তাই বুঝি?
হ্যাঁ। আর ক্রিস্টোফার মূল হোল্যাণ্ড এসেছে তারও এক বছর আগে অর্থাৎ প্রায় তিন বছর আগে।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভদ্রমহিলা। সত্যি, এভাবে কখনও হিসেব করে দেখিনি। সময় কি দ্রুত যায়, পারকিন্স।
বিলি, তাঁকে আবার নিজের নামটা মনে করিয়ে দিল বিলি, বিলি উইভার।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। বিলি! বিলি! মুখস্থ করার ভঙ্গিতে বললেন তিনি। আসলে কানে ভালো শুনতে পাই না আমি। স্মরণশক্তিও কমে যাচ্ছে।
ওদের ব্যাপারে জানেন কিছু? এই দুজনের সম্পর্কে?
না, তেমন কিছু জানি না।
আমার এখন সব কথা মনে পড়ছে। ওরা দুজন ছিল হরিহর আত্মা। দুই বন্ধু। সবাই এক নামে চিনত ওদেরকে। যেমন লোকে রুজভেল্ট এবং চার্চিলের নাম এক সাথে বলে, সেভাবে।
আচ্ছা! সরল বিস্ময় প্রকাশ করলেন ভদ্রমহিলা। আমার পাশে এসে বসো তো, খোকা। চা খেতে খেতে ওদের গল্প শুনি।
আপনি ব্যস্ত হবেন না, পিয়ানোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল বিলি। পিরিচের ওপর কাপে দ্রুত চামচ নাড়ছেন তিনি। তাঁর হাত জোড়া ছোট্ট, ফ্যাকাসে, নখে লাল টকটকে নেইলপলিশ।
আমি ওদের ছবি দেখেছিলাম খবরের কাগজে, বলে চলল বিলি। ক্রিস্টোফার মূল হোল্যাণ্ড বছর তিন আগে ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়। ইটন স্কুলে পড়ত সে। ভ্রমণের সাংঘাতিক বাতিক ছিল। তারপর হঠাৎ একদিন…
তোমার চায়ে দুধ চলবে? আরেকটু চিনি?
দিতে পারেন। আচ্ছা, যা বলছিলাম হঠাৎ একদিন…।
ইটন স্কুলের ছাত্র? উঁহু, আমার কাছে যে মূল হোল্যাণ্ড এসেছিল সে তা হলে অন্য কেউ হবে। কারণ সে ইটনে পড়ত না। সে ছিল ক্যামব্রিজের আন্ডার গ্রাজুয়েট। এখানে এসে ওই ফায়ার প্লেসের সামনে বসে অনেক গল্প করেছে সে আমার সাথে। এসো, চা রেডি। সোফার পাশে খালি জায়গাটায় বিলিকে বসতে বললেন ভদ্রমহিলা হাসি মুখে।
ধীর পায়ে হেঁটে এল বিলি, বসল সোফার এক কোণে। বাড়িউলি ওর সামনে, টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা রাখলেন। বিলি চায়ে চুমুক দিতে শুরু করল। প্রায় আধ মিনিট কেউ কথা বলল না। শুধু ফুড়ত্যাড়ৎ শব্দ শোনা গেল চা পানের। বিলি জানে উনি ওর দিকেই তাকিয়ে আছেন, কাপের কিনারে চোখ রেখে ওকেই দেখছে। বোটকা, পচা একটা গন্ধ লাগছে নাকে, মহিলার গা থেকে আসছে। শরীর গুলিয়ে উঠল বিলির।
মি. মূল হ্যাণ্ড চা খেতে খুব ভালোবাসত, উদাসীন গলায় বললেন তিনি। আমার জীবনেরও কাউকে এত বেশি চা খেতে দেখিনি।
মূল হোল্যাণ্ড কবে গেছে এখান থেকে? জানতে চাইল বিলি।
গেছে? ভুরু কোঁচকালেন ভদ্রমহিলা। যায়নি, খোকা। মুল হোল্যাণ্ড আছে এখনও এ বাড়িতেই। মি. টেম্পলও আছে। দুজনেই তিনতলায় থাকে।
খুব আস্তে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল বিলি, আড়চোখে তাকাল মহিলার দিকে। হাসলেন মহিলা প্রত্যুত্তরে, ফ্যাকাসে হাত বাড়িয়ে বিলির। হাঁটুতে চাপড় দিলেন আদর করে। তোমার বয়স কত খোকা?
