এতজন বীরকে হারিয়েছে, বললো এক নাইট, এবার নিশ্চয়ই আইভানহো তার সব সম্পত্তি দাবি করবে।
করলেই বুঝি রেজিনাল্ড সব ফেরত দিয়ে দেবে? বললেন বয়োবৃদ্ধ ওয়ার্ল্ডেমার। ওগুলো ফেরত নিতে হলে আইভানহোকে যুদ্ধ করেই নিতে হবে। আর যুদ্ধই যদি হয় আমাদের বন্ধুর সাহায্যে আমরা এগিয়ে যাবো না?
আপনি ঠিকই বলেছেন, ওয়াল্ডেমার, বললেন জন। তবে আমার মনে হয় না আমাদের সাহায্য দরকার হবে রেজিনান্ডের। ও একাই তিন তিনজন আইভানহোকে সামাল দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। তা ছাড়া যে সব নাইট আমার বিশ্বস্ত তাদেরকে জায়গা জমি দান করার অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে?
তা অবশ্য ঠিক, স্বীকার করলেন ওয়াল্ডেমার। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, আইভানহোকে দেখার পর আমাদের সৌন্দর্য ও প্রেমের রানী লেডি রোয়েনার চেহারা যে কী হয়েছিলো যদি দেখতেন!
আসলে কে এই লেডি রোয়েনা? জিজ্ঞেস করলেন জন।
স্যাক্সন সেড্রিকের পালিত মেয়ে, বললেন গুয়াল্ডেমার।
তার কথা কানেই যায়নি এমন ভঙ্গিতে প্রায়োর অ্যায়মার বললেন, শ্যারনের গোলাপের সঙ্গে মূল্যহীন মুক্তা! ভালো বুদ্ধি, কি বলো, দ্য ব্রেসি? এই সুন্দরী তরুণীকে বিয়ে করে ওর সব সম্পত্তি হাতাতে চাও না তুমি?
নিশ্চয়ই চাই। কিন্তু চাইলেই তো আর সব জিনিস পাওয়া যায় না।
বেশ, আমরা তার ব্যবস্থা করবো, কুটিল একটা হাসি হেসে বললেন জন। উঠে দাঁড়ালেন তিনি। আজকের মতো প্রতিযোগিতা শেষ। টুর্নামেন্টের শেষ পর্ব–সাধারণ যোদ্ধাদের অস্ত্র নৈপুণ্যের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে কাল।
রাজপুত্রের দেখাদেখি তার সঙ্গীরাও উঠে দাঁড়ালেন। এমন সময় রক্ষীদলের এক নেতা এসে একটা চিঠি দিলো জনের হাতে।
কোত্থেকে এলো এ চিঠি? জিজ্ঞেস করলেন রাজপুত্র। কে দিলো?
এক ফরাশি নিয়ে এসেছে, জবাব দিলো রক্ষী। বললো, খুব নাকি জরুরি। আজই যেন এটা আপনার হাতে পৌঁছায় সেজন্যে কাল সারাদিন, সারারাত ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছে সে।
উদ্বিগ্ন হলেন জন। কি এমন জরুরি খবর? কে পাঠালো?
চিঠিখানা খুললেন তিনি। এবং পড়ার সাথে সাথেই মুখ শুকিয়ে গেল রাজপুত্রের। মাত্র দুই বাক্যের চিঠি। তাতে লেখা:
সাবধান! শয়তান পালিয়েছে!
নিচে ফ্রান্সের রাজার সিলমোহর।
শয়তান পালিয়েছে! কম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন জন। মানে কি? রিচার্ড পালিয়েছে?
