কিন্তু কারো মধ্যেই দুঃখবোধ বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। পুরুষদের মতো মহিলা দর্শকরাও অবিচল উৎসাহে দেখছে লড়াই। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিৎকারও করছে অনেকে। মাঝে মাঝে অবশ্য কারো স্বামী বা ভাই আহত হয়ে পড়ে গেলে কোনো মহিলা দর্শক বিচলিত হচ্ছে। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্যে মাত্র। একটু পরেই আবার লড়াইয়ের উন্মাদনা সংক্রামিত হচেছ তার বা তাদের ভেতর। আবার শুরু হচ্ছে চিৎকার, হাততা লি। মেয়েরাও পুরুষদের সঙ্গেই গলা মিলিয়ে উৎসাহ যোগাচ্ছে যোদ্ধাদের। মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছে:
সাবাস, দেসদিচাদো! দেখেছো, কি দারুণ চালালো তলোয়ারটা! বা, সাবাস, স্যার ব্রায়ান! আরো জোরে মারুন! এই দিক দিয়ে এসে, এই পাশ দিয়ে!
ঘোষকদের কণ্ঠও শোনা যাচ্ছে: লড়ে যান, বীর নাইটরা! পরাজয়ের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়! মনে রাখবেন, শত শত চোখ আপনাদের সাহস ও কৌশল দেখে মুগ্ধ হচ্ছে!
অবশেষে গৃহহীন নাইট মুখখামুখি হলো বোয়াগিলবার্টের। দুজনেরই বর্শা ভেঙে গেছে। দুজনেরই হাতে এখন তলোয়ার। আগুন ঝরা চোখে একে অন্যের দিকে তাকালো তারা। দুজনেরই দৃষ্টিতে ঘৃণা। শুরু হলো দুই দলপতির লড়াই। একজনের মরণ না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই থামবে না।
দর্শকরা দেখছে। শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় কাঁপছে সবাই থরথর করে।
বোয়া-গিলবার্টের দল এখন জয়ের পথে। অ্যাথেলস্টেন এবং বিশালদেহী ফ্ৰঁত দ্য বোয়েফ যার যার প্রতিপক্ষকে ভূপাতিত করে এগিয়ে এলো দলনেতার সাহায্যে। দুদিক থেকে তারা আক্রমণ করলো তরুণ নাইটকে।
সাবধান, দেসদিচাদো! সাবধান! দুপাশে খেয়াল করো! চিৎকার উঠলো দর্শকদের ভেতর।
বেকায়দা অবস্থায় পড়ে গেল নাইট। এক সাথে তিনজনকে একা ঠেকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ঘাবড়ালো না সে। ব্রায়ানকে প্রবল একটা আঘাত হেনেই পিছিয়ে এলো দ্রুত। এত দ্রুত যে, আরেকটু হলেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে অ্যাথেলস্টেন আর রেজিনান্ডের ভেতর। অতি কষ্টে দুই অশ্বারোহী পাশ কাটালো একে অপরকে। তারপর ছুটলো গৃহহীন নাইটের পেছন পেছন। ইতোমধ্যে বোয়া-গিলবার্টও যোগ দিয়েছে তাদের সাথে।
ভাগ্য ভালো, খুবই ভালো একটা ঘোড়ায় বসে আছে তরুণ নাইট। আগের দিন যেটা সে পুরস্কার পেয়েছে এটা সেই ঘোড়া। পাখির মতো উড়ে বেড়াতে লাগলো সে একবার মাঠের এমাথায় একবার ওমাথায়। এভাবে কিছুক্ষণের ভেতর তিন প্রতিপক্ষকে আলাদা করে ফেলতে পারলো নাইট। তারপর একে একে হামলা চালাতে লাগলো তিন জনের ওপর। একজনকে আঘাত করেই পিছিয়ে আসছে নয়তো পাশে সরে যাচ্ছে, তারপর আবার অন্য একজনকে আক্রমণ করছে। তিনজন হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো ক্ষতি করতে পারছে না প্রতিপক্ষ।
দর্শকরা পাগল হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের জন্যেও চিৎকার বন্ধ করছে না কেউ। তবে, তিনজনের সাথে একা লড়ে গৃহহীন নাইট যে শেষ রক্ষা করতে পারবে না তা বুঝতে পারছে অনেকে। সে এখন যা করছে তাতে সময় কাটানো সম্ভব জয়লাভ সম্ভব নয়। একটু পরে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন হার স্বীকার করা ছাড়া কোনো গতি থাকবে না তার। রাজপুত্র জনের কাছাকাছি যেসব সম্রান্তজনেরা বসেছিলেন তারা বললেন: এবার খামার আদেশ করুন, রাজপুত্র! এমন একজন বীর নাইটকে অপমানের হাত থেকে বাঁচান!
