনের সামনে যেন না পড়তে হয় সেজন্যে বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললো। এবং এক সময় আবিষ্কার করলো সে পথ হারিয়ে ফেলেছে বিশাল শেরউড জঙ্গলে।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাছাড়া সারাদিনের পরিশ্রমে ঘোড়াটা ক্লান্ত, ছুটতে তার কষ্ট হচ্ছে। নিজেও পরিশ্রান্ত। রাত কাটানোর মতো একটা আশ্রয়ের একান্ত প্রয়োজন। অথচ কোথায় গেলে আশ্রয় মিলবে জানা নেই। শেষ পর্যন্ত সে ঘোড়াটাকে ইচ্ছে মতো চলতে দেয়ার জন্যে লাগাম আলগা করে দিলো।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে গির্জার ঘণ্টাধ্বনির মতো অস্পষ্ট একটা আওয়াজ ভেসে এলো নাইটের কানে। তাড়াতাড়ি আবার শক্ত হাতে লাগাম ধরলো সে। ঘোড়া ছোটালো শব্দ লক্ষ্য করে। কিছুদূর গিয়ে প্রাচীন একটা গির্জার ভগ্নাবশেষ নজরে পড়লো তার। গির্জাটা ভেঙেচুরে গেলেও চূড়াটা এখনো মাথা উঁচিয়ে আছে। তারই একটা পুরনো মরচেধরা ঘণ্টা মাঝে মাঝে বাতাসের দমকে নড়ে উঠে বাজছে।
গির্জার অদূরে ওক কাঠের বেড়া দেয়া ছোট্ট একটা কুটির। পাশেই ক্ষীণ একটা ঝরনা টলটলে জল বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে। আবার শোনা গেল ঘণ্টাধ্বনি। আগের চেয়ে অনেক মৃদু। নাইটের মনে হলো কুটিরের ভেতর থেকেই যেন এলো শব্দটা। বোধহয় কোনো পবিত্র সন্ন্যাসী থাকেন এই কুটিরে, ভাবলো সে। যদি চাই নিশ্চয়ই উনি আমাকে খাদ্য ও রাতের মতো আশ্রয় দেবেন।
কুটিরের সামনে গিয়ে ঘোড়া থেকে নামলো নাইট। বর্শার উঁটি দিয়ে মৃদু আঘাত করলো দরজায়।
কোনো সাড়াশব্দ নেই কুটিরের ভেতরে। কিছুক্ষণ পর আবার আঘাত করলো নাইট।
এগিয়ে যাও, গম্ভীর একটা গলা ভেসে এলো এবার। এখানে গোলমাল করে আমার প্রার্থনায় বিঘ্ন ঘটিও না।
ফাদার, আমি একজন হতভাগ্য পথিক। পথ হারিয়ে ফেলেছি। খাবার এবং রাতের মতো আশ্রয় দরকার আমার। আমাকে দয়া করুন।
যাও, যাও, বললাম না বিরক্ত কোরো না! আমার কাছে যে খাবার আছে তা কুকুরের খাওয়ার মতো নয়। আমার বিছানা কুকুরের শোয়ার উপযোগী নয়। তুমি ভাগো! আমাকে নিরিবিলিতে প্রার্থনা করতে দাও।
ফাদার, আমি মিনতি করছি, দরজা খুলুন, পথহারাকে সঠিক পথ দেখান।
ভাই, আমিও মিনতি করছি, দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত কোরো না।
আশ্রয় যদি একান্ত না-ই দিতে চান, কোন পথে গেলে পাবো তা অন্তত বলে দিন।
এখান থেকে সোজা কিছুদূর গেলে একটা জলা পাবে। সেটা পেরিয়ে আরো কিছুদূর গেলে পাবে ছোট একটা নালা। বছরের এই সময় হেঁটেই পার হতে পারবে। নালা পার হয়ে ডান দিকে যাবে। পথ চলার সময় সাবধানে থেকো…।
থাক থাক আর বলতে হবে না, বাধা দিয়ে বললো নাইট। এই রাতে আমি জলা, নালা, খাল, বন্দক পেরিয়ে যেতে পারবো না। হয় আপনি দরজা খুলুন, না হলে আমিই ঢুকলাম দরজা ভেঙে, বলেই সে দমাদ্দম লাথি চালাতে লাগলো দরজার ওপর।