সতেরো।
সতেরো! চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। একদম সমান বয়স। মি. মূল হেল্যাণ্ডেরও বয়স ছিল সতেরো। তবে সে তোমার চেয়ে খানিকটা খাটো, আর তার দাঁতগুলোও তোমার মত এত ঝকঝকে নয়। খুবই সুন্দর দাঁত তোমার, বিলি, তা কি তুমি জানো?
যতটা সুন্দর বলছেন ততটা নয়, বলল বিলি। আমার কয়েকটা দাঁতের পেছনে ফিলিং করতে হয়েছে।
তাতে কিছু আসে যায় না। মি. টেম্পল ছিল তোমার চেয়ে বয়সী। আটাশ বছর ছিল বয়স। অবশ্য সঠিক বয়সটা সে নিজে থেকে না বললে আমি ধরতেই পারতাম না আসলে তার বয়স কত। খুবই তরুণ দেখাত তাকে। চামড়ায় একটা দাগও ছিল না।
মানে?
মানে তার ত্বক শিশুদের মতই কোমল আর মসৃণ ছিল।
একটু বিরতি। বিলি চায়ের কাপটা আবার তুলে নিয়ে চুমুক দিল, তারপর নিঃশব্দে পিরিচের ওপর নামিয়ে রাখল ওটাকে। ভদ্রমহিলার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে সে, কিন্তু তিনি হঠাৎ চুপ মেরে গেলেন। সিধে হয়ে বসে ওপর দিকে চাইল বিলি, ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে বলল, ওই কাকাতুয়াটা… রাস্তা
থেকে ওটাকে প্রথম দেখে জ্যান্ত ভেবেছিলাম।
তাই নাকি?
জ্বী। দেখলে মনেই হয় না ওটা মৃত। দারুণ একটা কাজ হয়েছে পাখিটাকে নিয়ে। কে করেছে কাজটা?
আমি।
আপনি?
অবশ্যই, বললেন তিনি। বেসিলকেও নিশ্চই দেখেছ? ফায়ারপ্লেসের সামনে চোখ বোজা রোমশ কুকুরটার দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি। বিলি তাকাল ওটার দিকে। হঠাৎ বুঝতে পারল ঘুমাচ্ছে না কুকুরটা, কাকাতুয়ার মত একই দশা হয়েছে ওটারও। হাত বাড়িয়ে কুকুরটার পিঠ ছুঁলো বিলি। শক্ত এবং ঠাণ্ডা। লোমের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দেখতে পেল চামড়াটা ধূসর-কালো এবং শুকনো, দারুণভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সাংঘাতিক ব্যাপার তো! বলল বিলি। সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকাল পাশে বসা ছোটখাট মহিলাটির দিকে। কাজটা করতে নিশ্চই প্রচুর খাটুনি গেছে।
একেবারেই না, বললেন তিনি। আমি আমার প্রিয় প্রাণীগুলোকে স্টাফ করে রাখি তারা মারা যাবার পরে। এটা আমার শখ বলতে পারো। তোমাকে আরেক কাপ চা দেব?
না, ধন্যবাদ, বলল বিলি। বাদাম মেশানো চা খাবার পর মুখের ভেতরটা এখন তেতো লাগছে।
এখানে তো মজা পাবার মত কিছু ঘটে না, আপন মনে বকবক করে চলেছেন মহিলা। তাই কদাচ যখন কিছু স্টাফ করার সুযোগ পাই, ছাড়ি না। এটা তো এক ধরনের শিল্পই, নাকি?
জ্বী, ডোক গিলে বলল বিলি। এই শীতেও ঘামতে শুরু করেছে সে।
