আবার পুর্ণোদ্যমে টেম্পলারের মুখোমুখি হলো তরুণ নাইট। দুই সঙ্গীকে পরাভূত হতে দেখে হতাশ হয়েছে ব্রায়ান, তবে ভেঙে পড়েনি। সেও সমান উদ্যমে সামনাসামনি হলো গৃহহীন নাইটের। শুরু হলো লড়াইয়ের আরেক পর্যায়।
কিন্তু বেশিক্ষণ চললো না এ যুদ্ধ। বোয়া-গিলবার্টের ঘোড়া আহত হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। আঘাত মারাত্মক নয় বলে এতক্ষণ টিকে ছিলো। এবার আর পারলো না। প্রচুর রক্তপাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। তরুণ নাইটের আচমকা এক আঘাতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মাটিতে। টেম্পলার ব্রায়ানও গড়িয়ে পড়লো। তক্ষুণি অবশ্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। তার পা জড়িয়ে গেছে ঘোড়ার রেকাবে। বেশ কয়েকবার টানাটানি করেও পা-টা ছাড়াতে পারলো না সে। ইতোমধ্যে তরুণ নাইট লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে তার ঘোড়া থেকে। শত্রুর বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়ালো সে।
পরাজয় স্বীকার করো, নয়তো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও? মাথার ওপর তলোয়ার তুলে চিৎকার করে উঠলো গৃহহীন নাইট।
রাজপুত্র জন দেখলেন, মহা বিপদ টেম্পলার ব্রায়ানের সামনে। তক্ষুণি যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত করলেন তিনি।
.
টুর্নামেন্ট শেষ। আহত নাইটদের একে একে তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। আহত নিহতের হিশেব নিতে গিয়ে দেখা গেল, চারজন মারা পড়েছে, মারাত্মক আহত হয়েছে ত্রিশজনের মতো। মাঠ ভিজে গেছে রক্তে।
এবার বিজয়ীর নাম ঘোষণার পালা। রাজপুত্র জনের ইচ্ছা ব্ল্যাক নাইটকেই আজকের বিজয়ী বলে ঘোষণা করবেন, আর যা-ই করুন কালকের সেই অহঙ্কারী ছোকরাকে আরো অহঙ্কারী হয়ে ওঠার সুযোগ দেবেন না। কিন্তু বিচারকরা তাতে আপত্তি জানালেন। তাঁদের যুক্তি, উত্তরাধিকার বঞ্চিত নাইট একাই ছজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাভূত করেছে, বিপক্ষের দলনেতা বোয়া-গিলবার্টও তার কাছেই পরাজিত হয়েছে; সুতরাং, বিজয়ীর সম্মান তারই প্রাপ্য।
কিন্তু জন তার গোঁ ছাড়তে রাজি নন। অবশেষে বিচারকরা মেনে নিলেন তাঁর কথা। কিন্তু বারবার ডেকেও ব্ল্যাক নাইটের খোঁজ পাওয়া গেল না। লড়াই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে মাঠ ছেড়ে চলে গেছে। কোন দিকে গেছে কেউ দেখেনি, কাউকে কিছু বলেও যায়নি সে। শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না দেখে জন, ঘোষণা করতে বাধ্য হলেন: কালকের বিজয়ী নাম না জানা নাইট বিজয়ী হয়েছে আজও।
তুমিও তো তোমার নাম বললে না, তরুণ নাইটের দিকে তাকিয়ে বললেন জন, তাই তোমাকে দেসদিচাদো (উত্তরাধিকার বঞ্চিত) বলেই সম্বোধন করছি। সমবেত সুধী ও দর্শকমণ্ডলীর সামনে তোমাকে দ্বিতীয়বারের মতো বিজয়ী ঘোষণা করা হচ্ছে। এবার তুমি পুরস্কার নেবে তোমারই নির্বাচন করা সৌন্দর্য ও প্রেমের রানীর কাছ থেকে।
কুর্নিশ করলো তরুণ নাইট, কিন্তু কোন কথা বললো না।
বাজনা বেজে উঠলো। সবাই উৎফুল্ল কণ্ঠে অভিনন্দন জানাচ্ছে বিজয়ীকে। রমণীরা রুমাল নাড়ছে। বিচারকমণ্ডলী বিজয়ীকে সাথে করে এগিয়ে গেলেন সৌন্দর্য ও প্রেমের রানীর সিংহাসনের দিকে। হাঁটু গেড়ে বসলো নাইট রানীর সামনে।
