দারুণ ঘৃণায় রাউলের মুখ বিকৃত হলো। তারপর একটা অবজ্ঞার হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। মাদাম একস্-এর দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপ-ভরা স্বরে সে বলতে লাগল,
আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন মাদাম একস্, এ ব্যাপারে আমার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। ভয় পাওয়ার কোন প্রশ্নই নেই এখানে। বেশ তো, যদি আমার হাত পা দড়ি দিয়ে বাধলে খুশি হতে পারেন, তবে বাঁধুন।
রাউল ভেবেছিল এই বিদ্রুপের পর মাদাম একস্ আর বাঁধার্বাধির মধ্যে যাবেন না। কিন্তু তার ভাবনটা যে একেবারেই ভুল তা বোঝা গেল সঙ্গে সঙ্গেই।
মাদাম একস্ অবিচলিত স্বরে বললেন, ধন্যবাদ সঁশিয়ে, তারপর দড়িটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলেন রাউলের দিকে।
আচম্বিতে পর্দার পিছন থেকে সিমোনের তীব্র তীক্ষ্ম কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
না না রাউল, মাদাম একস্-এর অপমানকর প্রস্তাবে কিছুতেই রাজী হয়ে না। ব্যঙ্গের হাসি হেসে মাদাম একস্ বললেন, মাদাম সিমোন, আপনি ভয় পাচ্ছেন নাকি!
হ্যাঁ, স্বীকার করছি আমি ভয় পেয়েছি।
রাউল চিৎকার করে উঠল, কি বলছ, সিমোন? মাদাম এক ভাবছেন আমরা তাকে ঠকাতে যাচ্ছি। আমরা জালিয়াত- জোচ্চোর।
আমাকে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হতে হবে, গম্ভীর গলায় মাদাম একস্ বললেন। তারপর রাউলকে চেয়ারের সঙ্গে বাঁধলেন খুব শক্ত করে।
বাঁধতে আপনি খুব ওস্তাদ, বিদ্রূপ-ভরা গলায় রাউল বলল। মাদাম এক এর বাধার কাজ শেষ হলো।
এবার খুশি হয়েছেন তো?
মাদাম একস্ কোন উত্তর দিলেন না। তিনি যেন রাউলের উপহাস গায়েই মাখলেন না। তিনি ঘরের দেওয়ালগুলি ভালো করে পরীক্ষা করলেন। হলঘরে যাবার দরজাটায় তালা লাগিয়ে চাবিটা খুলে নিলেন। চাবিটা রাখলেন নিজের কাছেই। তারপর এগিয়ে এসে বসলেন চেয়ারে।
হ্যাঁ, এবার আমি তৈরি। প্রেত-চক্র শুরু হোক, অদ্ভুত সুরে বললেন তিনি।
কিছুক্ষণ কেটে গেল। পর্দার পিছনে সিমোনের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠতে লাগল। একসময় সে শব্দ প্রবল হয়ে উঠল। তারপর থেমে গেল। কিছুক্ষণ সব নিস্তব্ধ। তারপর শোনা গেল একটা চাপা গোঁ-গোঁ আওয়াজ। একটু পরে তা-ও থেমে গেল। আবার নিস্তব্ধতা, আচমকা খঞ্জনির ঝনঝন আওয়াজে নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। টেবিল থেকে লাফিয়ে উঠে শিঙে পড়ে গেল ঘরের মেঝেতে। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন ওটাকে ছুঁড়ে ফেলল। খল খল করে কে যেন হেসে উঠল, মহাবিদ্রুপের হাসি। কুঠরীর ভারী পর্দাটা একটু সরে গেল। দেখা গেল মিডিয়াম সিমোনকে। মিডিয়াম চেতনা হারিয়েছে, তার মাথাটা ঝুঁকে পড়েছে বুকের উপর।
হঠাৎ মাদাম একস্ জোরে শ্বাস টানলেন। মিডিয়াম সিমোনোর মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে হাল্কা কুয়াশা। মনে হচ্ছে যেন একটা সরু ফিতে বের হয়ে আসছে সিমোনের ঈষৎ উন্মুক্ত মুখ থেকে।
কুয়াশা ক্রমেই ঘন হতে লাগল। মিডিয়ামের মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুকণা, কণাগুলো অতিসূক্ষ্ম। কণাগুলির মধ্যে একটা আলোড়ন উঠেছে। সূক্ষ্মকণাগুলো জমাট বাঁধছে-ঘনীভূত হচ্ছে। আকার নিচ্ছে। সে আকার একটা শিশুর… একটি বাচ্চা মেয়ের।
অ্যামেলি… আমার ছোট্ট অ্যামেলি… আমার বাচ্চা আসছে আমার সামনে।
মাদাম একস্ বলে উঠলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ফিসফিসে হলেও তীক্ষ্ণ।
অস্পষ্ট মূর্তিটা ক্ৰমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে লাগল। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ওদিকে তাকিয়ে রইল রাউল। এমন নিখুঁত দেহধারণ এর আগে কখনই দেখেনি সে।
সত্যিকারের রক্ত-মাংসে গড়া একটা জীবন্ত শিশু যেন এসে দাঁড়িয়েছে ঐ ছোট্ট কুঠরীখানার প্রবেশপথে।
মা…মামণি, শিশুর মত কচি গলার ডাক শোনা গেল।
আমার মেয়ে…আমার অ্যামেলি সোনা… চিৎকার করে বলতে বলতে উত্তেজনায় চেয়ার ছেড়ে অর্ধেকটা উঠে পড়লেন মাদাম একসা।।
সাবধান মাদাম, অত উত্তেজিত হবেন না, রাউল চেঁচিয়ে উঠে সতর্ক করল। ইতস্তত করতে করতে বাচ্চা মেয়েটি এগিয়ে আসতে লাগল সামনের দিকে। দুখানি ছোট হাত সামনে বাড়িয়ে ছোট্ট অ্যামেলি আবার ডাকল, মা…মামণি…।
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
মাদামের গলা থেকে এক অদ্ভুত স্বর বেরিয়ে এল। তিনি আবার উত্তেজিতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন।
ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল রাউল, একি করছেন মাদাম? বসুন, বসে পড়ন, নইলে মিডিয়ামের…। রাউলের কথায় কান না দিয়ে মাদাম এক তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন, আমার একমাত্র সন্তান অ্যামেলি- ওকে আমি ধরব… ওকে আমি বুকে নেব…
পাগলের মত সামনের দিকে এক পা এগিয়ে গেলেন মাদাম একস্।
ঈশ্বরের দিব্যি! নিজেকে সংযত করুন মাদাম। নিজের চেয়ারে বসুন। বসে পড়ন এক্ষুণি।
রাউল খুব ভয় পেয়েছে।
আমার বাচ্চা! আমি ওকে ধরবই। আমি ওকে কোলে নেবই। কেউ আমকে ঠেকাতে পারবে না।
সাবধান মাদাম! আমি আদেশ করছি, আপনি বসে পড়ন। আর একটি পা-ও এগোবেন না।
বাঁধনের মধ্যে রাউলের শরীরটা ছটফট করতে লাগল। বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য সে প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু বৃথা চেষ্টা। মাদাম এক তার কাজটি বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছেন।
আসন্ন বিপদের চিন্তায় রাউলের মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। আর্তকণ্ঠে সে চিৎকার করে উঠল, ঈশ্বরের দিব্যি! দয়া করে বসে পড়ন… বসে পড়ন দয়া করে। মিডিয়ামের কথাটা আপনি ভুলে যাচ্ছেন… দয়া করে তার কথাটা মনে রাখুন।
