সাড়ে পাঁচ ডলার ঠিক আছে, বলল বিলি। আমি ওই ভাড়া দিতে পারব।
বেশ। ভেতরে এসো। ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে আছ তখন থেকে!
ভদ্রমহিলার মাতৃসুলভ ব্যবহার মুগ্ধ করল বিলিকে। কৈশোরের প্রিয় বন্ধুটির স্নেহময়ী মায়ের মতই লাগছে ওঁকে, যেন বিলিকে তিনি ক্রিস্টমাসের ছুটি কাটাতে দাওয়াত করছেন। বিলি মাথা থেকে হ্যাট খুলল, পা রাখল চৌকাঠের ভেতরে।
ওটা ওখানে ঝুলিয়ে রাখো, বললেন তিনি, দেখি, কোটটা আমাকে খুলতে দাও।
হলঘরে আর কোন কোট বা হ্যাট চোখে পড়ল না বিলির। নেই ছাতা, ওয়ার্কিং স্টিক-কিছু না।
এখানে আমাদের নিজেদের কাজ নিজেদেরকে করতে হয়, বিলির কাঁধে হাত রেখে ভদ্রমহিলা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। আমার এই ছোট্ট বাড়িতে মানুষজন বলতে গেলে কেউ আসেই না। হাসি তার মুখে। তাই তোমাকে পেয়ে ভালো লাগছে।
মহিলা বড় বেশি বকবক করেন, ভাবল বিলি। তবে সাড়ে পাঁচ ডলারে রাত্রি যাপনের সুযোগ পেয়ে এটুকু বকবকানি সইতে রাজি আছে সে। আমি ভেবেছিলাম আপনার এখানে পেয়িংগেস্টদের অভাব নেই, মৃদু গলায় বলল বিলি।
তা অবশ্য নেই। তবে সবাইকে তো আমি ঘর ভাড়া দিই না। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে খুব খুঁতখুঁতে বলতে পারো।
আচ্ছা!
তবে তরুণ গেস্টদের জন্যে আমার দরজা সবসময়ই ভোলা। তেমন কেউ এলে আমি বরং খুশিই হই, সিঁড়ির অর্ধেক ধাপ পেরিয়েছেন মহিলা, রেলিং-এ ভর দিয়ে থামলেন, ঘাড় ঘুরিয়ে হাসিমুখে তাকালেন বিলির দিকে। ঠিক তোমার মত, কথাটা শেষ করলেন। তিনি। তাঁর নীল চোখজোড়া অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে যেন জরিপ করল বিলিকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
একতলার ল্যাণ্ডিং দেখিয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, এই ফ্লোরে আমি থাকি।
ওরা উঠে এল দোতলায়। এই ফ্লোর পুরোটা তোমার। বললেন ভদ্রমহিলা। এই যে এটা তোমার ঘর। আশা করি অপছন্দ হবে না। ছোট কিন্তু সুসজ্জিত একটি বেডরূমে ঢুকলেন তিনি বিলিকে নিয়ে, জ্বেলে দিলেন আলো।
সকালবেলায় সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে ঘরের ভেতরে, পারকিন্স, পারকিন্সই তো নাম, নাকি?
জ্বী না। বলল বিলি। উইভার, বিলি উইভার।
বেশ সুন্দর নাম তো! বিলি সাহেব, আপনার আশা করি কোন সমস্যা হবে না এ ঘরে থাকতে। ঠাণ্ডা লাগলে গ্যাসের চুলাটা জ্বালিয়ে নিও। ঘর গরম হবে।
ধন্যবাদ, বলল বিলি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। সে লক্ষ করেছে বিছানা ঢেকে রাখার গুজনিটা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, পেতে রাখা হয়েছে পরিষ্কার চাদর। যেন কেউ আসবে জানতেন বাড়িউলি।
তোমার পছন্দ হয়েছে জেনে আমারও বেশ ভালো লাগছে, গভীর চোখে তাকালেন তিনি বিলির দিকে। ভাবছিলাম যদি পছন্দ না হয়…।
না না, ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি জবাব দিল বিলি। আমাকে নিয়ে আপনার অযথা চিন্তা করতে হবে না। সে সুটকেসটা চেয়ারের ওপর রেখে তালা খুলতে শুরু করল।
রাতে কিছু খাবে, খোকা? নাকি খেয়ে এসেছ?
