জন উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করতে যাবেন, এমন সময় সবুজ পোশাক পরা এক তীরন্দাজ এগিয়ে এলো। দেখামাত্র চিনলেন জন। গতকাল যে তীরন্দাজ তার সাথে উদ্ধতভাবে কথা বলেছিলো লোকটা সে-ই। তাকে দেখেই চটে গেলেন জন।
কাল তো খুব বড় বড় কথা বলেছিলে, বললেন তিনি, আজ প্রতিযোগিতার সময় তোমার টিকিটাও যে দেখা গেল না?
এদের সাথে আমাকে তীর ছুঁড়তে দেয়া হবে কি না বুঝতে পারছিলাম, জবাব দিলো লোকটা। দিলেও লক্ষ্যভেদের ব্যবস্থা একই রকম হবে কি না জানি না। তা ছাড়া আমার ধারণা হিউবার্ট বিজয়ী হোক তা-ই আপনি চান। তাই দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।
চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠলো জনের।
তুমি মনে করো হিউবার্টকে তুমি হারাতে পারবে? কঠোর কণ্ঠে প্রশ্ন: করলেন তিনি।
মনে প্রাণে চেষ্টা যে করবো তাতে সন্দেহ নেই।
এবার আরো রেগে গেলেন জন। আগের মতোই চিৎকার করে বললেন, নাম কি তোমার?
লক্সলি, মহামান্য রাজপুত্র।
লক্সলি! ঠিক আছে, নামো প্রতিযোগিতায়। হিউবার্টকে যদি হারাতে পারো নির্দিষ্ট পুরস্কার ছাড়াও অতিরিক্তষশটা রৌপ্য মুদ্রা তোমাকে দেয়া হবে। আর যদি হেরে যাও, তোমার জামা খুলে রেখে বাঁচাল বলে এখান থেকে বের করে দেয়া হবে!
তাতে আমার ওপর সুবিচার করা হবে না। যাক, আপনার যখন ইচ্ছা, নামছি আমি প্রতিযোগিতায়।
দূরে খাড়া করে রাখা একটা তক্তা হলো লক্ষ্যস্থল। তার গায়ে একটা কালো বৃত্ত আঁকা। কালো বৃত্তের কেন্দ্রে আবার ছোট্ট একটা বৃত্ত, শাদা রঙের। শাদা বৃত্তের কেন্দ্রে তীর বেঁধানোর চেষ্টা করতে হবে প্রতিযোগীদের।
হিউবার্টই ছুঁড়লো প্রথমে। তীরটা লক্ষ্যস্থলের কেন্দ্রে না লেগে লাগলো সামান্য একটু দূরে। এবার লক্সলির পালা। তার তীরও শাদা বৃত্তের কেন্দ্রে লাগলো না। তবে হিউবার্টের চেয়ে কেন্দ্রের অনেক কাছাকাছি লাগলো সেটা।
দেখে ভীষণ চটে উঠলেন জন। হিউবার্টকে লক্ষ্য করে বললেন, এই বাউণ্ডুলের কাছে যদি হেরে যাও, তোমাকে আমি আস্ত রাখবো না, বুঝলে?
এবার খুব মন দিয়ে লক্ষ্য স্থির করলো হিউবার্ট। ধনুকের ছিলা টেনে নিয়ে এলো কানের পাশে। কয়েক সেকেন্ড নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে রইলো লক্ষ্যস্থলের দিকে। তারপর ছেড়ে দিলো ছিলা। তীরবেগে ছুটলো তীর। শাদা বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে লাগলো। দর্শকরা উফুল্ল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো। জনের মুখেও ফুটে উঠেছে হাসি।
এবার তুমি কি করবে লক্সলি? ব্যঙ্গ মেশানো স্বরে প্রশ্ন করলেন তিনি। তোমার তীর কি হিউবার্টের তীর সরিয়ে জায়গা করে নেবে?