জন কান দিলেন না তাদের কথায়।
এই অহঙ্কারী নাইট কাল বিজয়ী হয়েছে, বললেন তিনি। আজ অন্যেরা সুযোগ পেয়েছে, আমি বাধা দেবো কেন?
.
পরাজয় বোধহয় এড়াতে পারলো না তরুণ নাইট। স্পষ্ট বুঝতে পারছে দর্শকরা, সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আগের ক্ষিপ্রতা আর নেই তার তরবারিতে। ঘোড়াটাকেও ঠিক মতো যেন পরিচালনা করতে পারছে না। আর কিছুক্ষণ যদি চেষ্টা চালিয়ে যায় বোয়া-গিলবার্ট, অ্যাথেলস্টেন আর রেজিনাল্ড, কোনো সন্দেহ নেই বিজয় তাদের হাতের মুঠোয় আসবে।
এই সময় অপ্রত্যাশিত এক ঘটনায় বেঁচে গেল সে। শুধু বেঁচেই গেল টুর্নামেন্টের ফলাফলও হয়ে গেল অন্য রকম।
তরুণ নাইটের দলে কালো পোশাক পরা এক যোদ্ধা ছিলো। তার ঘোড়াও তার পোশাকের মতোই কালো। সেজন্যে দর্শকরা তার নাম দিয়েছে ব্ল্যাক নাইট। অদ্ভুত তেজোদীপ্ত তার ভঙ্গি–যেমন তার তেমন তার ঘোড়ার। এতক্ষণ সে লড়েছে, তবে খুব একটা মন দিয়ে নয়। আক্রমণ সে বলতে গেলে করেইনি। কেউ আক্রমণ কর কেবল ঠেকিয়ে গেছেঅনায়াসে, ঠেকিয়ে গেছে। দেখে অনেকের মনে হয়েছে সে-ও যেন নিরাসক্ত একজন দর্শকমাত্র। সে কারণেই ব্ল্যাক নাইট-এর পাশাপাশি অনেকে তার নাম দিয়েছে অলস নাইট।
দলপতির বিপদ দেখে হঠাৎ করে যেন এই নিরাসক্ত যোদ্ধার বীরত্ব জেগে উঠলো। আলসেমি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে এলো তরুণ নাইটকে সাহায্য করতে।
দেসদিচাদো! ঘাবড়িও না! আমি এসে গেছি! চিৎকার করে উঠলো সে।
সময় মতোই এসেছিলো ব্ল্যাক নাইট, নইলে কি হতো বলা মুশকিল। তরুণ নাইট তখন তলোয়ার তুলেছে বোয়া-গিলবার্টকে আঘাত করার জন্যে। একই সঙ্গে রেজিনাও তলোয়ার তুলেছে তরুণ নাইটকে আঘাত করতে। কিন্তু তলোয়ার নামিয়ে আনার সুযোগ পেলো না রেজিনাল্ড। তার আগেই ব্ল্যাক নাইট তার কাছে পৌঁছে ভয়ঙ্কর এক আঘাত হেনেছে তার মাথায়। ঘোড়াসুদ্ধ মাটিতে পড়ে গেল নরম্যান নাইট রেজিনাল্ড। এরপর অ্যাথেলস্টেনের দিকে ছুটে গেল ব্ল্যাক নাইট। তারই কুঠার ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথায় মারলো প্রচণ্ড শক্তিতে। অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল স্যাক্সন রাজকুমার। এরপর আবার আগের মতো আলসেমি ভর করলো ব্ল্যাক নাইটের শরীরে। ধীর গতিতে ঘোড়া চালিয়ে মাঠের এক কোণে চলে গেল সে। অবখানা, এবার তোমার ব্যাপার তুমিই সামলাও, দেসদিচাদো।