ধন্যবাদ। কিছুই খাব না, বলল বিলি। আমাকে আবার কাল ভোরে উঠেই অফিসে দৌড়াতে হবে। তাই সকাল সকাল শুয়ে পড়তে চাইছ।
বেশ তো, শুয়ে পড়ো। তবে সম্ভব হলে ঘুমাবার আগে একবার নিচতলায় এসো। রেজিস্টার বুকে নাম সই করতে হবে। বোর্ডিং-হাউজ বা হোটেলের নিয়ম এটাই জানো বোধ হয়। আমাদেরও নিয়ম ভঙ্গ করা ঠিক হবে না, তাই না? হাত নেড়ে ভদ্রমহিলা দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।
মহিলা একটু বেশি কথা বললেও মনটা ভালো, ভাবল বিলি। হয়তো যুদ্ধে তিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন। সেই শোক এখনও ভুলতে পারেননি।
সুটকেস খুলে ঘুমাবার যাবতীয় জিনিসপত্র বের করে ফেলল বিলি। তারপর হাত মুখ ধুয়ে নেমে এল নিচে, ঢুকল লিভিং রুমে। বাড়িউলি এখানে নেই, তবে ছোট্ট কুকুরটা এখনও ফায়ার প্লেসের সামনে গভীর ঘুমে মগ্ন। ঘরটা আরামদায়ক গরম। নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবছে বিলি।
পিয়ানোর ওপর রেজিস্টার বুকটা দেখতে পেল সে, খাতা খুলে নিজের নাম এবং ঠিকানা লিখল গোটা গোটা অক্ষরে। এই পৃষ্ঠায় মাত্র দুজন অতিথির আগমনের কথা লেখা আছে। একজন কাড্রিফের ক্রিস্টোফার মূল হোল্যান্ড, অন্যজন ব্রিস্টলের গ্রেগরী ডব্লিউ টেম্পল।
নাম দুটো চেনা চেনা লাগল বিলির। কোথায় যেন এই অদ্ভুত নাম দুটো দেখেছে সে, এখন ঠিক মনে করতে পারছে না। খাতার দিকে আবার তাকাল বিলি। মূল হেল্যাণ্ডের নামটা বেশি চেনা চেনা লাগছে ওর কাছে। কিন্তু নামটা শুনেছে কোথায়?
গ্রেগরী টেম্পল? বেশ জোরেই নামটা উচ্চারণ করল বিলি, স্মৃতি হাতড়াচ্ছে। ক্রিস্টোফার মূল হোল্যাণ্ড?
ভারি চমৎকার দুটি ছেলে, পেছন থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ, ফিরে তাকাল বিলি। বাড়িউলি। হাতে সিলভারের বড় একটা চায়ের ট্রে, দুকাপ পানীয় ওতে।
নাম দুটো বড় চেনা চেনা লাগছে, বলল বিলি।
তাই নাকি? অদ্ভুত ব্যাপার তো!
নাম দুটো অবশ্যই আগে কোথাও দেখেছি, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই আমার, বেশ জোর দিয়ে বলল বিলি। সম্ভবত খবরের কাগজে। তবে বিখ্যাত কেউ ছিল না ওরা। বিখ্যাত ক্রিকেটার বা ফুটবলার, কোনটাই নয়।
আমারও তাই ধারণা, ভদ্রমহিরা সোফার সামনে নিচু একটা টেবিলের ওপর ট্রে নামিয়ে রাখলেন।
তবে বিখ্যাত কেউ না হলেও দুজনেই ছিল অপূর্ব সুন্দর দেখতে। লম্বা, বয়সে তরুণ, সুদর্শন, ঠিক যেমন তুমি।
আবার সেই প্রশংসা। বিলি খাতার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। এই যে দেখুন, তারিখটা আঙুল দিয়ে দেখাল সে। এখানে শেষ লোকটি এসেছে দুবছর আগে।