হি-হি করে হেসে উঠলো জনের কয়েকজন সহচর।
দেখা যাক কি করি, গম্ভীর মুখে বলে ধনুকে তীর পরালো লক্সলি। কানের কাছে টেনে নিয়ে এলো ছিলাটা। লক্ষ্যস্থির করে ছেড়ে দিলো।
সাঁই শব্দ তুলে ছুটলো তীর। হিউবার্টের তীরের পেছনে লেগে সেটাকে আগা গোড়া দুভাগ করে কেটে শাদা বৃত্তের কেন্দ্রে গিয়ে বিধলো।
দর্শকদের উৎফুল্ল চিৎকার থেমে গেছে। কারো মুখে কথা সরছে না। নিজের চোখে দেখার পরও ঘটনা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে সবার কাছে।
কেউ কেউ মন্তব্য করলো, লক্সলি মানুষ না, জাদুকর!
মহামান্য রাজপুত্র, লক্সলি বললো, প্রতিযোগিতার নামে এতক্ষণ যা হলো একে এক হিশেবে ছেলে খেলা বলা যেতে পারে। আমাদের দেশে, মানে উত্তর ইংল্যান্ডে যেভাবে তীর ছোড়ার প্রতিযোগিতা হয় তা এখানে দেখানোর অনুমতি পাবো কি?
অনুমতি দিলেন জন।
ছফুট লম্বা, খুব সরু একটা উইলোর ডাল মাটিতে পুঁতে লক্মলি বললে, একশো গজ দূর থেকে এই ডালে তীর লাগাতে হবে। যদি কেউ পারে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মহান রাজা রিচার্ডের সামনে প্রতিযোগিতায় নামার যোগ্যতা সে রাখে।
আমার বাপ, দাদা সবাই ভালো তীরন্দাজ ছিলো, বললো হিউবার্ট, আমি তো দূরে থাক তারাও এ ধরনের লক্ষ্যে কখনো তীর ছুঁড়েছে বলে শুনিনি। এই লোক ঐ ডালে যদি তীর লাগাতে পারে খুব খুশি মনেই আমি হার স্বীকার করে নেবো।
ব্যাটা ভীতু, চেষ্টা করে দেখতে তো পারতি! চিৎকার করে উঠলেন জন। ঠিক আছে, লক্সলি, দেখি তোমার ক্ষমতা কতটুকু। চ।
প্রথমে খুব সাবধানে ধনুকের ছিলাটা বদলালো ললি। তৃণ থেকে অনেকক্ষণ বেছে একটা তীর বের করলো। তারপর তৈরি হলো ছোঁড়ার জন্যে।
লক্ষ্যস্থির করে তীর ছুঁড়লো লক্সলি। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখলো, দুটুকরো হয়ে গেছে উইলোর ডালটা। রাজপুত্র পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে গেছেন। সব বিদ্বেষ ভুলে শতকণ্ঠে, তিনি প্রশংসা করতে লাগলেন লক্সলির নৈপুণ্যের।
তুমি যে বিজয়ী হয়েছে, আমার মনে হয় না এ বিষয়ে কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে, বললেন জন। তারপর লক্সলির হাতে তুলে দিলেন বিজয়ীর পুরস্কার। প্রতিশ্রুতি মতো অতিরিক্ত বিশটা রৌপ্যমুদ্রাও দিলেন। এবং বললেন, তুমি যদি আমার দেহরক্ষী বাহিনীতে কাজ করতে রাজি হও, মাসে তোমাকে পঞ্চাশ রৌপ্যমুদ্রা দেবো।
অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ, মহামান্য রাজপুত্র, জবাব দিলো, লক্সলি, আপনার চাকরি করতে পারলে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু আমার একটা প্রতিজ্ঞা আছে, চাকরি যদি করি, করবো আপনার ভাই রাজা রিচার্ডের। আর আপনার এই বিশটা মুদ্রা হিউবার্টকে দেবেন। খুব ভালো তীরন্দাজ ও। বেচারা যদি ভয় পেয়ে পিছিয়ে না যেতো, আমার মতো ও-ও দুটুকরো করে ফেলতে পারতো ডালটাকে।