থামো, থামো! চিৎকার করে উঠলেন ফাদার। আসছি! আমি আসছি! খুলছি দরজা! একটু দাঁড়াও।
কপাট দুটো খুলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দরজা জুড়ে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসী। মোটাসোটা লোক। বলিষ্ঠ গড়ন। মুখটা ঢাকা হুড দিয়ে। তার এক হাতে মোটা একটা কাঠের লাঠি। দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে দুটো কুকুর। আগন্তকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে তৈরি। গলা দিয়ে গরগর আওয়াজ বেরোচ্ছে তাদের। ব্ল্যাক নাইটের চেহারা ও সাজ পোশাক দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য সন্ন্যাসীর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি অদৃশ্য হয়ে গেল।
ভেতরে এসো, নরম করে বললেন তিনি।
ভেতরে ঢুকে নাইট খেয়াল করলো, চার পাশে ছড়িয়ে আছে সন্ন্যাসীর দারিদ্রের চিহ্ন। একটা মাত্র চৌকি ঘরে। তাতে খড়ের বিছানা পাতা। খটখটে একটা টেবিলের দুপাশে দুটো খটখটে টুল। ব্যস আর কোনো আসবাবপত্র নেই। নাইটকে একটা টুল দেখিয়ে বসতে ইশারা করলেন সন্ন্যাসী। নিজে বসলেন অন্যটায়।
ফাদার, শুরু করলো ব্ল্যাক নাইট, আগে আমার তিনটে প্রশ্নের জবাব দিন, তারপর অন্য কথা। প্রথমত, আমার ঘোড়াটাকে রাখবো কোথায়? দ্বিতীয়ত, আমি শোবো কোথায়? আর সবশেষে, রাতে খাবো কি?
আমি ইশারায় তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো, বললেন সন্ন্যাসী। কারণ কথা বলার চেয়ে নীরবতাই আমার বেশি পছন্দ। এর পর তিনি ঘরের এক কোনার দিকে ইশারা করলেন, অর্থাৎ ঘোড়াটা ওখানে থাকতে পারবে। অন্য কোণের দিকে ইশারা করে বোঝালেন, ওখানে শোবে নাইট। সবশেষে উঠে একটা পাত্র থেকে এক মুঠো শুকনো বীন নিয়ে একটা থালায় করে এগিয়ে দিলেন নাইটের দিকে। এই হলো রাতের খাবার।
সন্ন্যাসী নিজের জন্যেও এক মুঠো বীন নিয়ে একটা থালায় রাখলেন। তারপর শুরু করলেন প্রার্থনা। দীর্ঘ প্রার্থনা শেষে দুতিনটে বীন মুখে ছুঁড়ে দিলেন তিনি নাইটের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন, খাও!
কিন্তু খাওয়ার আগে পোশাক ছাড়তে হবে নাইটকে। উঠে দাঁড়ালো সে। প্রথমে খুললো গায়ের বর্ম। তারপর শিরোস্ত্রাণ। সুন্দর, নিস্পাপ একটা মুখ দেখতে পেলেন সন্ন্যাসী। মাথায় ঘন, সোনালী চুল। উঠে তিনি নিজেও আগন্তুকের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলেন। মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন হুডটা। নাইট খেয়াল করলো, সাধারণত সন্ন্যাসীদের যেমন হয় তেমন রোগা, মাংসহীন নয় এ সন্ন্যাসীর মুখ। এঁর মুখটা প্রায় গোল, বেশ মাংসল। একটু লালচে ভাব আছে গালে। চেহারায় ফুর্তিবাজ একটা ভাব। এই মুখের মালিক যে শুকনো বীন নয়, মাংস ও ভালো মদ খেয়ে অভ্যস্ত, বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না তার।