রোয়েনা তার আসন থেকে উঠে এলো। সামান্য ঝুঁকলো বিজয়ীর মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়ার জন্যে।
না! চিৎকার করে উঠলেন প্রধান বিচারক। বিজয়ী নাইটকে তার শিরোস্ত্রাণ খুলতে হবে। মুকুট পরানোর সময় মাথায় কিছু থাকা চলবে না।
প্রতিবাদ করলো নাইট। কিন্তু তার প্রতিবাদে কেউ কান দিলো না। অনেকটা জোর করেই তার শিরোস্ত্রাণ খুলে নিলো মার্শালরা। বছর পঁচিশেক বয়েসের সুন্দর একখানি তরুণ মুখ দেখা গেল। মৃত্যুর মতো ফ্যাকাসে সে মুখ। দুএক জায়গায় রক্তের দাগ।
মুখটা দেখামাত্র অস্ফুটস্বরে চিৎকার করে উঠলো রোয়েনা। কাঁপা কাঁপা হাতে মুকুটটা পরিয়ে দিলো নাইটের মাথায়।
তরুণ নাইট মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালো রোয়েনাকে। ওর হাত টেনে নিয়ে আলতো করে ছোঁয়ালো ঠোঁটে। তারপর হঠাৎ মুখটা ঝুলে পড়লো তার। টলমল করে উঠলো পা। কেউ এসে ধরার আগেই মাটিতে পড়ে গেল বিজয়ী নাইটের অচেতন দেহ।
সবাই উদ্বিগ্ন মুখে ছুটে এলো তার দিকে। সেড্রিকও এলেন। তরুণ নাইটকে এক পলক দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। সে তারই নির্বাসিত পুত্র উইলফ্রিড অভ আইভানহো।
মার্শালরা ধরাধরি করে তাঁবুতে নিয়ে গেল আইভানহোকে। একে একে তার গা থেকে যুদ্ধের পোশাকগুলো খুলে আনতেই দেখা গেল, বুকের এক পাশে গভীর একটা ক্ষত। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত গড়াচ্ছে সেই ক্ষত থেকে।
০৯. উইলফ্রিড অভ আইভানহো
উইলফ্রিড অভ আইভানহো! বাতাসের বেগে নামটা ছড়িয়ে পড়লো প্রতিযোগিতা স্থানের চারপাশে। দর্শকদের মুখে মুখে ফিরতে লাগলো। অবশেষে রাজপুত্র জনের কানেও পৌঁছুলো বিজয়ী নাইটের নাম পরিচয়। উদ্বেগের ছায়া পড়লো তাঁর মুখে।
কেন জানি না আমার বার বার মনে হচ্ছিলো, সহচর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, এই অহঙ্কারী নাইট রিচার্ডের বন্ধুই হবে, তারমানে আমার শত্রু।
আইভানহোর জমিজমা ভোগ করছে আমাদের রেজিনাল্ড, বললো দ্য ব্রেসি, এবার সব ওকে ফেরত দিতে হবে।
আইভানহোর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে রাজা, রিচার্ড বড়সড় একটা জায়গীর উপহার দিয়েছিলেন তাকে। তারপর দুজনই ক্রুসেডে যোগ দেয়ার জন্যে চলে যান প্যালেস্টাইনে। মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি করে রিচার্ড যখন দেশে ফিরে আসছেন তখন ইংল্যান্ডেরই কয়েকজন নাইটের চক্রান্তে তাঁকে বন্দী করে ফ্রান্সে নিয়ে যান ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ। খবরটা গোপনে জানানো হলো রিচার্ডের ভাই জনকে। জন ভীষণ খুশি হলেন শুনে। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের পথে সবচেয়ে বড় বাধাটা দূর হয়েছে। যাদের চক্রান্তে রিচার্ড বন্দী হয়েছেন তাদের খুশি করা কর্তব্য মনে করলেন তিনি। এই কর্তব্যবোধ থেকেই রিচার্ড আইভানহোকে যে জায়গীর দিয়েছিলেন সেটা আইভানহোর অনুপস্থিতেই তিনি কেড়ে নিয়ে দিয়ে দেন রেজিনাল্ডকে। তাই বিজয়ী নাইটের নাম আইভানহো জানার পর সবার মনে প্রথম যে প্রশ্নটা জাগলো তা হলো, রেজিনাল্ড পারবে তো এত বড় বীরের জমিজমা নিজের দখলে রাখতে?