দেখি চিঠিটা, ওয়াল্ডেমার বললেন।
কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে দিলেন জন। পড়ে ভুরু কুঁচকে উঠলো ওয়াল্ডেমারের।
তাই তো মনে হচ্ছে, চিন্তিত কণ্ঠে বললেন তিনি।
খবরটা ভুলও হতে পারে, সান্ত্বনার সুরে বললো দ্য ব্রেসি। চিঠিটাও জাল হতে পারে।
না, না, ফ্রান্সের রাজার হাতের লেখা আমি চিনি, বললেন জন। ফিলিপ নিজে লিখেছেন এ চিঠি। নিচে সিলমোহরও তাঁর। এ চিঠি জাল বা মিথ্যে হতে পারে না।
তাহলে তো সত্যিই চিন্তার বিষয়, বললো এক নাইট। তার নাম ফিটজার। আমাদের আর এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত হবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইয়র্ক বা অন্য কোনো সুবিধাজনক জায়গায় আমাদের সৈন্য সমাবেশ করা দরকার। রিচার্ড যদি এসেই পড়ে তাকে ঠেকাতে হবে। সেজন্যে আমার মতে এই ফালতু টুর্নামেন্ট এখনই শেষ করা উচিত।
তুমি ঠিকই বলেছো, স্যার ফিটজার, বললো দ্য ব্রেসি। তবে একটা কথা, সাধারণ যোদ্ধারা প্রতিযোগিতা করার জন্যেই অধীর হয়ে আছে। ওদের সুযোগ না দিয়ে ফালতু হোক আর যা-ই হোক টুর্নামেন্ট যদি শেষ করে দেয়া হয়, ওরা খুবই ক্ষুব্ধ হবে। রাজপুত্রের ওপর ক্ষেপেও উঠতে পারে।
কথাটা একেবারে ফেলে দেয়ার মতো বলেনি দ্য ব্রেসি, বললেন ওয়ান্ডেমার। তবে একথাও ঠিক টুর্নামেন্টের দিন আর একটা বাড়ানো যাবে না। আমি বলি কি, যাদের ইচ্ছে আজই প্রতিযোগিতায় নামুক। সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক দেরি। এর ভেতর যা হয় হবে।
আমার মনে হয় তীর ছোড়ার প্রতিযোগিতাই জমবে ভালো, বললো একজন।
হ্যাঁ, সেরা তীরন্দাজকে একটা পুরস্কারও দেয়া যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তা-ই ঠিক হলো। রাজপুত্রের নির্দেশে ঘোষক ঘোষণা করলো, অত্যন্ত জরুরি কাজে রাজপুত্র জন আগামীকাল ব্যস্ত থাকবেন। তাই কাল আর কোনো প্রতিযোগিতা হবে না। আজই টুর্নামেন্টের শেষ দিন। সেজন্যে এখনই আজকের প্রতিযোগিতার সমাপ্তি ঘোষণা করা হচ্ছে না। সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিযোগিতা চলবে। দর্শকদের ভেতর যারা যোদ্ধা আছেন তাঁরা ইচ্ছে করলে তীর ধনুক নিয়ে তাঁদের নৈপুণ্যের প্রমাণ দিতে পারেন। যিনি সেরা তীরন্দাজ বলে বিবেচিত হবেন তাকে যথাযযাগ্য পুরস্কার প্রদান করা হবে।
সঙ্গে সঙ্গে জনা ত্রিশেক তীরন্দাজ এগিয়ে এলো। কিন্তু প্রতিযোগিতা যখন শুরু হলো, দেখা গেল আট জন মাত্র আছে। বাকিরা পরাজয়ের আশঙ্কায় সরে দাঁড়িয়েছে প্রতিযোগিতা থেকে। জন তার আসন থেকে নেমে এলেন প্রতিযোগীদের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্যে।
পরিচয় পর্ব শেষে শুরু হলো প্রতিযোগিতা।
শুরু থেকেই দর্শকরা বলাবলি করতে লাগলো, হিউবার্টই জিতবে। জনৈক নরম্যান নাইটের বনরক্ষী হিউবার্ট। তীর ছোঁড়ায় দারুণ হাত। গত কয়েক বছরের টুর্নামেন্টে সে-ই বিজয়ী হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই সবার ধারণা।
আটজন মাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই প্রতিযোগিতা শেষ হতে বেশিক্ষণ লাগলো না। দর্শকদের ধারণাই সত্য প্রমাণিত হলো। সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে হিউবার্ট। আবার সে প্রমাণ করেছে লক্ষ্যভেদে তার জুড়ি নেই।
